প্রতিবাদে কট্টর সমাজ নির্দেশ দেয় :
বেনামাজি আওরত যদি কাহার ঘরে হয়।
তালাক দেনা মস্তাহাব কেতাবেতে কয়॥
তালাক দিয়া করিবে দূর সেই দুরাচার
ঝাড়ু মারিবেক তার শিরের উপর॥
এইসব সংঘাত, বিদ্বেষ ও সংঘর্ষের ইতিহাস মাথায় রেখে আমি মযহারুল ফকিরের সঙ্গে গূঢ় আলোচনার প্রসঙ্গ তৈরি করতে থাকি। হঠাৎ খেয়াল হয় সহজিয়া বৈষ্ণব আর বাউলদের সঙ্গে মারফতি ফকিরদের বহু রকম পার্থক্য থাকলেও একটা জায়গায় খুব বড় মিল আছে। এই তিন দলই ‘দুই চন্দ্র’ অর্থাৎ মলমূত্র এবং কেউ কেউ ‘চারচন্দ্র’ অর্থাৎ মল মূত্র রজ বীর্য মিশিয়ে পান করেন ও গায়ে মাখেন। এই আপাত ঘৃণাযোগ্য আচরণ বহু মানুষকে অবাক করেছে। কিন্তু এই পদ্ধতি তলিয়ে বুঝতে চাননি। শিবাম্বু বা মূত্রপান এখন অবশ্য শিষ্ট সমাজকে নাড়া দিয়েছে। এর শারীরিক উপকারিতা বিষয়ে বই বেরিয়েছে অনেক। স্বমূত্র পানের মতো স্ববীর্য পানের ধারাও এদেশে বেশ পুরনো। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘গণস্বাস্থ্য’ পত্রিকায় বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৯১ সংখ্যায় ‘বাউলদের যৌন জীবন ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ’ নিবন্ধে এক আশ্চর্য বিশ্লেষণ চোখে পড়ল, তাতে বিশেষ প্রতিবেদক লিখেছেন,
একটি সত্য এই যে, মানুষের শরীরে দুটি চেতক এন্টিজেন আছে যা শরীরের প্রতিরোধ পদ্ধতির (Immunological system) অন্তর্ভুক্ত নয়। এই দুটি হ’ল চোখের জলের জলীয় পদার্থ বা অশ্রু এবং বীর্য। আমাদের চোখের জলীয় অংশ বা শুক্রের অংশ কোনক্রমে রক্তে মিশলে বিশেষ এন্টিবডি উৎপন্ন করতে পারে। সম্ভবত ঐ বীর্যপানরত পুরুষ নিজের বীর্যদ্বারাই শরীরে এন্টিবডি উৎপন্ন করবে এবং তাতে শুক্রাণুর উৎপাদন অবশ্যই অল্প হবে। তাই দেখা যায়, বাউলদের সন্তান সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। তবে স্মরণযোগ্য, নারী কখনো এই বীর্যপান করে না।
এমনতর তথ্য জেনে বিশ্লেষণ করে মনে হয় আমাদের লোকায়তিক জীবনে দেহকে ঘিরে একটা আলাদা সমাজতত্ত্ব চালু আছে। তার আচার সংস্কার খুব জটিল আব গোপ্য। এই গোপন চন্দ্র-সাধনার নানা সাংকেতিক নামও আছে। কেউ বলে রসরতির সাধনা, কেউ বলে মাটির কাজ। সাধারণভাবে রস মানে মূত্র, রতি মানে শুক্র, রক্ত মানে রজ, মাটি মানে মল। গানে এদের আদ্য চন্দ্র, সরল চন্দ্র, গরল চন্দ্র, রুহিনী চন্দ্র এইসব শিষ্ট নামের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়। মযহারুল খাঁ-র কাছে যাবার আগে হঠাৎ মনে পড়ল বিমল বাউলের কথা। আমাদের মফস্বল শহরের একটেরে চামারপাড়ায় বিমল আর তার সঙ্গিনী থাকে। বাউল মতে সাধন ভজন করে। শান্ত নির্বিরোধ মানুষ। চুল দাড়ি আছে, পরনে গেরুয়া আলখাল্লা, কাঁধে ঝোলা, ঝোলায় নারকেল মালার করোয়া। বিমলের সাধনা আর জীবিকায় মিল নেই। সে একটা দেশি পাউরুটি কারখানার হেডমিস্ত্রি। আমি যে দিন আগে থেকে খবর দিয়ে বিমলের বাড়ি যাই সেদিন সে স্পেশাল কেক নিজের হাতে বানিয়ে আনে বেকারি থেকে। সত্যি বলতে কী, বাউল বৈরাগীদের বাড়ি কেক-সেবা যেমন আশ্চর্য অভিজ্ঞতা তেমনই আশ্চর্য বিমলের খোলামেলা স্বভাব। সে আমার কাছে কিছুই গোপন করে না।
সেই কথা ভেবে একদিন হঠাৎ গেলাম বিমলের আশ্রমে। তার সঙ্গিনী চা-বিস্কুট খাওয়াল, সাধন ভজনের কথা কিছু ওপর-ওপর হল। তারপরে বাড়ির উঠোনে এক তমাল গাছের নীচে শান বাঁধানো চত্বরে আমি আর বিমল বসলাম। সন্ধে ঘনিয়ে এল। আমি তখন বললাম, ‘কোনওদিন তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি, আচ্ছা তুমি চারচাঁদ সেবা কর?’
বিমল কোনও কিছুই প্রায় আমার কাছে গোপন করে না তাই কাঁধের ঝোলা থেকে কালো রঙের করোয়া বার করে দেখিয়ে বলল, ‘এই দেখুন এতে করেই আমি রসপান করি।’
: দিনে রাতে কতবার?
: যতবার ইচ্ছে। সবটাই তো উবগার।
: আমাকে বেনোয়ারি ফকির বলেছিল, রাতে শুয়ে পড়ে যে ভাত-ঘুম আসে সেই তার পরে যে প্রস্রাব তাতে নাকি গন্ধ থাকে না। শরীরের পক্ষে উপকারী খুব।
: এ বিষয়ে নানা মত আছে। তবে চারচাঁদ খুব কঠিন সাধনা। শরীর মন খুব বশে থাকলে তবেই এ সব করা চলে। নইলে ক্ষতি হয়।
: ঠিক বলেছ। একবার বেনোয়ারি বলেছিল, চারচাঁদ করলে বাইরে বেরোনো একেবারে নিষেধ। শরীরে রোদ লাগানো মানা। তবে চারচাঁদ যদি একবার ধাতস্থ হয়ে যায় তবে অঙ্গ হবে গৌরকান্তি। আচ্ছা বিমল, তুমি চারচাঁদ করছ বা কর এখন?
বিমল বলল, ‘আপনার কাছে অজান রাখব না। আমি মাটিটা সেবা করতে পারি না। ঘিন্না লাগে। অন্য তিন চাঁদ চলে। তার পদ্ধতি আছে, মাত্রা আছে। আর কিছু জানতে চাইবেন না। একটা গান শুনুন বরং।
আমাদের চিরকালের এই ধারা
মানি না কেতাব কোরান নবীজির তরিক ছাড়া।
মশরেকী তরিক ধ’রে চন্দ্র-সূর্য পূজা ক’রে
পঞ্চরস সাধন করে চন্দ্রভেদী যারা।
সরল চন্দ্র গরল চন্দ্র রুহিনী চাঁদ ধারা—
রজে বীজে মিলন ক’রে, পান করেছি সারা ॥
আমি বললাম, ‘তোমাকে বেশি বিব্রত করতে চাই না। রজ বীজের মিশ্রণ তোমরা কী ভাবে খাও?
: ওই দুই পদার্থ জলে মিশিয়ে কপ্পুর আর চিনি দিয়ে শরবতের মতো খাই।
মানুষের সংস্কার আর রুচিবোধ খুব নিয়ন্ত্রক সন্দেহ নেই। বছরের পর বছর এদের মধ্যে ঘনিষ্ঠভাবে ঘুরছি তবু ঠিক মিশে যেতে পারিনি। বিমল আর আমি বসে আছি পাশাপাশি তবু অস্পর্শ ব্যবধান। সে কি ঘৃণা? অখাদ্য আর খাদ্যের শ্রেণীকরণ কে করেছে? রুচিবোধই কি খাদ্যাখাদ্যের সীমা ঠিক করে?
