সন্ধের আগেই চলে যাব শুনে সবাই মনঃক্ষুন্ন হলেন। মনজুর এনে দিল চালের গুঁড়োর রুটি, খেজুর গুড়ের পায়েস। খেতে খেতে বললাম, ‘বাড়িতে তো গোরু নেই, পায়েসের দুধ কিনতে হল তো?’
মনজুর লাজুক মুখে মাথা নিচু করল।
: কত করে দাম নিল?
: সাত টাকা লিটার।
: এই অজ পাড়াগাঁয় সাত টাকা লিটার দুধ? আমরা শহরে এর চেয়ে সস্তায় ভাল দুধ পাই। আচ্ছা মনজুর, এদিককার বাগানের আম সবই কাঁচাই ভেঙে নিয়ে যায় ভেণ্ডারে, তাই নয়?
: হ্যাঁ, গাছে আম থাকার জো নেই। সব চুরি হয়ে যাবে।
: মাছ যা ওঠে তা-ও তো চলে যায় শহর-বাজারে?
: হ্যাঁ, টানা বাস আছে তো! তা ছাড়া শহরে ভাল দাম পায়। গ্রামের মানুষ তো অত দাম দিয়ে কিনতে পারবে না।
: আর কেরাসিন তেল?
: রেশনে সামান্য পাওয়া যায়। ব্ল্যাকে কিনতে হয়।
মযহারুল খাঁ আবার এসে বসলেন। বললেন, ‘এভাবে এলে কি হয়? ভাবলাম থাকবেন অন্তত রাতটুকুন। মনজুর-খৈবরদের গান শোনাব। যাকগে। আবার আসবেন যখন বলছেন তখন সে ভরসায় থাকবে বসে এই গরিব ফকির মানুষটা। আপনি এলেন তাই তত্ত্বকথা দুটো হল। এখানে আলাপ-আলোচনার তেমন মানুষজন কই? তা আপনি যা সব জানতে চান তার জবাবে সন্তুষ্ট হলেন তো? আমরা তো লেখাপড়া করিনি, কথাও গুছিয়ে বলতে পারিনে। অবশ্য জিজ্ঞাসারও শেষ নেই মানুষের। কী একেবারে চুপ মেরে গেলেন যে?’
বললাম, ‘না চুপ করছি না। প্রশ্নেরও শেষ নেই। কিন্তু একনাগাড়ে তো সকাল থেকে শুধু জিজ্ঞেস করে যাচ্ছি। শুধুই বকাচ্ছি আপনাকে।’
‘কিছু না, কিছু না’ মযহারুল বললেন, ‘আমি সে রকম জ্ঞানী নই যে সব ভেতরে লুকিয়ে রাখব। আমি জানি যেটুকু বলতে সবসময়ে রাজি, তবে পাত্র বুঝে। বলুন আর কী প্রশ্ন? আপনার যাবার সময়ও তো ঘনিয়ে এল এদিকে।’
আমার মাথায় ছিল বিমল বাউলের বলা সেই কুমারী মেয়ের প্রথম রজঃ দানের কথাটা। বলতে গেলে লোকধর্মের সবচেয়ে নিগূঢ় গোপন প্রসঙ্গ। তবে বিমল খবরটাই শুধু দিতে পেরেছিল, বিশ্লেষণ করতে পারেনি। তার পক্ষে তা সম্ভবও ছিল না। মযহারুলের মতো তত্ত্বজ্ঞানীর কাছে প্রশ্নটা রাখতে লোভ লাগল। খুব গুছিয়ে ভেবে চিন্তে সম্রম নিয়ে প্রশ্ন করতেই মযহারুলের মুখটা বিচিত্র উদ্ভাসে ভরে উঠল। খুব অনুচ্চ স্বরে বললেন,
‘কোটি জন্মের যায় পিপাসা
বিন্দুমাত্র জলপানে।’
বলেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন।
‘কী হল?’ আমি বললাম, ‘আপনার মনে কোনও আঘাত দিলাম নাকি অজান্তে? তা হলে থাক ওই প্রসঙ্গ।’
: না ও সব কিছু নয়। আমার মনের একটা খুব নরম জায়গায় ঘা লেগেছে। না না, তাতে আপনার কোনও দায় নেই। যাক গে, যে কথা আপনি বলছিলেন। কুমারী মেয়ের প্রথম রজস্নানের কথা বলছিলেন না? সে খুব পবিত্র জিনিস। অনেক ভাগ্যে সেই বস্তু মেলে বাউল-ফকিরের কপালে।।
বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘সত্যি? কথাটা তা হলে অলীক নয়?’
: অলীক? হ্যাঁ, একদিক থেকে ভাবলে অলীকই তো। বিনা মেঘে বর্ষণ বলে কথা। শুনবেন লালনের সেই গান?
বিনা মেঘে বরষে বারি
শুদ্ধ রসিক হলে মর্ম জানে তারি।
ও তার নাই সকাল বিকাল
নাহি তার কালাকাল
অবধারি।
মেঘ মেঘেতে সৃষ্টির কারবার
তারাও সকল ইন্দ্ররাজার
আজ্ঞাকারী।
নীরসে সুরস ঝোরে
সবাই কি তা জানতে পারে
সাঁইর কারিগুরি।
ও তার এক বিন্দু পরশে।
সে জীব অনায়াসে
হয় অমরী।
কিছু বুঝলেন?
: কিছু বুঝলাম। কিছু অস্পষ্ট থেকে গেল। বিনা মেঘে যে বারিবর্ষণের কথা বলা হয়েছে তাই কি কুমারী মেয়ের প্রথম রজঃ। সেই জন্যেই বুঝি বলা হল ‘তার নাই সকাল বিকাল নাই তার কালাকাল?’
: হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছেন। এ কথাটাও বোধহয় বুঝলেন, ‘মেঘ মেঘেতে সৃষ্টির কারবার?’
: এবারে বুঝলাম। দেখুন তো বুঝলাম কিনা। বলা হচ্ছে ইন্দ্রের আজ্ঞায় মেঘ বৃষ্টি দেয় তবে সৃষ্টির কারবার চলে। তেমনই সাইয়ের কারিগরিতে যে রসের সঞ্চার হয় তার থেকেই তো জীবনসৃষ্টির কারবার। নারীর রজঃ প্রবৃত্তির শুরু মানেই তার জন্মদানের সম্ভাবনারও শুরু। তাই নয়?
এইভাবে বিশ্লেষণ করে চলেছি আর রোমাঞ্চ হচ্ছে ভেতর ভেতর। খুবই কি আশ্চর্য নয় যে পুঁথি পড়া বিদ্যে সম্বল করে আমি কেমন অনায়াসে বুঝে যাচ্ছি লোকধর্মের কঠিনতম অতল রহস্য! এইখানেই বোঝা যাচ্ছে গুরুর প্রয়োজন এই ধর্মে কতটা। আগে শুনেছিলাম বাউলতত্বে ‘বরজখ’ বলে একটা শব্দ আছে। ‘বরজখ’ মানে স্বর্গমর্তের মাঝামাঝি একটা জায়গা। শেষ বিচারের অপেক্ষায় আত্মারা সেইখানে বাস করে। মারফতিরা গুরুকে বলেন ‘বরজখ’। কেন না গুরুই মানুষ আর ঈশ্বরের মধ্যে সংযোগ করেন। আজকে সকাল থেকে এত গাঢ় জীবনের তাপ মনে লাগছে তার মূলে মযহারুল খাঁ-র সঙ্গ আর ইঙ্গিত। এ সব গান তো ‘লালন গীতিকা’য় আগেই পড়েছি কিন্তু বুঝিনি একবিন্দু। মযহারুল খুব বড় বরজখ সন্দেহ নেই।
বরজখের মতো দৃঢ়মূল বিশ্বাসের স্বরে মযহারুল বললেন, ‘সেই পবিত্র রজের এক বিন্দু স্বাদস্পর্শ পেলে মানুষ হয় অমর এই বিশ্বাস আমাদের। সেইজন্যেই বাউল-ফকিররা তাদের দলে সর্বদাই রাখে কিশোরী মেয়েদের। সদাসর্বদা নজর রাখে তাদের দিকে। রজ শুরুর প্রথম বিন্দু পান করতে পারলে বিপুল শক্তি আসে শরীর মনে। তাই আমরা বলি, কোটি জন্মের যায় পিপাসা/ বিন্দুমাত্র জল পানে।’
মযহারুল হঠাৎ হয়ে গেলেন আনমনা। এবারকার উদগত দীর্ঘনিশ্বাসটা ততটা স্পষ্ট হল না। বুঝলাম অনেক প্রয়াসেও সেই দুর্লভ পবিত্র বিন্দু তিনি জীবনে পাননি। ঘনায়মান আসন্ন সন্ধ্যার ছায়াই কি তাঁর মুখকে ম্লান করল? না কি সে অন্যতর কোনও বেদনা?
