আপনারা জানেন যে আমি একজন বিতর্কিত লোক। পীর-মুরিদী, মিলাদকিয়াম, ইছলে-ছওয়াব, ওরশ ইত্যাদি বেদাতের বিরুদ্ধে কঠিন যুক্তি ও বাহাছ চালিয়ে যাচ্ছি আজ অর্ধযুগ ধরে।..বাংলার বুকে এমন পীর নেই যে আমি তার বিরুদ্ধে বাহাছ করি নি। ফুরফুরার পীরদেরকে আমরা পান্টি, ভায়লা, মুন্সীপুর-কুতুবপুর, কীর্তিনগর এবং যশোরের বেণিপুর হতে মুকাবিলা ক’রে হটিয়ে দিয়েছি। আজকের সবচেয়ে বড় পীর সরকারি পীর অর্থাৎ জবরদস্ত গরুখের আটরপীর পীরের প্রায় এক ডজন আলেমদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার শহরতলী জুগিয়া গ্রামে বাহাছ করেছি। এই বাহাছে তাদের যে কি ন্যক্কারজনক অবস্থা হয়েছিল তা আপনারা অনেকেই দেখেছেন।…অনেককে দাড়ি চেঁছে পলায়ন করতে হয়েছে। শম্ভুগঞ্জের পীর, রাজশাহীর ওলাউলাহ পীর, বগুড়ার পীর, দহগ্রামের পীর, রংপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, ঢাকা, টুঙ্গী এলাকায় এবং বিশেষ করে পাবনা জেলার সকল পীরদের বিরুদ্ধেই আমার মুকাবিলা হয়ে গেছে।
আসলে এত যে লড়াই, বাহাস আর মুকাবিলা এর পেছনে যত না ধর্মের উন্মাদনা ও অন্ধতা তার মূলে কিন্তু প্রধানত গ্রাম্য মনোভাব কাজ করছে। নগরজীবনের দুটি মূল লক্ষণ হল উদারতা ও উদাসীনতা। রফিউদ্দিন আমেদ তাঁর ‘The Bengal Muslims 1871-1906’ বইতে এক দিকনির্দেশী মন্তব্যে জানিয়েছেন: ‘As a community, the Muslims were overwhelmingly rural in character and they contributed only a fraction of the urban population’ রফিউদ্দিন আরেক অসমতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন: ‘Equally interesting and significant is the pattern of distribution of Hindus and Muslims in the various professions. Whenever the Muslims formed the bulk of the population, as in eastern Bengal, they belonged pre- dominantly to the cultivating classes, while land-holding, professional and mercantile occupations were dominated by the high-caste Hindus.’
এইখানে রয়ে গেছে বঞ্চনা আর ধন-বৈষম্যের এক দীর্ঘ ইতিহাস। গ্রাম্য জীবনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ চিরকাল থেকে গেছে গরিব চাষির ভূমিকায় আর আচার-অনুষ্ঠান, আর্থিক সমুন্নতি ও সাংস্কৃতিক উচ্চাসন অধিকার করে রেখেছে বর্ণহিন্দুগগাষ্ঠী। তার ফলে মুসলিম সমাজ রয়ে গেছে অপেক্ষাকৃত নিরক্ষর ও গ্রাম্য। তাঁদের কাছে উদারতা ও স্বধর্মের উপগোষ্ঠী বিষয়ে উদাসীনতা কি ব্যাপকভাবে আশা করে চলে? তা ছাড়া দেশের একটা নিজস্ব ধারাও তো আছে। একসময়ে যাঁরা ছিলেন হিন্দু তাঁরাই তো হয়েছেন ধর্মান্তরিত মুসলমান। হিন্দু আচার অনুষ্ঠান, সংস্কার ও সামাজিক রীতিনীতি কি তাঁরা সম্পূর্ণ ভুলতে পারেন? সেকালের গ্রাম্য মুসলমানদের হোলি, দেওয়ালি, ভাইদ্বিতীয়া, বাউনি-বাঁধা, গোমাতাপূজা, লক্ষ্মীবার মেনে চলা এইসব হিন্দুয়ানি দেখে পরম দুঃখে মুনসী সমীরুদ্দিন লিখেছিলেন,
দেশের বেদাত হোড়া হৈল ফের মনে।
তাহার বয়ান কহি শুন সর্বজনে॥
হুলি দেওলি আর জিতিয়া দুতিয়া।
বাউনি সাঁকরাত করে এছলাম হইয়া ॥
ভাইফোঁটা গরু পরব করে মোছলমানে।
লক্ষ্মীবারে কর্জ দিবা লিবাতে বারণ।
দেশের বেদাত এইছা কি কহিব কায়॥
ওয়াহাবি আর ফরাজি আন্দোলনের মূলে শুদ্ধ ইসলামি-করণের পাশাপাশি আন্দোলনকারীরা চেয়েছিলেন পীর ফকিরদের কবর-মাজার পূজার উচ্ছেদ, মারফতিদের পরকীয়া সাধনা ও গানবাজনাকে খর্ব করতে। গুরুশিষ্যবাদকে তাঁরা মানেননি। তাঁদের আর এক প্রতিবাদ ছিল ফকিরদের এই ঘোষণায় যে আল্লাকে দেখা যায়। আন্দাজি সাধনায় ফকিরদের আপত্তি ছিল। শক্তিনাথ ঝা তাঁর এক নিবন্ধে (‘বাউল দর্শনে ভারতীয় বস্তুবাদের উপাদান’, অনীক, ডিসেম্বর ১৯৮৫-জানুয়ারি ১৯৮৬) আলেপ নামে এক পদকারের দুটি চমৎকার উদ্ধৃতি এই প্রসঙ্গে দিয়েছেন। যেমন:
১) না দেখে রূপ মহম্মদার কি করে ভজি
কেবল শুনি কর্ণেতে দেখিনিকো চোখেতে।
২) অনুমান সাধন কোন হবে রে ঠিক
রূপ দেখে সাধো তাকে তবেত হইবা রসিক।
ইসলামে ‘সেজদা’ বা প্রণাম খুব গুরুতর বিষয়। আল্লা ছাড়া কাউকে সেজদা দেওয়া হারাম। নামাজে সেজদা এক উল্লেখ্য পর্যায়। অথচ অদৃশ্য আল্লাকে সেজদা দিতে চান না মারফতি ফকিররা। তাঁদের বক্তব্য, যেমন আবেদের পদে,
না দেখে সেজদা করা মেহন্নত বরবাদ গুণায় ধরা
না দেখে তার নামে সেজদা করে যত ধোপার গাধা।
উলটে ফকিররা সেজদা করেন গুরু মুর্শেদকে, শ্রদ্ধেয় আর পূজ্যদেরও। তাঁরা ব্যক্তির (খদ্) মধ্যে দেখেন খোদাকে। আসলে মারফতিদের প্রধান প্রতিবাদ ইসলামি বাহ্য আচরণবাদের বিরুদ্ধে। তাই কলমা, নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, এই পাঁচ শরিয়তি কৃত্য তাঁদের টানে না। এইখানে উদ্যত হয় তীব্র ভুল বোঝাবুঝি। বাহাস বা বিতর্ক দিয়ে যে সংঘাতের শুরু হয় তার পরিণাম ঘটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বা রুহুলের মতো বাধ্যতামূলক বাস্তুত্যাগে।
ইসলাম সমাজ নারীদের পর্দাপ্রথায় যেমন সতর্ক তেমনই তাদের যথেচ্ছ আচার আচরণ সম্পর্কে সচেতন। বেনামাজি নারী বা ফকিরদের সঙ্গিনীদের গোঁড়া মুসলমান কখনও ক্ষমা করেনি। ‘যুবতী আওরত যত/ফকির হইল কত/স্বামী ছাড়ি পীরের সঙ্গে যায়’—এই বর্ণনায় ধরা আছে এক সময়কার গ্রাম্যসমাজের পীর মুর্শেদদের অপ্রতিহত বিজয়বার্তা, বিশেষত অন্তঃপুরে।
