এই রজঃ বা মাসিক পরীক্ষার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে এর উজ্জ্বলতা বা রং পরীক্ষা করা। একটি সাদা কাগজ বা সাদা কাপড়ের ওপর এক ফোঁটা রজঃ নিয়ে সূর্যালোকে ধরলে এক যথার্থ রং প্রকাশিত হয়। রজের রং চার ধরনের হতে পারে। লাল, হলুদ, কালো এবং সাদা। বাউলদের ভাষায় লাল, জরদ, সিয়া ও সফেদ। এই চার রং-এর মধ্যে গভীর অর্থ বিদ্যমান। এখানেও লাল রং-এর অর্থ নারী উর্বর।
বাউলদের মতে নারী ও চাঁদের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।…এখানে বলা দরকার, বাউলদের মতে, পুরুষরা সব সময়ই উর্বর থাকে না। পূর্ণিমার সময় পুরুষদের উর্বরতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়।
সব শুনে মযহারুল বললেন, ‘সব কথাই ঠিক লিখেছে। আর এসব কথা তো বাউল গানেই আছে। ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে’ শোনেননি? আরেকটা গান আছে ‘অমাবস্যায় চাঁদের উদয়’ শুনেছেন।
: শুনেছি কিন্তু মানে বুঝিনি?
:নারীর রজঃস্রাবের সময়কে বলে অমাবস্যা। এই সময় বাঁকা নদীর বাঁকে অধর মানুষ মহামীন রূপে খেলতে আসেন। তাঁকে ধরতে হয় সেই সময়। সেই হল মহাযোগ। কিছু বুঝলেন না, তাই নয়? আচ্ছা লালনের একটা গান শুনুন,
তিন দিনের তিন মর্ম জেনে
রসিক সাধলে ধরে তা একই দিনে।
অমাবস্যা প্রতিপদ।
দ্বিতীয়ার প্রথমে সে তো
দরবেশ লালন বলে তাই তার আগমন
সেই যোগের সনে॥
এর মানে হল নারীর রজঃস্রাবের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের মাঝামাঝি সময়ে নারী-শরীরে আলেখের খেলা। তাঁকে ধরতে পারলে পাওয়া যাবে কোটিজন্মের সুখ আর উলটে যদি ঘটে যায়, বিন্দুপতন তবে সাধককে চিবিয়ে চুষে খাবে কাম-কুমির। সাধকের পতন হবে।
: বেশ বুঝলাম। কিন্তু পূর্ণিমাটা বোঝান, ওই যে তখন বললেন ‘অমাবস্যায় চাঁদের উদয়’?
: ও, আকাশে যখন পূর্ণিমা তিথি তখন পুরুষের জোয়ার আর সেই সময়ই যদি নারী সঙ্গিনীর ঘটে অমাবস্যা তবে সেই সংযোগ হল সেরা সাধনসময়। খুব কম ঘটে সচরাচর।
আমি বললাম, ‘এবারে বুঝলাম বাউল ফকিরদের দেহযোগ আসলে এক লুকোচুরি খেলা। ওদিকে কামনার দারুণ টান, মহামীনের পাশেই আছেন কুমির। ঠিকভাবে মীনকে খেলাতে পারলেই অধর মানুষ ধরা পড়বে অটলের সাধনে আর ভুল করলেই কুমিরের মুখে পতন। ঠিক বুঝেছি তো? আচ্ছা এবারে বলুন তো জীবজগতে দেখেছি দেহসঙ্গমের নির্দিষ্ট বিশেষ ঋতু আছে অথচ মানুষের শরীরীতৃষ্ণা তিনশো পঁয়ষট্টি দিন এমনকী সর্বদাই। তা হলে কি মানবজীবন সবচেয়ে হীন আর কলুষিত নয়? মানুষে ঈশ্বর এতখানি দেহের দাসত্ব দিলেন কেন?
: প্রথমেই বলি, যাকে বলছেন দাসত্ব, তাকেই যদি বলি প্রভুত্ব। জীবজগৎ এই প্রভুত্ব পায় না। তারা কামনার টানে মিলিত হয়। জন্মদানই তার লক্ষ্য। তাদের আনন্দ নেই, প্রেম নেই, আপনার কথায় ‘লুকোচুরি খেলা’ নেই। একমাত্র মানুষকেই আল্লা এই মনের আনন্দ, দেহের সুখ, প্রেমের অনুভূতি দিয়েছেন কেন না মানুষকেই তিনি সবচেয়ে ভালবাসেন।
এবারে আমি গভীর দৃষ্টিতে মযহারুল খাঁ-র দিকে তাকালাম। জীবনের একটা নতুন ভাষা এত দিনে পেলাম লোকধর্মের মধ্যে। কামনা ও প্রেমের দুই উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে এক চিলতে বালুবেলার মতো এই জীবন, কখন কীসের দ্বারা যে ভেসে যাবে কে জানে।।
ভাবনার মাঝখানে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন গৃহী ফকির বলে উঠলেন, ‘মানুষের উপভোগের ক্ষমতা খুব বেশি সেইজন্য আল্লা তার জন্যে এত খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। খাদ্য থেকে পুষ্টি আর তৃপ্তি। তার থেকেই বীর্যের জন্ম। সেই বিন্দুই জীবন। তাকে ধরে রাখতে পারাই মানুষের সবচেয়ে বড় কায়দা। আবার সেই কাজে যারা ব্যর্থ তারাই কামুক, তাদেরই পতন। তাদের জীবন জানোয়ারের মতো। জানোয়ারের মতোই পরনির্ভর, গরিব। জানোয়ারের মতোই তারা সকাল সকাল মরে। তারাই পাপের ভয়ে তীর্থব্রত উপোস করে মরে। অপদেবতা, কাঠের ছবি, মাটির ঢিবি পুজো করে। সেইজন্যেই গানে বলে, ‘মানুষের করণ কর’। মানুষের করণ হল আত্মজ্ঞান, দেহের ওপর প্রভুত্ব আনা। আমাদের পথে তার নিশানা আছে। শুধু মুর্শিদ ধরে বুঝে নিতে হয়।’
আমি তর্কের ভঙ্গিতে বললাম, ‘এতক্ষণ আপনি যা বলে গেলেন সবই পুরুষের দিক থেকে। রোজকার জীবনে আর যৌনতায় কি মেয়েদের কোনওই ভূমিকা নেই?’
মযহারুল বললেন, ‘কী করে থাকবে? মেয়েদের যে কামনা নেই।’
‘কী বললেন?’ আমি আমূল চমকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মেয়েদের কোনও দৈহিক কামনা নেই?’
মযহারুল খুব অনায়াসে বললেন, ‘আপনি তো বিবাহিত। বলুন তো সত্যি করে, কামনা আপনারই তরফে আগে আসে না কি?’
চুপ করে গেলাম।
মযহারুল আর একটু উজিয়ে দিয়ে বললেন, ‘শরীরের দিকে যে প্রথম আকর্ষণ সে কি স্ত্রীর প্রতি স্বামীর নয়? শরীরের সম্পদও কি তাদের বেশি নয়? পুরুষ কি দস্যু ডাকাতের মতো নারীকে ভোগ করে না?’
আমি দারুণ বিভ্রান্ত হয়ে যেন খানিকটা অসহায়ের মতো বললাম, ‘তবে নারী কামনাময়ী হয় কী করে? তার দেহ কি সাড়া দেয় না?’
: পুরুষ স্ত্রীলোকের মধ্যে কামনা জাগিয়ে দেয়। মূলে তাদের দেহের কামনা থাকে না। তারা কামনাশূন্য।
: তা হলে নারী কী চায় পুরুষের কাছে?
: সবচেয়ে বেশি চায় সঙ্গ আর সান্নিধ্য। সব স্ত্রী চায় স্বামীকে সেবা করতে। চায় ভাল মন্দ রেঁধে খাওয়াতে। বাইরে থেকে এলে দেখবেন স্ত্রী স্বামীকে ঘাম মুছে দেয়, পাখার বাতাস করে। কোনও স্বামী কি তার স্ত্রীকে পাখার বাতাস করে? আপনি সব মেয়েছেলেকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন তারা চায় স্বামী তার সামনে সর্বদা হাজির থাকুক, তাকেই শুধু ভালবাসুক। বাইরের জগৎ সম্পর্কে বউদের খুব ভয়। পাছে তার পুরুষ আর না ফেরে—যদি তার দেহ অন্য কাউকে চায়? মেয়েরা যে সন্তান চায় তার একটা কারণ তো মা হবার নেশা, আরেকটা কারণ স্বামীর একটা চিহ্ন ধরে রাখা। কী ঠিক বলছি?
