মনে পড়ল এলা ফকির আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের এই পথ বড় কঠিন। আগে মন তৈরি কর তবে দেহ সাড়া দেবে। আমরা তাই বলি, লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়। মনেই লজ্জা ঘৃণা ভয়। যা জানি না তাতেই ভয় থাকে। যা রুচিতে মেলে না তাতেই ঘৃণা। লজ্জা মানে লোকলজ্জা।’
খুব সত্যি কথা। আমার পাশে বসা পাউরুটির কারিগর বিমল এই মুহূর্তে আসলে এক নিরঞ্জন জায়গায় বসে আছে। সে সামাজিক মানুষ অথচ লজ্জা ঘৃণা ভয়ের ঊর্ধ্বে। সে কিছু গোপন করছে না। গোপনীয় মনে করছে না। অবিবাহিতা সাধনসঙ্গিনীকে সে মর্যাদা দেয়, ভালবাসে। তার সমাজ ভয় নেই। ঘৃণা নেই। তাই কিছু হারাবার ভয়ও নেই তার। আমিই শুধু সিটিয়ে যাচ্ছি। কার জীবনদর্শন সঠিক?
যাকে স্পষ্টতই তেমন জানি না, যার রুচিবোধ বিষয়ে ঘৃণা বোধ করছি, তার সম্পর্কে উদাসীনও থাকতে পারছি না কিন্তু। সে অবশ্য আমাদের উচ্চ ভোগসুখের জীবন বিষয়ে খুব নিস্পৃহ। সমাজনীতি সুস্থ জীবনধারণ বিবাহবন্ধন পুজো-আচ্চা কিছুই সে মানে না। তবু আত্মস্থ ও আনন্দিত। তার সঙ্গিনী বয়স্থা আর অসুন্দরী। সবই আশ্চর্য। সভ্য শিক্ষিত মন দাবি করছে বিমল পারভার্ট। মযহারুল খাঁও কি তবে বিকৃতিরুচি? কী করে হবে তা? তিনি তো বিবাহিত, সংসারী, সন্তানের পিতা। ফকিরি মানেই বিকৃতি কে বলেছে? বাউল মানেই কামনাকলুষিত?
সাত-পাঁচ উথাল-পাথাল ভাবনার ঝাপটায় মন দোলে আমার। শেষপর্যন্ত বিমলকে বহুক্ষণ ধরে চেপে রাখা কথাটা বলে ফেলি, ‘আচ্ছা, বলো তো, তোমাদের রসরতির সাধনা আমি বুঝি, সে তো নিজের কাছেই শরীরের মধ্যে আছে। রজ তোমরা কোথায় পাও বলো তো?’
বিমল খুব নিচু গলায় বলল, ‘এটা খুব গোপন ব্যাপার। আচ্ছা বলুন তো আমি কেন চামারপাড়ার এদিকে থাকি?
: সে তো সোজা উত্তর। তুমি অসামাজিক জীবন যাপন কর। তোমার বিবাহিতা স্ত্রী নেই, অন্য সঙ্গিনী নিয়ে থাক। বনেদি পাড়ায় কি তা চলবে?
: হুঁ। সেটা একটা কারণ। আসল কারণ হল, এটা যাকে আপনারা বলেন ছোটলোকের পাড়া। ছত্রিশ জাতের বসতি? এখানে সমাজের অত বন্ধন নেই। খোঁজ নিয়ে দেখবেন বেশির ভাগ স্বামী স্ত্রী আসলে বিয়ে করা নয়। হয়তো কালীবাড়িতে একটা মালা-বদল হয়েছে। ভাব-ভালবাসা হয়েছে। থাকে একসঙ্গে। সন্তান হয়। ছাড়াছাড়িও হয়। এরা কিন্তু বাউলবৈরাগীদের খুব মান্যতা দেয়। খুব ভক্তি খুব সেবা দেয় ডেকে নিয়ে গিয়ে।
: কেন?
: ওদের তো বামুন পুরুত নেই। উঁচু সমাজে যাতায়াত নেই। অথচ খুব পাপের ভয়। সব দেখবেন গুরুর কাছে দীক্ষা নেয়। পরকালের ভয় আছে তো? খুব গুরুসেবা দেয়। কেউ না কেউ গুরু একটা আছেই ওদের। গুরু যা বোঝায় তাই বোঝে। তবে কী জানেন, সব গুরুর দৃষ্টি তো ভাল নয়, সবাই সাধকও নয়। সুযোগ নেয় অনেকে। গুরুসেবার নামে ব্যভিচার আকছার।
আমি বললাম, ‘তার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী? তুমি তো আর গুরুগিরি কর না।’ লম্বা জিভ কেটে বিমল বলল, ‘ছি ছি, আমি গুরু হব কি? আমার ষোলো-আনা শিক্ষাই যে হয় নি। আসলে আমরা কিছু ওষুধ বিষুধ জানি। তুকতাক, মুষ্টিযোগ, জড়িবুটি। বিপদে আপদে দিই, ওরাও আমাকে দেয়।’
উত্তেজনা চেপে বললাম, ‘তোমাকে দেয় মানে? আমি যা ভাবছি, যাকে বলে রজ, তোমাকে দেয়?’
: দেয়। আমি না চাইলেও দেয়। বাড়িতে এসে গোপনে দিয়ে যায়। সেটাই ধর্ম।
: কীসের ধর্ম? কে বলেছে?
: উঁহু, অত চটবেন না। ওরা ওটাকেই ধর্ম বলে মানে। আপনি বাধা দিতে পারবেন? ওদের শিখিয়েছে এই ভাবেই।
: কে শিখিয়েছে?
: কেন বাউল-ফকিরেরা। সে কি আজ? শতশত বছর এমন চলছে। বাউলদের কাছে ওরা দেহের কত কী শেখে জানেন? আর একটা কথা বলি। জেনে রাখুন, এই সব পরিবারে কোনও কুমারী মেয়ে যখন প্রথম রজ দেখে তখন তা দান করে আমাদের। দান করবেই। আমরা তা সেবা করব। অনেক তপস্যাতে ওই সব মেলে। সেবা করলে বিরাট শক্তি আসে। এবারে বুঝেছেন তো কেন এখানে থাকি?
বলতে গেলে অনেকটাই বুঝে ফেলে আমার ভেতরে বিপ্লব চলছে। মানুষের অজ্ঞতা একটা আশীর্বাদ সন্দেহ নেই। জীবনের বেশ কিছু রহস্য অপ্রকটিত থাকাই ভাল। তাতে স্বস্তি। নিম্নবর্গের সমাজজীবনে এখন থেকে একটা অস্বাক্ষরিত চুক্তির লেনদেন আমার আর গোপন থাকবে না। শ্রমজীবী পুরুস-নারী দেখলেই উদ্যত হবে সন্দেহের তীর: এরাই কি? এরাও কি? রাজনীতি সমাজতত্ত্ব নির্বাচন রাষ্ট্রবিপ্লব আর আণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার আড়ালে বয়ে যাবে এক চোরা স্রোত। দেহ, দেহ-সংস্কার, যৌনতা, বিন্দুধারণ, নিয়ন্ত্রণ, শরীরী ভাবনা। রাত যেমন করে দিনের আলোর মধ্যে লুকিয়ে রাখে তার অন্ধকার, তেমনই বৈরাগ্যের অন্তঃশীল গৈরিকে ভরে আছে কামনাকুসুম।
*
চৈত্রের এক সকালে পৌছলাম সেই গোরাডাঙা। সেবার সমস্ত জমিজিরেতে মোড়া ছিল শীতের ধূসর চাদর, এবার তকতকে ঝকঝকে সূর্যের সংসার। উদভ্রান্ত বসন্ত বাতাস আর লাফিয়ে চলা ফড়িং। গ্রামবাসীরা জানতে চাইছে গন্তব্য। মযহারুল খাঁর নাম বলতে সবাই বলছে: ‘চলে যান, সোজা সরান।’
শেষপর্যন্ত সোজা রাস্তা অবশ্য বাঁক নেয় আর আমার চোখে পড়ে ফকিরের বড় দালানকোঠা। বাইরে অড়হরের কেটে আনা স্তৃপা এক পাশে ঘুট ঘুট ঘুট ঘুট শব্দে মেশিনে চলছে গম ঝাড়াই। সেখানকার তদারকি করছে মনজুর। হেসে এগিয়ে এল, ‘সত্যিই এলেন তা হলে। আসুন। বসুন ঘরে। আব্বাকে ডাকি।’
