গোরাডাঙা গ্রামের প্রান্তে বাসস্টপ। দাঁড়িয়ে আছি একা। হঠাৎ এগিয়ে এলেন এক গ্রামবাসী। নাম বললেন রমজান খাঁ। বাসস্টপের কাছে একটা ঘর নিয়ে হোমিওপ্যাথি করেন। দেখলেই বোঝা যায় আত্মতুষ্ট মানুষ। প্রাথমিক আলাপ-পরিচয়ের পর বললাম, ‘কেমন আছেন আপনারা এই গ্রামে?’
‘খুব ভাল’ বললেন রমজান, আমরা খুব মিলে মিশে আনন্দে থাকি। খুব একটা অভাব নেই। রাজনৈতিক গোলমাল নেই। মানুষজন শান্তিপ্রিয়।’
: কিন্তু আমরা যে শুনি গ্রামে লোকে খুব কষ্টে বাস করে? খুব দারিদ্র্য, দারুণ কষ্ট।
: সে কী? আমরা তো শহরে গেলে আপনাদের জন্যেই কষ্ট পাই। গাদাগাদি করে ঘিঞ্জির মধ্যে বাস করেন। পথঘাট দারুণ নোংরা। কেউ কাউকে দেখেন না। একজন খেতে না পেলেও খবর নেন না। মারামারি খুন জখম ছিনতাই ধর্মঘট বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সত্যি আপনাদের নিয়ে আমরা আলোচনা করি মাঝে মাঝে। কত কষ্টে বেঁচে আছেন।
ইতিমধ্যে মনজুর এসে দাঁড়িয়েছে সাইকেল নিয়ে। সে পাশের গ্রামে যাবে। আমায় দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। রমজান বললেন, বুঝলে মনজুর, এঁকে এতক্ষণ বলছিলাম যে শহর কত খারাপ। কী সুখে এঁরা সব থাকেন সেখানে। তোমার মনে আছে মনজুর, গত পৌষ মাসে পশ্চিম পাড়ার আলতাফের বুড়ি দাদী শীতে কষ্ট পাচ্ছিলেন, আমরা সব চাঁদা তুলে লেপ বানিয়ে দিলাম? বুঝলেন, আমাদের গ্রামে কেউ উপোসী থাকে না। কেউ খেতে পায়নি শুনলে আমরা কোনও-না-কোনও বাড়ি থেকে তার খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিই। আর আপনাদের শহরে?’
আমি খুব অবাক হয়ে রমজানকে কিছুক্ষণ দেখলাম। লোকটা তার্কিক না ঝগড়াটে? সরল ভাল মানুষ না অতি চতুর? নাঃ মুখে তো কোনও শয়তানি ছাপ নেই। বেশ সহজ আত্মতুষ্ট ভাব।
বললাম: ‘বেশ আছেন তা হলে। খুব ভাল। কিন্তু মনজুরদের মতো সচ্ছল গেরস্থ বাড়িতে গোরু রাখার উপায় নেই, সাত টাকা দিয়ে দুধ কিনতে হয়। আম নেই। মাছ পাওয়া যায় না। কেরোসিন মহার্ঘ। বাড়িতে কাজের লোক মেলে না। খবর নিয়েছি গ্রামে ডাক্তার নেই, লাইব্রেরি নেই। খবরের কাগজ আসে না। মিষ্টি কিনতে হলে যেতে হয় সেই নাজিরপুরে। আচ্ছা, রমজানভাই, আমরা তো গ্রাম বলতে শুনি প্রাচুর্য, অপচয় আর বিস্তার। আচ্ছা বলুন তো, মানুষের জীবনের ধর্ম গুটিয়ে যাওয়া না বিকশিত হওয়া সব দিকে? এই যে আপনারা মেনে নিয়েছেন কখনও দুধ খাবেন না, মাছ খাবেন না, আম পাবেন না, মিষ্টি পাবেন না, বই পড়বেন না, কাগজ পাবেন না এটাই কি জীবন? একেই ভাল থাকা বলে? এর একটাও তো আমরা মেনে নিইনি। আপনারা সত্যিই ভাল আছেন বলছেন?’
মনজুর খাঁ আর রমজান খাঁ খানিক মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপরে মনজুর বলল, ‘তাই তো রমজান চাচা, আমরা তো মোটেই ভাল নেই। কিন্তু সেটা তো বুঝতে পারি না।’
কথা শেষ হবার আগেই বাস এসে গেল। তাতে উঠে বসে শেষবারের মতো চাইলাম গোরাডাঙা গ্রাম আর বিভ্রান্ত রমজান ও মনজুরের দিকে। ধাবমান বাস দ্রুত ছিন্ন করল আলোহীন নিস্তব্ধ নিস্তেল বাংলার লক্ষ গ্রামের একটির সঙ্গে আমার শীর্ণ সম্পর্ক।
১.৫ গৌরাঙ্গের মর্ম লোকে বুঝিতে নারিলা
বইয়ের পাতা থেকে পাওয়া অজ্ঞান আর পথচলতি জীবন থেকে উঠে আসা জ্ঞানে কত তফাত। সেই কত দিন আগে ভাষাতত্বের ক্লাসে পড়েছিলাম সেমানটিক্স্ অর্থাৎ কিনা শব্দার্থতত্ত্ব। শব্দের এখন যে-অর্থ আমরা জানি, আদৌ সে-শব্দের অর্থ নাকি অনেক সময় থাকে আলাদা। তার কারণ উচ্চবর্গের মানুষ হয়তো তৈরি করল একটা শব্দ আর নিম্নবর্গের মানুষ সেই শব্দ ব্যবহার করতে করতে মুখে মুখে মানেটাই দিল পালটে। ভারী সুন্দর একটা উদাহরণ মনে পড়ছে, সেই কবেকার ছোটবেলায় পড়া: ‘উট চলেছে মুখটি তুলে/ ঊর্ণনাভ ঊর্ধ্বে ঝুলে।’ ঊর্ণনাভ, যাকে বলে মাকড়শা। সেমানটিক্স পড়তে গিয়ে জানলাম ঊর্ণনাভ নয়, কথাটা মূলে ছিল ঊর্ণবাভ। বয়নার্থক বভ্ ধাতু থেকে তৈরি শব্দ। ঊর্ণা বোনে যে। কিন্তু হলে কী হবে, সাধারণ মানুষের ধারণা হল মাকড়শার নাভি থেকে একরকম রস বেরিয়ে জাল তৈরি হয়। বাস ঊর্ণবাভ হয়ে গেল ঊর্ণনাভ। অশিক্ষিত মানুষের এ সব হালচাল, যারা নাকি উচ্চারণকেই বলে উশ্চারণ, অধ্যাপকমশাই খুব ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছিলেন তাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজকর্মের আরও নানা নমুনা। তখন জানতে পারিনি যে, উচ্চারণ যারা বাঁকায়, যারা উলটে পালটে দেয় অর্থ সেই সব মানুষদেরও আবার পণ্ডিতদের বিষয়ে এরকম ঠোঁট বাঁকানো আছে।
কাটোয়ার কিছু দূরের এক গ্রামে থাকেন প্রাণকৃষ্ণ গোঁসাই। সহজিয়া বৈষ্ণব। হেসে বললেন, ‘কৃষ্ণ মানে কী?’
বৈষ্ণব-শাস্ত্ৰ-পড়া চুলবুলে পণ্ডিতকে আর পায় কে? বুক ফুলিয়ে বললাম: ‘কৃষ্ণস্তু ভগবানস্বয়ম্।’
: কী করে জানলেন?
: বৈষ্ণব শাস্ত্রে লেখা আছে। উজ্জ্বল নীলমণি…
গোঁসাই থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘থামুন থামুন। ও তো অনুমানের কথা। আমরা বর্তমানের ধারায় চলি। এবারে শুনুন, কৃষ্ণ মানে ভগবান নয়, কৃষ্ণ মানে মানুষ। কৃষ্ণ মানে যে কর্ষণ করতে পারে। কৃষ্ণ মানে ক্ষেত্রজ্ঞ পুরুষ। যে ক্ষেত্র বুঝে কর্ষণ করতে পারে। বুনতে পারে বীজ। বীজ মানেও কৃষ্ণ, অর্থাৎ বিন্দু। বুঝলেন?’
অতল জলে ডুবতে ডুবতে বললাম, ‘তা হলে রাধা কে?’
: রাধা? রাধা হল ক্ষেত্র।
