ভাবনার ভরকেন্দ্র টলে গেল সহসা, কেননা দুপুরের খাওয়া দাওয়ার সময় হল। যে খাটে আমি আর মযহারুল কথা বলছিলাম সেই বিছানাতেই একটা গামছা ভিজিয়ে নিংড়ে লম্বা করে পাতা হল। তার একপ্রান্তে মযহারুলের ভাতের থালা, আরেক প্রান্তে আমার। নিরামিষ রান্না। ঝাল-মশলা একটু খর। কোনও মহিলা এলেন না, মনজুরই সব দেওয়া নেওয়া করল। খাওয়ার শেষে জানতে চাইলাম কেমন করে ফকিরি লাইনে গেলেন মানুষটি।
: খুব ছেলেবেলা থেকেই আমি জ্ঞানী। মানে ন-দশ বছর বয়স থেকেই জানতে আগ্রহ হত খুব, আল্লা কোথায় থাকেন। বাবার সঙ্গে মসজিদে যেতাম, আরবি-পারসি পড়তাম, কোরান পড়তাম, কিন্তু মন ভরত না। আন্দাজি ধর্ম তো। তখন আমাদের গাঁয়ের আশেপাশে অনেক আলেম ফকির থাকতেন। তাঁদের কাছে খুব গোপনে যাতায়াত করতাম। গোপনে, কেননা বাবা জানলে মারধোর করতেন। তিনি ছিলেন খাঁটি নামাজি মুসলমান। শরিয়ত-মানা এলেমদার। শেষপর্যন্ত অবিশ্যি খুব গোলমাল বেধে গেল। আমি নমাজ রোজা এইসবে নারাজ হলাম। বলতে পারেন মন সায় দিল না। বাবা খুব মারধোর করতেন। গ্রামের লোকজন গালমন্দ শত্রুতা অনেক করেছে। সে সব কথা এখন আর মনে নেই।
: গ্রামের লোক আপনাকে মেনে নিল শেষপর্যন্ত?
: দেখছেনই তো। আসলে আমি তো কারুর সঙ্গে মারপিট করতে যাইনি, বলিনি ‘ফকিরি কর’। আমি আমার মতো সাধন ভজন করতাম, গান গাইতাম। মোল্লা মৌলবীরা ডাকলে বাহাস করতাম। কেউ আমার সঙ্গে তর্কে পারেনি বা আজও পারে না এ দিগরে। আমি তো একসময়ে টানা দশ বছর এই বাড়ির একটা ঘর থেকেই বেরোইনি।
: কেন?
: ফকিরি সাধনা কি সোজা নাকি? সে কি লোক-দেখানি? দমের কাজ, দেহযোগ অনেক রকম আছে। সে সব মুর্শেদের কাছে শিখে নিজের দেহে কায়েম করতে হয়। তবে দখলে আসে।
আমি বললাম, ‘তারপরে সবাই আপনাকে মেনে নিল?’
মযহারুল খাঁ প্রত্যয়ী হাসি হেসে বললেন, ‘না মেনে আর কী করবে? এককালে এ গাঁয়ে আমি ছিলাম বলতে গেলে একঘরে। আর আজ একচেটিয়া সব ফকিরি মতে টেনে এনেছি। নিজেরাই এসেছে। যারা আসেনি তারা শত্রুতা করে না। ব্যস, ভালই আছি।’
আমি বললাম, ‘বাংলাদেশে তো গেছেন। ওই দিকে ফকিরি মতের কেমন অবস্থা?’
: খুবই রবরবা। আর বিরাট বিরাট সব ফকির আছে। ভাল ভাল গাহক আছে। জালাল রশিদ এদের তত্ত্ব গান খুব চালু ওখানে। কুষ্টিয়া যশোর ফরিদপুর আর রংপুরে অনেক ফকির থাকেন। জ্ঞানী। আরবি চর্চা করেছেন সব।
: আমি এবারে একটা অন্য ধরনের প্রশ্ন করব। আমার কাছে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত একটা লেখা রয়েছে, ‘বাউলদের যৌনজীবন ও জন্মনিয়ন্ত্রণ’। লেখাটা সঙ্গে আছে। ওর মধ্যে দু-একটা জায়গা আপনার কাছে বুঝে নেব, সত্যি কথা লিখেছে কি না। খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার তো?
কৌতুহলী হয়ে ফকির বললেন, ‘কী লিখেছে পড়ন তো?’
আমি লেখাটা বার করে একটি জায়গা পড়তে লাগলাম, মযহারুল খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতে লাগলেন।
তাদের মতে যক্ষ্মা ও অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুখে নারীর বুকের দুধ বিশেষ উপকারী। নিয়মিত বুকের দুধ পান করলে যৌবন ও তারুণ্য সহজেই ধরে রাখা যায় এবং দুধ প্রদানকারী নারীর সন্তানও জন্মে না। আমি একজনকে জানতাম যিনি এভাবে তার তারুণ্য ও যৌবনকে দীর্ঘস্থায়ী করেছিলেন এবং বাউল গানে ছিলেন অদ্বিতীয়। আশি বছরের অধিক বয়সে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁকে কখনো বৃদ্ধ জরাজীর্ণ ও ভেঙে পড়া শরীরের মানুষ মনে হয়নি। মূলতঃ এগুলো সবই হচ্ছে বাউল ধর্মের অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়াসমূহ যা বাউলসমাজের বাইরে খুব অল্প লোকই জানেন।
সবটা শুনে মযহারুল একটু গম্ভীর হলেন। তারপর বললেন, ‘এ সব লিখে দিয়েছে? কথাগুলো সত্যি। আপনি বাউলদের দলে দেখবেন নানা বয়সের মেয়ে থাকে। নানা উদ্দেশ্যে তাদের রাখা হয়। বুকের দুধ খাওয়ালে স্ত্রীলোকের সন্তান হয় না এ কথা সত্যি। হ্যা, আর কী লিখেছে পড়ুন তো, জানতে মন চাইছে।’
আবার পড়তে লাগলাম,
সঙ্গিনী ছাড়া বাউলধর্ম অন্তঃসারশূন্য। স্বামী স্ত্রী অথবা বিশেষভাবে নির্বাচিত সঙ্গিনীর সাহায্যে এই ধর্মের পালনীয় ক্রিয়াসমূহ নিষ্পন্ন করা হয়।
বাউলদের মধ্যে শ্বাস নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই জীবনের চরম আনন্দ ও শান্তি লুকিয়ে আছে। নিজের স্বাসকে যদি ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবেই সকল সমস্যা ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি সম্ভব। এই শ্বাস পদ্ধতিকে ভিত্তি করেই বাউলদের যৌনজীবন গড়ে উঠেছে।
পুরুষ বাউল নারীকে সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে মনে করে। নিজের তৃপ্তির সঙ্গে নারীকেও তৃপ্তিদানে তারা সচেষ্ট হয় যা গ্রামীণ আর দশজন পুরুষের মধ্যে লক্ষণীয় নয়। এই হেতু সাধারণ সংসার অপেক্ষা বাউলদের জীবন সুখী অন্তর্মুখী ও তৃপ্তিপূর্ণ।
প্রতিটি বাউল দম্পতিই নিয়মিতভাবে তাদের মাসিক খুঁটিনাটি বিষয়গুলো যত্ন সহকারে পর্যবেক্ষণ করে। এই পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে একটি দৃঢ় ধর্মীয় বোধ। যা লালনের একটি গানে বিধৃত। গানটি হল: সব গাছেরই ফুল ফোটে কিন্তু সব ফুলেরই ফল হয় না। অর্থাৎ মাসিক হলেই যে নিয়মিত ডিম্ব স্ফোটন ঘটবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই ডিম্ব স্ফোটন নির্ণয়ের পন্থা হলো—মাসিকের স্বাদ গ্রহণ। এই স্বাদের তিনটি পর্যায় আছে। মধুর মতো মিষ্টি, নোনতা ও টক। যদি মিষ্টি হয় (যা মধুর ন্যায়) তা হলে বুঝতে হবে নারী অবশ্যই উর্বর।।
