না জেনে করণ কারণ কথায় কী হবে
কথায় যদি ফলে কৃষি তবে বীজ কেন রোপে?’
আমি বললাম, ‘তার সঙ্গে হরিনামের কী? নামের শক্তি জানেন?’
এলা আমার কথার জবাব না দিয়ে গানের অন্তরাটা ধরলে বেশ তান লাগিয়ে:
‘গুড় বললে কি মুখ মিঠা হয়?
দিন না জানলে আঁধার কি যায়?
তেমনই জেনো হরি বলায়
হরি কি পাবে?
কী বুঝলে?
: বুঝলাম শুধু হরি হরি বললেই হবে না। বুঝতে হবে তার মর্ম।
: উঁহু, শুধু মর্ম বুঝলেই হবে না। বুঝতে হবে তাঁর অবস্থান। অর্থাৎ কিনা দেহের কোথায় আছেন হরি, কী তাঁর কাজ কারবার।
আমি বললাম, ‘সে সব বোঝার উপায় কী?’
: ওইখানটাতেই গুরুর দরকার। গুরু ছাড়া গৌরকে বোঝা অসম্ভব। সেইজন্যই লালন বলে,
গুরু ছেড়ে গৌর ভজে
তাতে নরকে মজে।
আমার মনে হল চৈতন্যকে বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মকে এতদিন যেমন করে বুঝে এসেছি তার উলটো একটা দিকও তা হলে আছে। এলা ফকির খুব কৌশলে আমাকে টানতে চাইছে সেদিকে। প্রথমে সে বোঝাল মূর্তিপূজা নিষ্ফল, তারপর দেখাল হরিনামের অন্তঃসার কত কম। কিন্তু গৌড়ীয় মতে যে নৈষ্ঠিক সাধনা সে কি ভুল? সমান্তরাল সাধনা কি হয় না? কথাটা আরেক দিন এলার কাছে তুলতে সে তো হেসেই আকুল। বলে, ‘সত্য কি দুরকম হয়? ফলাফল আলাদা হতে পারে অবশ্য।’
‘কীরকম?’ আমি জানতে চাই।
: পাত্রভেদে ফলাফল জানিয়ে নিশ্চয়। ভাল বীজ যদি পাষাণে রোপন কর তবে কি শস্য হবে? তেমনই দই যদি রাখ তামার পাত্রে তবে বিষ হয়ে যাবে। একটা গানে বলছে সিংহের দুগ্ধ মাটির ভাণ্ডে টিকে না। তা হলে? সিংহের দুগ্ধ রয়না দ্যাখো স্বর্ণপাত্র বিহনে। এবারে বুঝলে পাত্রভেদে ফলাফলের ভেদ?
: বুঝলাম। কিন্তু চৈতন্যকে দুরকমভাবে সাধনা করা কি যায় না? নৈষ্ঠিক বৈষ্ণবরা যদি শুদ্ধাচারে দারু বিগ্রহে বা নামাশ্রয়ে সাধনা করে তবে ক্ষতি কী?
: ক্ষতি? শোনো লালনের জবানিতে। সে বলছে,
যে স্তনের দুগ্ধ খায়রে শিশু ছেলে
জোঁকে মুখ লাগালে রক্ত এসে মেলে।
আমি চমকে উঠে বললাম, ‘কী সাংঘাতিক যুক্তির দাপট। এখানে তবে পাত্রভেদে নয়, অধিকারী ভেদ। দুধও সত্য রক্তও সত্য। কিন্তু অধিকারী ভেদে ভিন্ন ফলপ্রাপ্তি। বেশ। তা তোমরা যেভাবে চৈতন্যকে বুঝছ সেটাই ঠিক আর ওদেরটা বেঠিক? কী করে নিঃসংশয়ে বুঝলে?
: বুঝলাম আমরা মানুষকে ধরেছি বলে। ওই জন্যে আমাদের ডোর কৌপীন, তিলক, মালা, ব্রহ্মচর্য, বৃন্দাবন, মথুরা কিছুই লাগে না। আমরা বরং বলি,
সত্য বলে জেনে নাও এই মানুষলীলা।
ছেড়ে দাও নেংটি পরে হরি হরি বলা ॥
: বেশ বুঝলাম। তা ব্রহ্মচর্যে আপত্তি কোথায়? সব ধর্মে ত্যাগ বৈরাগ্য ব্রহ্মচর্যের খুব বড় সম্মান।
: সম্মান কে করে? তোমরাই ব্রহ্মচারী হও আবার তোমরাই বলিহারি দাও। আমরা দিইনে। প্রকৃতি ছাড়া জীবন চলে কি? এলে কোথা থেকে? সয়ো থেকে ভুঁইয়ে পড়লে না মা-র কোলে জন্মেছ? সেই মা কে? তোমার বাবার প্রকৃতি নয়? ‘পুরুষের লক্ষণ প্রকৃতিআশ্রয়’, আমরা বলি। তা ছাড়া প্রকৃতি ছেড়ে নেংটি পরে যাবা কোথায়, কদ্দূর? একটা সার কথা শুনবে? স্বয়ং মহাপ্রভু প্রকৃতিসঙ্গ করেছিলেন। লক্ষ্মীপ্রিয়া আর বিষ্ণুপ্রিয়া। অদ্বৈতর ছিল দুই প্রকৃতি। নিত্যানন্দরও তাই। তুমি তো অনেক লেখাপড়া করেছ, বলো তো চৈতন্যের আগে পরে কজন ব্রহ্মচারী ছিল?
আমি গুনে গেঁথে বললাম, ‘সে কথা ঠিক। শ্রীনিবাস আচার্যর দুই পত্নী আর শ্যামানন্দের তো তিনজন। রূপ, সনাতন, শ্রীজীব ছিলেন ব্রহ্মচারী।’ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে এলা বলে, ‘অ্যাই, এবারে তুমি ধরেছ ঠিক। প্রকৃতি ত্যাগের ভুলটা ওরাই চালু করেছে। মহাপ্রভু কখনই ওকথা বলেননি। জানো, তাঁর পার্ষদ রামানন্দ রায় দুজন সেবাদাসী নিয়ে সাধনা করতেন। চৈতন্য কি তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন না তার সঙ্গেই সবচেয়ে গুহ্য আলাপ করতেন? যাই হোক, তুমি বাপু তোমার বইপত্র ঘেঁটে দ্যাখো আমার কথা ঠিক না বেঠিক।ֹ’
বইপত্র ঘেঁটে যা পেলাম তা অবশ্য এল ফকিরকে বলা হয় না আমার। কেন না ততদিনে সে মাটির তলায়। কিন্তু ঘাঁটতে গিয়ে যা সব জানা গেল সেও তো কম রোমাঞ্চকর নয়। প্রথমে নজরে পড়ল ঢাকার বাংলা একাডেমি পত্রিকার মাঘ-চৈত্র ১৩৭০ সংখ্যায় বাংলাদেশের নামকরা পণ্ডিত আহমদ শরীফের একটি নিবন্ধে আশ্চর্য এক উক্তি। শরীফ লিখেছেন:
জনশ্রুতিজাত ধারণা স্বয়ং চৈতন্যদেবের একটি গুহ্য সাধন প্রণালী ছিল। এই সাধনা ছিল পরকীয়া মৈথুনাত্মক।
এর চেয়েও বিস্ফোরক খবর পাওয়া গেল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার ৯১ বর্ষের ১ম সংখ্যার এক নিবন্ধে। সেখানে অধ্যাপক রমাকান্ত চক্রবর্তী নৃসিংহের লেখা এক চৈতন্য জীবনীর পরিচয় দিয়েছেন। নৃসিংহ লিখেছেন সংস্কৃতে ‘শ্রী চৈতন্য মহাভাগবতম্’ পুঁথি। কলকাতার বাঞ্ছারাম অক্রুর লেনের গোপীনাথ আঢ্য মশাই পুঁথিটি দান করেছিলেন। সাহিত্য পরিষদে। অন্ধকার পরিষদ প্রকোষ্ঠ থেকে পুঁথির উদ্ধার করে পরিচয় দিয়েছেন রমাকান্তবাবু। রচনাকাল ১৬৬৫ সাল। বইটি অর্বাচীন তো বটেই। কিন্তু রমাকান্ত চক্রবর্তীর এই মন্তব্যও যথার্থ যে, ‘একটি স্থানীয়, মিশ্র, এবং হয়তো সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে কোন অর্বাচীন বৈষ্ণব গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ গৌরাঙ্গ লীলার একটি বিচিত্র ভাষ্যরূপে যথেষ্ট মূল্যবান।’
