আসলে আমাদের জন্মেরও একটা ধরন আছে। হঠাৎ শুনলে অশ্লীল লাগতে পারে আমাদের উচ্চশিক্ষিত মেট্রোপলিটন মনে, কিন্তু সত্যি সত্যিই আমার খারাপ লাগেনি যখন অগ্রদ্বীপের মেলায় জীবন গোঁসাই আমাকে অবলীলাক্রমে বলেছিল, ‘জন্মের ব্যাপারটা দৈব। ক্ষেত্রজ্ঞ পুরুষ নারীর গর্ভের ঠিক সময় বুঝে বীজ ফেলে। ঠিক যেন দুধের মধ্যে দইয়ের সাঁজাল। মাতৃগর্ভের বিম্বমধ্যে জলে ভাসতে লাগলেন ব্রহ্মবস্তু। নিরাশ্রয় নিরুপাধি। হঠাৎ আত্মারাম দেখা দিলেন। বীজ ভাসতে ভাসতে ঢেউ খেতে খেতে বর্তুলাকার থেকে হঠাৎ লম্বা আকার নিল। এবারে সেই লম্বা থেকে হঠাৎ বেরোল দুটো খেই। ব্যস হয়ে গেল দেহ আর দুখানা পা। আরেক ঢেউয়ে তৈরি হল দুখানা হাত আর মুণ্ড। এবারে বৃদ্ধি।’
এই পর্যন্ত বলে জীবন গোঁসাই এক গুরু শিষ্যের জবাবি গান ধরে দেন। দীন শরতের রচনা কি অনবদ্য। শিষ্য বলে,
এমন উল্টা দেশ গুরু কোন জায়গায় আছে
উর্ধ্বপদে হেঁটমুণ্ডে সে দেশের লোক চলতেছে।
সে দেশের যত নদনদী
উর্ধ্ব দিকে জলের স্রোত যায় নিরবধি
আছে নদীর নীচে আকাশ বায়ু
তাতে মানুষ বাস করতেছে॥
সে দেশে যত লোকের বাস
মুখে আহার করে না কেউ নাকে নাই নিঃশ্বাস
মলমূত্র যে ত্যাগ করে না
আবার আহার করে বাঁচতেছে।
স্পষ্টই দেহতত্ত্বের গান। গর্ভবাসকালে মানবসন্তানের বিবরণ। গানটা হঠাৎ থামিয়ে জীবন গোঁসাই ক্ষণ-বিরতির পর শুরুর জবানিতে প্রথম গানের জবাব দিতে লাগলেন আরেক গানে:
মন রে সেই দেশের কথা এখন ভুইলা গিয়াছ।
উর্ধ্বপদে হেঁটমুণ্ডে সে দেশে বাস কইরেছ॥
বিদ্রূপে পিতার মস্তকে ছিলে
কামবশে গর্ভাবাসে প্রবেশ করিলে
শুক্র আর শোণিতে মিলে
বর্তলাকার ধরিয়াছ।
ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোমেতে
হল পঞ্চমাসে পঞ্চপ্রাণ ভৌতিক দেহেতে
সপ্তম মাসে গুরুর কাছে
মহামন্ত্র লাভ করেছ।
চন্দ্র সূর্যের নাইরে প্রকাশ
জলের নীচে অন্ধকারে ছিলে দশ মাস
ছিল নাভিপদ্মে মাতৃনাড়ী।
তাই দিয়ে আহার কইরছ।
দীন শরৎ বলে সাধনার ফলে
অন্ধকার কারাগার হতে এদেশে এলে
মিছে মায়ায় ভুইলে রইলে
যাবার উপায় কি করেছ।
জীবন গোঁসাইয়ের এই গানে কোনও অস্পষ্টতা নেই। কেবল রয়েছে মনুষ্যজন্মের একটা আখ্যান। তার শেষকালে একটা মর্যাল, যেমন থাকে সব ভারতকথায়। মর্যালটার কথা ভাবলে অন্য আরেকটা দিক জেগে ওঠে। মর্যালের সার কথাটা এই যে, বহু যোনি ভ্রমণ শেষে অনেক সাধনায় পেলে মানুষজনম। কিন্তু এদেশে এসেই অর্থাৎ মাটিতে নেমেই মায়ায় ভুলে গেলে তোমার প্রতিজ্ঞা। মানুষ হয়ে মানুষের সাধন করার কথা ছিল গুরুর নির্দেশে আর তুমি আটকে গেলে কামনা কুহকে? এর পরের কথা হল; এখনও উপায় আছে, ধরো খুঁজে নাও ইহজীবনের গুরুকে, শিখে নাও সহজসাধন। মনে রেখো চৈতন্যকেও। এই মানুষ জনম নিয়ে তাঁকেও সহজসাধন করতে হয়েছিল শাটিকে নিয়ে। তবে তাঁর মুক্তি হয়েছে।
এইখানে লালনের সেই গানটার কথা উঠবে যেখানে বলা হয়েছে:
আর কি গৌর আসবে ফিরে
মানুষ ভ’জে যা করো গৌরচাঁদ গিয়েছে সেরে।
এই কথার পূর্বসূত্রে বেছে নেওয়া যায় আরেকটা গান, সেটাও লালনের। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ব্রজ থেকে নদীয়ায় গৌরজন্মের একটা ক্রম ছিল:
ব্রজ ছেড়ে নদেয় এল
তার পূর্বান্তরে খবর ছিল
এবে নদে ছেড়ে কোথা গেল
যে জানো বলো মোরে ॥
চৈতন্যের মৃত্যুর কোনও প্রামাণ্য বাস্তব খবর সত্যিই তো নেই। কোনও চৈতন্য জীবনীতেই জানা যায় না তাঁর অপ্রকট লীলার বর্ণনা। কেউ লেখেন, তিনি জগন্নাথের দেহে মিশে গেছেন, কেউ লেখেন তিনি ভাবাবেশে লীন হলেন মহাসমুদ্রে। একমাত্র জয়ানন্দ লেখেন পুরীতে নৃত্যকালে পায়ে ক্ষত হয়ে তাঁর প্রয়াণ ঘটে। এইখানে লোকধৰ্ম করে এক সহজ সমাধান। তাদের যুক্তির ক্রম এইরকম—চৈতন্য কেন আবির্ভূত হলেন? মানুষকে, মায়াবদ্ধ জীবকে বোঝাতে সহজসাধনের মাহাত্ম্য এবং নিজেও বুঝতে তার গভীরতা। ওইটুকুই শুধু তাঁর জানা হয়নি ব্রজলীলায়, অপূর্ণতা ছিল তাই। কিন্তু সেই সহজসাধনে পূর্ণতা পেয়ে শেষপর্যন্ত চৈতন্য গেলেন কোথায়? তার একটা উত্তর:
কেউ বলে তার নিজ ভজন
করে নিজ দেশে গমন
মনে মনে ভাবে লালন
এবার নিজদেশ বলি কারে॥
চৈতন্য চলে গেলেন তাঁর নিজদেশে, তাঁর সাধনোচিত ধামে। তাঁর তো লোকশিক্ষা দিতেই আসা। সে কাজ সাঙ্গ করে, জাতিবর্ণের ভেদ ঘুচিয়ে, মানুষের মধ্যে ভক্তির আকুলতা এনে, মানুষের সামনে রেখে এক ভাবোন্নত আদর্শ তিনি চলে গেলেন। এখন আমাদের কী হবে? আমরা কেমন করে তাঁকে পাব বুঝব? তাঁকে কীভাবে পাওয়া যাবে? কেবল অনুমানে?
জবাব মিলল গোৱাডাঙা গ্রামে বাউল-ফকির সংঘের সম্মেলনে। পৌষের প্রচণ্ড শীতের মধ্যরাত। চারপাশ নদীয়া-মুর্শিদাবাদের তাবৎ বাউল-ফকিরে ছয়লাপ। গাঁজার গন্ধে বাতাস মত্ত। একটা মোটা কম্বলে জাড় কমছে না কিছুতে। গান ধরেছেন সনাতন দাস। সত্তর বছর পেরোনো উদাসীন। গান তো নয়, যেন আত্মনিবেদন। কতক গান আর কতক বোঝান। গায়ক আবার কথক। হঠাৎ হঠাৎ নেচেও ওঠেন। কী সে নাচ, কত তার আর্তি। গেয়ে উঠলেন:
হিসাব আছে এই মানব-জমিনে
গড়েছে তিন কারিগর মিলিয়ে শহর
টানা দিয়ে তিনগুণে।
শুভাশুভ যোগের কালেতে
জীব মায়াগর্ভে প্রবেশ করে ক্ষিতির পথেতে
উলোট দল কমল যথা বিশেষ মতেতে ॥
মাতৃগর্ভের কথা বলছি গো। তিন কারিগর হল ব্রহ্ম বিষ্ণু মহেশ্বর আর তিন গুণ হল সত্ত্ব রজ তম। উলোট্ দল কমল হল মাতৃগর্ভের ফুল। সেখানেই জীবনের সূচনা গো। এবারে শোনো:
