আমি সচকিত হয়ে বললাম, ‘তবে কি চৈতন্য মানে আমরা যা বুঝি তা নয়? অদ্বৈত নিত্যানন্দ এ সবেরও কি অন্য মানে আছে নাকি?’
মুচকি হেসে প্রাণকৃষ্ণ গুনগুন করেন:
যে-রাধাকৃষ্ণের কথা পদে গায়
সে তো বৃন্দাবনের কৃষ্ণ রাধা নয় ॥
আমি বললাম, ‘এ কী? এ পদ কি এক্ষুনি মুখে মুখে বানালেন না কি?’
গোঁসাই খিল খিল করে হেসে বললেন, ‘কী? আয়নাটা ভেঙে গেল তো?’
: আয়না?
: হ্যাঁ, একখানা বড় আয়না ছিল। তাতে একখানা সূর্য দেখা যেত। এবার? হাত থেকে আয়নাটা হঠাৎ পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এখন কী হবে? আর তো একখানা সূর্য দেখা যাবে না। যত টুকরো তত সূর্য, তাই নয়?
প্রাণকৃষ্ণ আস্তে আস্তে উঠে যান তাঁর আখড়ার দিকে। সাদা আলখাল্লা পরা উদাসীন। শুভ্র জটাজুট। হঠাৎ আবার কাছে ফিরে এসে আমার বিভ্রান্ত মুখের দিকে খর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘শাস্ত্র পড়ে কতটুকু জানবে? সব শাস্ত্রই কি মান্য? কবিরাজ গোঁসাই শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত লিখেছিলেন। জানো কি সে সম্বন্ধে কেউ কেউ কী বলে? বলে,
চৈতন্যচরিতামৃত
কারো কারো লাগে তিতো।
তা হলে? কোনও গ্রন্থই অকাট্য নয়। অকাট্য সেই পরমতত্ত্ব। তোমাকে কী বলি বলো? সংশয় পথের পথিক তুমি। আর আমি ভাবের পথিক। অচৈতন্য আছ, সচৈতন্য হও।’
সেই শুরু। তা দু’দশকের বেশি বই কম নয়। সচৈতন্য হবার চেষ্টা আমার যবে থেকে শুরু তখন ধারে কাছে কোথাও চৈতন্যের পাঁচশত বছরের দুন্দুভি বাজেনি। অর্থাৎ আমার চৈতন্য প্রাপ্তির পথটি ছিল বড়ই নিঃসঙ্গ। কিন্তু আর একটা কথাও বলা দরকার। গোঁসাই মশায়ের বলা অচৈতন্য থেকে সচৈতন্য হওয়া বরং সহজ কিন্তু একটা মতামত তৈরি হয়ে গেলে তাকে ভেঙে নতুন মত গড়া কঠিন। বৈষ্ণবতা আর চৈতন্যবাদ বিষয়ে অনেকটাই যে ধারণা তৈরি হয়েছিল আমার মনে আগে থেকেই, তাকে কি বদলানো সোজা? যেমন একটা গান যদি একবার ভুল সুরে শেখা হয়ে গিয়ে থাকে তবে সেই সুর ভুলে শুদ্ধ সুর আয়ত্ত করা কঠিনতর। আমায় এই ব্যাপারটা পদে পদে বাধা দিল। সুশীল দে-র লেখা ‘An early history of Vaisnava faith and movement’, শশিভূষণ দাশগুপ্তর ‘শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ: দর্শনে ও সাহিত্যে’ কিংবা বিমানবিহারী মজুমদারের ‘শ্রীচৈতন্য চরিত্রের উপাদান’ রাধাগোবিন্দ নাথের ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের ভূমিকা’যে কখনও মন দিয়ে পড়েছে তার পক্ষে কি সম্ভব সেই পুরনো পড়া ভুলে যাওয়া? সেই সঙ্গে পরে পরে পড়ে নিয়েছি কেনেডি বা ডিমক সাহেবের ইংরাজি বই। প্রয়োজনে ঘেঁটেছি হরিদাস দাসের ‘শ্রীগৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান’ মণীন্দ্রমোহন বসুর ‘সহজিয়া সাহিত্য’। উলটে পালটে বুঝতে চেয়েছি ‘হরিভক্তিবিলাস’কিংবা ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’। এ সবই কি বাহ্য পথ? তা হলেও ক্রমে বুঝতে পারি চৈতন্যকে বোঝবার দুটো খুব সোজা পথ আছে। একটা হল পণ্ডিতদের বই পড়ে বোঝা, আরেকটা বৈষ্ণব নৈষ্ঠিকমতে দীক্ষা নিয়ে আচরণের পথে বোঝা। প্রথম পথটা আমার খানিক জানা ছিল, দ্বিতীয় পথটা আমার পক্ষে জটিল। কেননা আমার তো অন্তরে ভক্তির আকুলতা নেই, দীক্ষা নেব কেন? কিন্তু হঠাৎ কোথাও কিছু নেই খুলে গেল তৃতীয় একটা পথ। সহজিয়া পথ। প্রায় তৃতীয় নয়নের মতো সে পথ এমন সব কথা আমাকে জানান দিল যা কোনওদিন যে জানব ভাবিনি।
বেথুয়াডহরি স্টেশনের পরের স্টেশন সোনাডাঙা। সেই সোনাডাঙার রেলগুমটির গায়ে একটা অন্ধকার ঘরে থাকত এলা ফকির। অন্ধ ফকির কিন্তু মনটা ছিল ঝলমলে। আমাকে প্রথম দিন বলল, ‘যদি গোরাকে জানতে চাও তো লালনের পদ পড়ো ভাল করে।’
আমি বললাম, ‘সে কী? ফকিরের চোখ দিয়ে বৈষ্ণবকে বুঝব?’
এলা অন্ধ চোখের হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘সে-ই তো আদি ফকির গো। গোরা ফকির। মাথা মুড়িয়ে কস্থা নিয়ে করঙ্গ হাতে গৌরাঙ্গই আদি ফকির। লালন বলছে,
শুনে অজানা এক মানুষের কথা
গৌরচাঁদ মুড়ালেন মাথা।
কী বুঝলে? অজানা মানুষ কিনা আলেখ। তার খবর পেয়েই গৌরাঙ্গের সন্ন্যাস। তো তুমি প্রথমে লালন পড়া। কিন্তু তার আগে তীর্থগুলো দ্যাখো। নবদ্বীপ শান্তিপুর বাগনাপাড়া কালনা কাটোয়া কেঁদুলি ফুলিয়া অগ্রদ্বীপ শ্রীখণ্ড খড়দহ গুপ্তিপাড়া জিরাট মঙ্গলডিহি গোপীবল্লভপুর এ সব দেখেছ?’
আমি বললাম, ‘কিছু দেখেছি কিছু দেখিনি কিন্তু তীর্থ ঘুরে কী পাব? লালন যে বলেছেন ‘ওসব তীর্থব্রতের কর্ম নয়’ তা হলে?’
এলা বলল, ‘তীর্থব্রত কাদের জন্য নয় জানো? যাদের আপ্ততত্ত্ব সারা হয়েছে। তোমার তো পরতত্ত্বই জানা হয়নি। ও সব ধন্দ ছাড়ো। আগে তীর্থগুলো পরিক্রমা করে তারপরে এসো।’
আমি এমনই করে কত জায়গায় কত দিন ঘুরে ঘুরে বৈষ্ণবদের ভোগরাগ, সেবাপূজা, পঞ্চতত্ত্ব সব বুঝে এলা ফকিরের কাছে আবার গেলাম।
ফকির বললে, ‘বুঝলে সব? দেখলে সব বাহ্যের সাধন? মন্দিরে দেখলে তো গৌরাঙ্গকে শয়ন দিচ্ছে আবার জাগাচ্ছে? কাঠের মূর্তি আর ছবি পুজো দেখলে? রসকলির ছাপ দেখলে? ডোরকৌপীন দেখলে? তা কেমন লাগল?’
: ভালই তো। বেশ ভক্তি ভাবে আছেন সব। গ্রন্থ পড়ছেন। কীর্তন হচ্ছে।
: কোন কীর্তন আসল।
: কেন? নামকীর্তন। হরি নামেই মুক্তি কলিযুগে।
‘তাই নাকি?’ এলা ফকির সন্দিগ্ধ হাসল। ‘তা হলে হরি বললেই হবে? এবারে তা হলে শোনো লালন কী বলে:
