‘আরে না মশাই’ মযহারুল একগাল হেসে বললেন, ‘নিতান্ত প্রয়োজনে। আমার বড় বউ খুব সুন্দরী আর খুব ভাল মানুষ। সংসার যখন বড় হয়ে গেল, চারটে-পাঁচটা সন্তান হল, সে ন্যাকা বোকা মানুষ, সব দিক সামাল দিতে পারত না, তাই আবার বিয়ে করলাম। আমার ছোট বউ খুব খাটিয়ে আর খুব হিসেবি। আমার সংসার সেই মাথায় করে রেখেছে। ছেলেদের তো সে-ই মানুষ করেছে। তাকে কিন্তু দেখতে ভাল নয়। যাকগে ও সব ভ্যানতারা কথা। কী সব যেন জানতে চান জিজ্ঞেস করুন দেখি।’
: যা জানতে চাইব সব বলবেন? গোপন করবেন না তো?
: যা জানি তা সব বলব। যা আমার ভানে নেই তা বলতে পারব না। জানেন তো রসিদের পদে বলছে, সাজিয়ে আলেম হইলে জালেম/লান্নাতের তৌক পড়িবে গলায়।’
: তার মানে?
: আলেম মানে জ্ঞানী, জালেম মানে অন্ধকারাচ্ছন্ন অজ্ঞানী। অজ্ঞানী হয়েও যদি কেউ জ্ঞানী সাজে তবে তার গলায় পড়বে পাপ বন্ধন। তো আপনি এবার প্রশ্ন করুন।
আমি বললাম, ‘আপনারা তো বর্তমানবাদী। তার মানে কী?’
: এক কথায় লালনের গানে কথাটা বোঝানো আছে—‘যারে দেখলাম না নয়নে তারে ভজিব কেমনে। যার বস্তুরূপ নেই তাকে অনুমানে আমরা বুঝতে চাই না। ইন্দ্রিয় দিয়ে যা প্রমাণ করা যায় না তা আমরা মানি না। সেইজন্য আমরা আগে রূপ দেখি তবে সেজদা দিই। আবার এই রূপ নেই বলে আমরা পুনর্জন্ম মানি না। প্রমাণ নেই। যে রূপ নিয়ে মানুষ জন্মায় মরণের পর তো সেই রূপ আর ফেরে না। লালন তাই বলেছেন, ֹ‘নামের তুল্য নাম পাওয়া যায়/ রূপের তুল্য রূপ কোথা পাই?’
: বাউলরাও তো বর্তমানবাদী, তাদের সঙ্গে আপনার তফাত কোনখানে?
: তফাত কোথায় জানেন? বাউলরা মেয়েছেলে সাধনসঙ্গিনী নিয়ে সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ওটা ঠিক নয়।
: কেন?
: আমার যে সঙ্গিনী বা স্ত্রী সে তো আমাকে একমনে ভালবাসে। তাকে বাইরে সবার সামনে বার করা কি ঠিক? তার মন তাতে তো চঞ্চল হতে পারে। সে তো আমাকে না-ভালবেসে অন্য কাউকে ভালবাসতে পারে। নারীর মন চঞ্চল করতে নেই। তারাই আমাদের সুখ-শান্তি দেয়। সংসার সমাজে তারাই সব দিক ঠিক রাখে। তারাই সন্তান ধারণ করে। তাদের চাঞ্চল্য এলে জগৎ টলে যায়।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম যে, মযহারুলের চিন্তায় রয়েছে মুসলমানদের পর্দা প্রথার প্রভাব, এমন সময় একজন গরিব গ্রামবাসী ঘরে ঢুকল তার কিশোর সন্তানকে নিয়ে। ছেলেটা রাতে খোয়াব দেখে হাসে, লাফিয়ে ওঠে। ফকির সাহেব যদি তাকে কোনও কবচ তাবিজ দেন।
মযহারুল আমার কাছ থেকে একটুকরো কাগজ নিয়ে তাতে কী-সব আঁকিবুকি কাটলেন, তারপরে সেটা মুড়ে, তাতে দুবার ফুঁ দিয়ে মাদুলিতে ভরে লোকটিকে দিয়ে বললেন, ‘কালো সুতো দিয়ে বাঁ হাতে বেঁধে দেবে।’ গরিব মুসলমান ভরসা রাখে গ্রামীণ ফকিরের ওপর। কৃতজ্ঞ মুখে চলে গেল সে। হঠাৎ আবার ফিরে এসে বলল, ‘খাওয়া দাওয়ার কোনও বাধা নিষেধ মানতে হবে?’
: কিছু না, কিছু না। কেবল যদ্দিন রোগ না সারে বাড়িতে গোরুর মাংস খাবে না।
লোকটি চলে যেতেই আমি বললাম, ‘এটা কেমন হল? মাদুলির সঙ্গে গোমাংসের সম্বন্ধ কী?’
এটা হল ফকিরি বুদ্ধি? মযহারুল হেসে বলেন, ‘জানেন তো মসজিদের ইমাম নানা বিধান দেয়। মুসলমানে তা মানে। ওরা কেমন বলে জানেন তো? বেশরা ফকিরদের বাড়ি পাত পাড়বে না। গান শোনা গান গাওয়া হারাম। ফকিরি গান শুনবে না। ওরা এদিকে গান ভালবাসে। কী-যে করে। আমাকে বলে ফকিরি গান পাক না না-পাক? শুনতে মন চায় এদিকে মৌলবী মানা করে। আমিও সুযোগ পেলে একটু আধটু বদলা নিই। এই যেমন বলে দিলাম গোরুর মাংস খাবে না। আর জীব কি কোনও ধর্মে পড়ে? সবাই সব খেতে পারে।
: ঈশ্বর কি কোনও ধর্মে পড়েন?
: একদম নয়। শোনেন নি সেই গান?
মুসলমানে ভাবে আল্লাহ্ আমাদের দলে
এমন বোকা দেখেছ কে কোন কালে।
আল্লাহ্ কারো নয় মেসো খুড়ো
এ কথাটির পেলি নে মুড়ো
চুল পেকে হলি রে বুড়ো খবর না নিলে।
: তার মানে আল্লা আমারও?
: হ্যাঁ, কেন নয়? কৃষ্ণও তো আমার। আপনি কুবির গোঁসাইয়ের গানে শোনেননি, ‘আল্লা আলজিহ্বায় থাকেন আত্ম সুখে/ কৃষ্ণ থাকেন টাকরাতে?’
: কৃষ্ণকে তো আপনারা শুক্র বলেও মানেন।
: হ্যাঁ, নরনারীর দেহ মিলনে তাঁর রাসলীলা/ নারীর শরীরে থাকে রাধাবিন্দু। সেখানেই মেলেন কৃষ্ণ।
: তা হলে চুম্বন আলিঙ্গন স্পর্শন এ সব কী?
: ওরা কৃষ্ণের সহচর দ্বাদশ গোপাল। শ্রীদাম সুদাম বসুদাম এঁদের নাম শুনেছেন তো?
: নারী শরীরে কি তবে কৃষ্ণ থাকেন না?
: হ্যাঁ, সেখানে তাঁর কাজ আলাদা। কৃষ্ণ সেখানে পালনকর্তা। তাই নারীর গর্ভসঞ্চার হবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আসন নেন গর্ভফুলে। সেই ফুল থেকে রসরক্ত পান করে শিশু বেঁচে থাকে। তারপর শিশু জন্মেই সেই কৃষ্ণকে হারায় আর কাঁদে শুধু ‘কাঁহা কাঁহা’ বলে। এই কাঁহা মানে আমি কোথায়? কৃষ্ণই বা কোথায়?
খানিকক্ষণের স্তব্ধতা নামে গোরাডাঙার ঘুঘু ডাকা মধ্যদিনে। আমি অবাক হয়ে ভেবে চলি কেমন করে এমন সব বিচিত্র ভাবনা বয়ে চলেছে আমাদের সকলের অগোচরের জগতে! এদের কি ভ্রান্ত বলব না কি বাতুল? এ কথাও তো ভাবতে হবে, এমন সৃষ্টিছাড়া ভাবনা ধারণা নিয়ে এই যে বেঁচে-থাকা তাতে চলমান জীবনের সঙ্গে কোনও সংঘাত হচ্ছে না। জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ ঘটে যাচ্ছে, উন্নত সার ব্যবহারে জমি হচ্ছে অতিপ্রজ, গভীর নলকূপের জল পাচ্ছে চাষি, আধুনিক যন্ত্রে ঝাড়াই হচ্ছে মাঠের পর মাঠ ভরা গম। তার মধ্যেই ফকির তত্ত্ব চলছে, শরিয়ত-মারফতে চলছে অন্তৰ্গঢ় রেষারেষি। মনজুর খৈবররা ফকিরি নিচ্ছে, গাইছে তত্ত্বগান। এই মযহারুল খাঁ-ই বাউল-ফকির সংঘের সংগঠনে এগিয়ে আসছেন। বস্তুবাদে বিশ্বাসী মানুষটি নির্বিকার চিত্তে রোগ আরোগ্যের ভাববাদী মাদুলি দিচ্ছেন। যাকে চোখে দেখেন তাকে অনুমান বলে মানেন না যিনি, তিনিই কিন্তু শরীরে কৃষ্ণের অবস্থিতি মানেন চোখে না দেখেও। তবে কি কৃষ্ণ এদের চিন্তায় কোনও ভাববিগ্রহ নয়, প্রবাহিত জায়মান জীবনের অন্য নাম?
