এখন দেখা যাচ্ছে নৃসিংহের লেখা ‘শ্রীচৈতন্য মহাভাগবতম্’ পুঁথির ৫১ক পৃষ্ঠায় রয়েছে এমন এক তথ্য যে,
‘কায়ব্যূহ’ প্রক্রিয়ার সাহায্যে ‘কামশাস্ত্র প্রবীণ’ গৌরাঙ্গ অসংখ্য নায়িকার সহিত রতিলীলা করিতেন।’*
বলতেই হয় মারাত্মক সংবাদ এবং আহমদ শরীফের মন্তব্যের সঙ্গে কোথায় যেন মিলও রয়েছে ঘটনাটির। অতএব খুঁজতেই হয় আরও। তবে ভাবের পথে নয় পুঁথির জগতে।
একজন কথায় কথায় জানালেন, বার্নিয়া গ্রামের শ্রীনন্দন ঘোষ অনেক কলমি পুঁথির মালিক। মানুষটা কালোকোলো দশাসই। গলার স্বরও বাজখাই। খবর দেওয়া ছিল। বাস থেকে নামতেই আশপাশের সবাইকে জানান দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন আমাকে।
শ্রীনন্দন অচিরে নিয়ে গেলেন তাঁর কুঁড়েয়। বললেন, ‘আমরা সহজিয়া। জানেন তো সহজিয়া বৈষ্ণবদের অনেক ধারা। নিত্যানন্দের স্রোত, পাটুলীর স্রোত, রূপকবিরাজী স্রোত, বীরভদ্রের স্রোত। আমরা পাটুলীর স্রোত। দীক্ষাশিক্ষা পাটুলী ধামে। গোঁসাইয়ের নাম সত্যদেব মহান্ত। তিনি অপ্রকট হয়েছেন গত শ্রাবণে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, আমার কাছে অনেক কলমি পুঁথি আছে। কিন্তু কী জানতে চান? চাঁদের সাধন না করোয়াতত্ত্ব? দেহ কড়চা না রাধাতত্ত্ব?’
অতশত কি জানি? শ্রীচৈতন্যের পরকীয়া সাধনের কোনও হদিশ কি মেলে কোনও পুঁথিতে, জানতে চাইলাম সেইটা। প্রসন্ন হেসে কাঠের সিন্দুক থেকে লাল খেরোয় বাঁধা লম্বাটে এক পুঁথি বার করে মাথায় ঠেকালেন। আমাকে দিয়ে বললেন, ‘মুকুন্দ দাসের লেখা “আদ্য কৌমুদী”। পড়ে দেখুন। টুকে নিন। আছেন তো সারা দিন। সেবা হতে দেরি হবে। ততক্ষণ নাড়াচাড়া করুন পুঁথি। মহাপ্রভুর পরকীয়া সাধনের খবর আছে এই গ্রন্থে।’
অনেকক্ষণ ধরে পড়তে পড়তে হঠাৎ চোখ আটকে গেল আদ্য কৌমুদীর একটি শ্লোকাংশে। সেখানে বলা হচ্ছে:
সন্ন্যাস করিয়া প্রভু সাধে পরকীয়া
সার্বভৌম নন্দিনী শাটি কন্যাকে লইয়া॥
মহাপ্রভুর পরকীয়া শাটি কন্যা লইয়া
অটল রতিতে সাধে সামান্য মানুষ হইয়া ॥
এ সব পড়ে আমি পড়লাম আরও ধন্দে। শাটি কে? বোঝা গেল সার্বভৌম কন্যা। কোন সার্বভৌম? বাসুদেব সার্বভৌম? এমন কথা তো কোথাও পড়িনি। শ্রীনন্দনকে এ কথা জানাতে সে বলল, গৌড়ীয় মতের লোকরা এ সব কথা জানাবেন না স্বভাবতই। এ যে ব্রহ্মচর্যের বিরোধী কথা।
যুক্তি আছে কথাটায়, মনে হল। কিন্তু চৈতন্য কেন সামান্য মানুষ হয়ে অটল সাধন করবেন? এ প্রশ্নের জবাবে তাত্ত্বিক শ্রীনন্দন বেশ প্রত্যয় নিয়ে বলেন, ‘আসল কথাই তো আপনার জানা নেই তাহলে। আপনি জানেন মহাপ্রভুর আবির্ভাবের কারণ? তাঁর তিন বাঞ্ছা?’
‘এ আর জানব না?’ গড়গড় করে বললাম:
‘যাকগে বাংলাতেই বলি। অর্থাৎ শ্রীরাধার প্রণয় মহিমা কেমন। শ্রীরাধার আস্বাদ্য কৃষ্ণের অদ্ভুত মধুরিমা কেমন এবং কৃষ্ণকে অনুভব করে রাধার কেমন সুখ হয় এই তিন বাঞ্ছার অভিলাষে গৌরাঙ্গের জন্ম নবদ্বীপে, শচীসিন্ধুগর্ভে।’
শ্রীনন্দন বললেন, ‘এ কথা কোথায় পেলেন? কে বলেছে?’
: কেন? শাস্ত্রে আছে। স্বরূপ দামোদরের লেখা।
: ধুস্। ও শাস্ত্র মানছে কে? ও তো বামুন-বোষ্টমের লেখা শাস্তর। সব বাজে। সব বাহ্য। আসল কারণ শুনবেন—মহাপ্রভু কেন এলেন নবদ্বীপে? তবে শুনুন।
গুনগুন করে উঠল প্রথমে সুর। তারপর বাণী:
বৃন্দাবনে রসরাজ ছিল
রসের তাক না বুঝে ধাক্কা খেয়ে
নদেতে এল।
এই এক আশ্চর্য। কেবল গান আর গান। লোকধর্মের লজিকগুলো সবই গানে গাঁথা। কিন্তু ব্ৰজে বৃন্দাবনে কৃষ্ণ কোন রসের তাক বোঝেননি যার জন্যে তাঁর নবদ্বীপে লীলা? গান থামাতেই হল। বাধা দিয়ে বললাম, ‘কী সব গাইছেন? ব্রজধামে নন্দের নন্দনের কীসের অভাব ছিল?’
: জানেন না? তাঁর ছিল না সহজ স্বভাব তাই করতে পারেননি সহজসাধনা। ঈশ্বরের কি সহজ স্বভাব হতে পারে? কী করে হবে? পিতামাতার কামনায় রজবীজে জন্ম হয়নি তাঁর। তাই স্বভাবে কামনা-শূন্য। কাম-ছাড়া প্রেমের উদ্দীপন নেই। প্রেম ছাড়া সহজ সাধন হয় না। তাই তাঁকে জন্মাতে হল নদীয়ায়। রজবীজে জন্ম এবার। কামনাময় দেহধর্ম। সেই কামনাকে অতিক্রম করতে নিলেন সন্ন্যাস। শাটিকে নিয়ে পরকীয়াসাধনে এবারে হল সহজানন্দ। তিন বাঞ্ছা শুনুন এবারে গানে,
এক, ওরে আমি কটিতে কৌপীন পরবো।
দুই, করেতে করঙ্গ নেবো।
তিন, মনের মানুষ মনে রাখবো।
এবারে বুঝলেন শেষ বাঞ্ছটাই আসল, ‘মনের মানুষ মনে রাখবো’।
বুঝলাম, অচৈতন্য থেকে ক্রমশ সচৈতন্য হচ্ছি। বাড়ি এসে শাটি কন্যার খোঁজে আরও অনেক বইপত্তর ঘাঁটতে লাগলাম। না, বৈষ্ণব শাস্ত্র নয়। নিতান্ত সহজিয়া সব পদাবলী বা ফকিরি গানের সংকলন উলটোতে উলটোতে দুদ্দু শাহের গানে পেয়ে গেলাম শাটি প্রসঙ্গ। কী রোমাঞ্চ। তা হলে তো শুধু পাটুলীস্রোতেই নয়, মারফতি গানেও। এই যে রয়েছে।
শাটি সে গোবিন্দচাঁদের পরকীয়া কয়।
কোন চাঁদ সাধিতে গোরা শাটির কাছে যায়।
ধরে শাটির রাঙা চরণ
সোধে নয় সহজ সাধন।
কিন্তু এরপরেই লোকগীতিকার স্ববিরোধ তুলে ধরে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে। জানতে চায়:
ত্রিজগৎ যাহাতে কাঙাল
তারই তরে গোরা বেহাল।
তবে নারীত্যাগের ভেজাল
কেন গোরা দেয়?
বাস্তবিকই খুব জ্বলন্ত প্রশ্ন। স্বর্গ মর্ত্য পাতালের সব প্রাণী যে সঙ্গমসুখের কাঙাল, স্বয়ং গৌরাঙ্গ যে নারীর সাহচর্যে বেহাল, সেই মানুষই কেমন করে দিতে পারে নারীত্যাগের পরামর্শ? এর মধ্যে তবে কি ভেজাল আছে কিছু? মনে পড়ে গেল এলা ফকিরের অনুমান। প্রকৃতিত্যাগের নির্দেশ বোধহয় মহাপ্রভু দেননি। ও সব বৃন্দাবনের ছয় গোস্বামীর কূটকচাল। হবেও না। কিন্তু আমার মন জানতে চায় অন্য একটা কথা। রজবীজে জন্ম বলে মানুষের মধ্যে থাকে কামনার সংস্কার—এ কথায় একটা স্পষ্ট জীবনবোধ আর সুস্থ যৌনতার স্বীকৃতি রয়ে গেছে।
