আব্বা আসার আগেই অবশ্য বাড়ির খুদে ছেলেমেয়েগুলো জটলা করে। অবাক হয়ে দেখে শহরবাসী আজব জীবটিকে। আমার চোখ ততক্ষণে উঠোনে। সরষে শুকোচ্ছে। ছোলা গাছ এক পাঁজা আনা রয়েছে। এখনও মাড়াই হয়নি। বাড়ির বউরা বেগুনফুলি আর কটকটে সবুজ শাড়ি পরে গেরস্থালি সামাল দিচ্ছে। সম্পন্ন সংসার। বিস্তারধর্মী গৃহস্থী। ধানের তিনটে মরাই কিন্তু গোরু নেই তো। গোয়ালই বা কই? মনজুর এসে বলল, ‘আব্বা আসছেন নাস্তা সেরে। একটু বসুন।’
আমি বললাম, ‘মনজুর, তোমাদের এতবড় সংসারে গোরু নেই কেন?’
: ছিল তিন-চারটে। বেচে দেওয়া হয়েছে।
: কেন?
: লোকের অভাব। আজকাল তো কিষাণ মেলাই ভার। বাড়িতে কাজের লোক পাওয়া যায় না। গোরু রাখলে জানেন তো গোরুর মতো খাটতে হয়। বাড়ির বউরা সব দিক সামাল দিয়ে আর পারে না। তাই…সব দিক ভেবে…আজ থাকবেন তো? গান-বাজনা হবে। সবাইকে খবর দেব।
ইতিমধ্যে মনজুরের মামা খৈবর এসে পড়ে। আগের বার শুনেছি তার বাঁশি-বাজানো। আসলে মযহারুল খাঁ ছেলেদের নিয়ে আর শ্যালক খৈবরকে নিয়ে এক ফকিরি গানের দল বানিয়েছেন। নানা গ্রামে গেয়ে বেড়ায় এই দল। মযহারুল গান লেখেন। জমায়েতে গানের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। কবার বাংলাদেশে লালন শাহের মাজারেও গেয়ে এসেছে এরা।
প্রায় সমস্ত দরজা জুড়ে মযহারুল ঢুকলেন ঘরে। ছ ফুটের ওপর লম্বা মানুষ, তার সঙ্গে মানানসই রকমের চওড়া। পরনে সাদা শার্ট ধুতি। চেহারা দেখলে ফকির বলে মনে হয় না। আসলে ফকিরি তো একটা দেহগত জীবন পদ্ধতির নাম, সেইসঙ্গে মনেরও উন্নত প্রকর্ষ। বাহ্যিক পোশাক-আশাক চুল দাড়ি যে রাখতেই হবে এমন তো কোনও কথা নেই। তা ছাড়া মযহারুল পুরো গৃহী মানুষ। এখন অবশ্য ছেলেরা লায়েক হয়ে গেছে। তারাই দেখে সব দিক। বাবাকে মুক্তি দিয়েছে তাঁর নিজস্ব বৃত্তে।
রসে ধাতস্থ হয়ে কথা চালাচালি শুরু হতে একটু সময় লাগল। তার মধ্যে চিঁড়ে-দুধ এল। মনজুর বলল, ‘এমন আমাদের গ্রাম যে একটা মিষ্টির দোকান নেই। মিষ্টি আনতে যেতে হয় ছ মাইল দূরে সেই নাজিরপুরে। আপনাকে আদর-আপ্যায়ন করতে পারলাম আগে খবর পেলে…’
তার কথা থামিয়ে বলি, ‘মানুষের কাছেই তো আসা। খাওয়াটা গৌণ। শুধু দেহরক্ষা বই তো নয়।’
বাধা দিয়ে মযহারুল বললেন, ‘কথাটা ঠিক বললেন না। এই জগতের নাম দুনিয়া। দুটো জিনিস নিয়ে জগৎ চলছে। কী কী বলুন তো?’
নিজামী বলেছিল, বড়লোক-ছোটলোক, ধনী-দরিদ্র, মনে পড়ল। কিন্তু সে কথা এখানে খাটবে না। তাই চুপ করে জিজ্ঞাসু চোখে চাইলাম কেবল।
মযহারুল বললেন, ‘দুনিয়া মানে দু-নিয়া। সেই দুই হল জিহ্বা আর লিঙ্গ। এই দুই দিয়ে যাবতীয় আস্বাদন। আস্বাদনই তো বেঁচে থাকা।’
বলতে গেলে প্রথমেই চমকে গেলাম। প্রথমত, তাঁর বস্তুবাদী চিন্তার স্বচ্ছতায় আর দ্বিতীয়, মনজুরের উপস্থিতিতেই তাঁর এই স্পষ্ট কথা বলার ভঙ্গিতে। মনজুরকেও অবশ্য কিছুমাত্র অপ্রতিভ বা বিব্রত দেখাল না। সেটাও আমার উচ্চবর্গীয় জীবনযাপনের ধ্যানধারণায় চমকে যাবার মতোই। যাই হোক ক্ষণিক চমক কাটিয়ে উঠে আমি বললাম, ‘ওই আস্বাদনের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করুন একটু।’
: হ্যাঁ, সেটা বোঝা দরকার। দেখুন মানুষের শরীরে আস্বাদন করবার জন্য আল্লা ওই দুটোর সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তার মধ্যে মজা আছে একটা। দুটোর দ্বারা একসঙ্গে আস্বাদনসুখ পাবেন না। আলাদা আলাদা।
: কেন?
: ভেবে দেখুন, যখন পোলাও কালিয়া রাজভোগ খেয়ে জিভের সুখ পায় মানুষ তখন কি তার দেহসঙ্গমের ইচ্ছা হয়? আবার যে সময়ে কেউ সঙ্গম করে তখন মুখের সামনে পোলাও কালিয়া দিলেও মুখ ফিরিয়ে নেবে। অদ্ভুত আইন। যখনকার যা তখনকার তা। আর ওই যে বললেন আহার মানে দেহরক্ষা ওটাও হিন্দুয়ানির কথা। উপপাস-ব্রত-পার্বণ, দেহকে সংযমে রাখা, ও সব বাজে। মনের সংযম আসল। আর দেহরক্ষাই তো আসল ধর্ম। আমাদের ফকিরি মতে বলে, পঞ্চভূত ভর করে ফলমূল দানা শস্যে। সেই খাদ্য থেকে শুক্রের জন্ম। শুক্রই জীবন। তার পতনেই মৃত্যু। বিন্দু রক্ষাই তো আমাদের করণ।
খুব স্পষ্ট কথা। স্বচ্ছ চিন্তা। তবু একটু রন্ধ্র খুঁজতেই যেন আমি বললাম, ‘বিন্দুর ক্ষয় তো দেহধর্ম। তা কি অস্বাভাবিক?’
: কেন অস্বাভাবিক হবে? রিপু ইন্দ্রিয়াদিকেও কিছু দিতে হবে বইকী। রিপুদমন ব্রহ্মচর্য এ সব বস্তুবাদীদের কথা নয়। আমার কি সন্তান হয়নি?
চা খেতে খেতে মযহারুল শুরু করলেন আবার, ‘আমার এখন বয়স ষাট। কুড়ি বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে। কুড়ি থেকে তিরিশ এই দশ বছর আমি সন্তানের জন্ম দিয়েছি। ব্যস। আমার দুই বিবি। তিন ছেলে এক মেয়ে। বড় বউয়ের কোলে ছেলে, ছোট বউয়ের কোলে মেয়ে। ব্যস। আর জন্ম দিইনি।’
: এমনভাবে বলছেন যেন জন্মদান আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার?
: বস্তুবাদে তো তাই। পুরুষ ক্ষেত্র, নারী ক্ষেত্র। বীজ খাঁটি হলে জমি উর্বর হলে ফল হবে। আবার বীজ বিনা শুধু কর্ষণে ক্ষতি নেই। ফকির বিন্দুধারণ ও বিন্দুচালন জানে। তার পতনের ভয় নেই। আমার ছেলেরাও ফকিরি মতে আছে।
একেবারে তো বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করা চলে না, তাই ফকিরকে একটু টোকা মারবার জন্যে বললাম, ‘দুবার বিয়ে করলেন কেন? ইসলামে প্রশস্ত বলে?’
