যাব বললেই কি যাওয়া যায়? তার প্রস্তুতি নেই? আমার ক্ষেত্রে অবশ্য বিশেষভাবে মানসিক প্রস্তুতির কথাও ওঠে। মযহারুল ফকিরের কাছে যাবার আগে ফকিরদের বিষয়ে একটু লেখাপড়া সেরে নিতে সময় লাগল। মানুষটার কাছে জানতে চাই তো অনেক কিছুই, কিন্তু কোন কোন বিষয়ে? সেইটা ঠিক করবার জন্যে রফিউদ্দিনের লেখা বাঙালি মুসলিমদের সম্পর্কে বিখ্যাত ইংরিজি বইটা পড়ে নিলাম। ফরাজি আর ওয়াহাবি আন্দোলনের পটভূমি ও পরিণতির ইতিহাস নানা বই থেকে চেখে নিলাম। সেই সঙ্গে এই শতকের গোড়া থেকে শুদ্ধ মুসলমানদের সঙ্গে মারফতি ফকিরদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কিছু বিবরণ জানা গেল। শুদ্ধতাবাদীদের লেখা কিছু বুকলেট নানা লাইব্রেরির ইতিউতি মিলে গেল। পীরবাদ আর ফকিরি মতের সঙ্গে নৈষ্ঠিক মুসলমানদের সংগ্রাম ও সংঘর্ষ বেশ পুরনো।
১৯৩৫ সালে এনামুল হক তাঁর ‘বঙ্গে সুফী প্রভাব’বইতে সরাসরি লিখেছেন, ‘উনিশ শতকে চারিদিক হইতে বাউলদিগকে ধ্বংস করিতে আয়োজন চলিতে লাগিল। এই সময় মুসলমানদের মধ্যে দুইজন খ্যাতনামা সংস্কারক দেখা দিলেন। ইহাদের নাম মৌলানা কিরামৎ’অলী (মৃত্যু ১৮৭৩) ও হবাজী শরী’ অতুল্লাহ্। মৌলানা কিরামৎ’ অলীর প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল উত্তরবঙ্গ এবং হবাজী শরী’ অতুল্লাহ্-এর বাড়ি ও কর্মক্ষেত্র ছিল পূর্ববঙ্গ (ফরীদপুর)।’
এখানে বাউল বলতে বুঝতে হবে ফকিরদেরও। শুদ্ধতাবাদীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন লালন ফকির ও তাঁর আচরিত মত। মৌলানা রেয়াজুদ্দিনের ‘বাউল ধবংস ফৎওয়া’সবচেয়ে কড়া বই এ ব্যাপারে। এ ছাড়া মহম্মদ আলীর ‘মিথ্যা পীর’, ফজলে রহিমের ‘পীর মুরিদ’মহম্মদ সৈয়দের ‘মারফত নামা’—এ সব বইতে ধরা আছে নানা ঝাঁঝালো বক্রভাব। একটি পুঁথিতে ইসলামের শেষ অবস্থায় (কিয়ামত) বিষয়ে আশঙ্কা করে লেখা হয়েছে:
ইমাম গাজ্জালি লেখেন কিতাবে।
কিয়ামতের তিন নিশান জানিবে ॥
বেশরা দরবেশ হবে যেই কালে।
কিয়ামত হবে যেন সেই কালে ॥
দলিল মতে আলেম নাহি চলিবে
কোরাণ ও হাদীস কেবল পড়িবে॥
আমীর সর্দার যত দুনিয়ার।
জাহেল হইবে তারা একেবার ॥
এই তিন গোরো যবে হইবে।
মুসলমানী আর নাহি রহিবে॥
সেই অক্ত এবে বুঝি আসিল।
বেশরা ফকির বহুত হইল॥
জাহিল সর্দার যত আছিল।
বেশরার কাছে মুরিদ হইল ॥
বেদাতী আলেম যত দুনিয়ার।
ঝুটা দরবেশের তারা হয় ইয়ার ॥
মুসলমানী এবে গেল হায় হায়।
কিয়ামত আসিল এবে বোঝা যায়॥
একজন ধর্মভীরু মুসলমান সমাজের আরেক দুর্লক্ষণ আবিষ্কার করে লেখেন:
যুবতী আওরত যত ফকির হইল কত
স্বামী ছাড়ি পীরের সঙ্গে যায়।
পূর্ববঙ্গ থেকে প্রকাশিত রশিদের পদে নতুন ফকিরদের করণ সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রশিদ বলছেন:
হয়েছে এ জগতে ভেদে-ফকির কতজনা।
বেদ-ছাড়া সেই ভেদে-ফকির বেদ বিধি কিছু মানে না।
এই মূল ভেদের কথা বলো না যথাতথা
নরনারী মিলে কর উপাসনা—
রস ধরে উপরে চালাও নীচেতে স্থিতি ক’রো না।
পঞ্চরস সাধনেতে পাক না-পাক নাই তাতে
গরলচন্দ্র ধরে লয়ে করেঙ্গাতে
বীজ ধরে ভক্ষণ করে জন্মমৃত্যু আর হবে না॥
এখানে স্পষ্টতই পরকীয়া রসরতির সাধনা, রজবীর্য পান সম্পর্কে ইঙ্গিত ঘোষিত হয়েছে। ফকিরদের আচরিত দেহযোগ সম্পর্কে উল্লেখ আছে। এরপরে রশিদ বলেন,
তোমার সেবাদাসী গুরুসেবায় দিলে
পারের ভয় রবে না।
সেই সময়ে ফকিরি মতের প্রবলতা আর নানা ধারা সম্পর্কেও রশিদের লেখা অন্য এক পদে কিছু ইঙ্গিত আছে। যেমন,
কলির ভাব দেখে ভাই ভেবে ভেবে মরি
কতজনে কত মতে করতেছে ফকিরী।
কেউ বলে বাতাস আল্লা কেউ বলে আগুন আল্লা
কেউ বলে পানি আল্লা আল্লা হলো ভারী।
কেউ বিন্দুমণি খোদা জেনে করতেছে ফকিরী।
কেউ বলে সাঁই নিরাকারে ভেসেছিল ডিম্ব ভরে
বিন্দু ছুটে ডিম্বের গঠন করছে আইন জারি।
কেউ বলে ফাতেমা হয় আল্লার জননী।
তবে হজরত আলী আল্লার বাবা ভাবে বুঝতে পারি॥
ফকিররা এ সব গানের জবাবি গান খুঁজে নিত লালনের রচনায়, দুদ্দুশা’র রচনায়। তারা গাইত,
কলমা আর নামাজ রোজা জাকাত হজ—
এই পড়িয়ে আদায় কর শরীয়ত।
আমি ভাবে বুঝতে পাই
এসব আসল শরীয়ত নয়।
আরো কিছু অর্থ থাকতে পারে ॥
বে-এলেম বে-মুরিদ জনা
শরীয়তের আক চেনে না
কেবল মুখে তোড় ধরে॥
এ লড়াই আজকের নয়। এক দিনেরও নয়।
কেউ যেন না ভাবেন যে পীর ফকিরবাদের সঙ্গে শরিয়ত-পন্থীদের এই মতাদর্শের সংঘাত কেবল পশ্চিমবাংলাতেই আবদ্ধ। আসলে বাংলাদেশে এই সংঘর্ষ সংঘাত খুব চরম পর্যায়ে। ইসলামি রাষ্ট্র হিসাবে সেখানে শরিয়তি আইনের দাবি অনেক জোরালো এবং মারফতিদের সেখানে আত্মরক্ষার সংগ্রাম অনেক জটিল। ‘আল্ সাদীদ’ নামে এক পুস্তিকার শেষে লেখক আতিয়ার রহমান ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিখছেন: ‘সমাজবাদ-মার্কসবাদ-ওয়াশিংটনবাদে বাংলার মুক্তি নেই। বৃহত্তম মুসলিম জাতির দেশ—এই বাংলাদেশে শরীয়তী সমাজবাদ প্রতিষ্ঠাতেই দেশ ও জাতির উন্নতি নিহিত রয়েছে।’ ম. আ. সোবহান তাঁর ‘জালালী ফয়সালা’বইয়ে লালনের মাজার ধ্বংস করার আবেদন করেছেন।
এই সোবহান সাহেব ১৯৮৬ সালে কুষ্টিয়ার ‘পীর মুরিদী অবৈধ’ এই মর্মে যে ভাষণ দেন তা ছাপা হয়ে বেরিয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন,
আমরা এমন একটা দেশের বা অঞ্চলের মুসলমান যে ভূখণ্ডে পীর-মুরিদী কলমিলতার মতো ছেয়ে গেছে অনেক কাল হতেই।…
