ব্রাহ্মণের দেখাদেখি
কাজী খোন্দকার পদবী রাখি
শরীকী কওলায় ফাঁকি দিয়ে সর্বদাই।
জোলা কলু বা জমাদার যারা
ইতর জাতি বানায় তারা
এই কি ইসলামের শরা
করিস তারই বড়াই?
যেন একটা স্বস্তিকর জায়গায় পা রাখতে পারলাম এতক্ষণে। মুসলমান সমাজেই প্রতিবাদ উঠেছিল তা হলে? লালনের শিষ্য দুদ্দু ইসলামের শরা বা শরিয়তবিরোধী এই শ্রেণী বিভেদের প্রতিবাদে ব্যঙ্গ করেছেন। এতে তো একটা সমাজসত্যও আছে বোঝা যাচ্ছে। ব্রাহ্মণের শ্ৰেণীবৈষম্যের আদলেই কি তবে বাংলার মুসলমান সমাজে আশরাফ-আতরাফ-আরজল? দেলদারের মুখ থমথমে। নিজামী খুব খুশি। সম্মেলনে ফেরার পথটুকু সে সঙ্গ নেয়। অনর্গল বলে চলে, ‘আমাকে সবাই গাঁজাখোর পাগল বলে। কিন্তু আপনাকে বলছি আমাদের বাউল-ফকিরদের জন্ম এই জায়গা থেকে—এই বিভেদের প্রতিবাদে। বৈদিক ধর্ম আর বামনাই সবার সর্বনাশ করল।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা তোমরা যে নিজেদের মারফতি বললো তার মানে তুমি অর্থাৎ নিজামী কী করেছ?’
: শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা জানেন তো? পীর মুরিদি ব্যাখ্যা আরেক রকম আছে। সেটা পয়ারে। যেমন—
শরিয়ত বৃক্ষ জানো হকিকত ডাল
তরিকত বৃক্ষপত্র মারফত ফল ॥
মারফত পূর্ণ নহে বিনা শরিয়তে।
শরিয়ত পুরা নহে বিনা মারফতে ॥
শরিয়ত গাছ কিন্তু নিষ্ফলা গাছের মূল্য কী বলুন? হকিকত হল পথ অর্থাৎ ডাল, যাতে ফল ধরবে। তরিকত পাতা অর্থাৎ আইনকানুন, যার ছায়ার আওতায় ফল ধরবে। ফল ধরাটাই আসল। কিন্তু গাছ তো চাই। সেটুকুই শরিয়ত। আমাদের মুর্শেদ আবার আরেক রকম করে বোঝাতেন। বলতেন,
শরিয়ত মানে হল দল।
দলকে পরিচালনার রাস্তা হল তরিকত।
ওই রাস্তা চলতে হলে হক্ ধরো, সেটাই হকিকত।
যাবে কোথায়? মারফত।
মারফত মানে গোপনতত্ত্ব।
এবারে নিজামীর নিজের ব্যাখ্যা শুনবেন? মারফত মানে গোপনতত্ত্ব—সেই তত্ত্ব নিজে নিজে জানা যায় না। জানতে হয় গুরুর মারফত, বুঝতে হয় দেহের মারফত, সে সাধন করতে হয় শ্বাসের মারফত। একেই আমি বলি মারফত।
আমি বললাম, ‘তোমার সবটাই যে ভুল তা শোধরাবে একদিন মোল্লাদের মারের মারফত। বুঝেছ?’
‘হা হা, আল্লা আল্লা’ নিজামী তুড়ি মেরে বুকে দুটো ঘুষিও বসাল। তারপর বলল, ‘কেবল মার, কেবল মার। সারা দেহে আমায় মারো আল্লা, কেবল লা-মাকান বাদে।’
: সে আবার কী? লা-মাকান কাকে বলে?
: কোনও পয়গম্বর সে পয়গম আপনাকে শোনায়নি বুঝি? তবে নিজামীর মুখে শাস্ত্র শুনুন, পাগলের পাঁচালি। আল্লা যখন মানুষের ধড় বানালেন তখন আত্মাকে পাঠালেন তার ভেতরে। আত্মারাম ছটফট করে বেরিয়ে এল ধড়ের ভেতর থেকে। বলল উরেব্বাস্ জ্বালা জ্বালা। ধড়ের মধ্যে সব জায়গায় শয়তান রয়েছে। তখন আল্লা মানুষের ধড়ের যেখানে হৃৎপিণ্ড তার দু-আঙুল নীচে বানালেন লা-মাকান্। ওইখানে শয়তান কিছুতেই যেতে পারে না। ওইখানে আত্মা থাকেন।
: আর নফ্স?
: নফ্স বলতে আমরা ফকিররা বুঝি বীর্য বা শুক্র। এই নফ্সকে রোখা কঠিন। তাকে রুখতেই আল্লা সৃষ্টি করেছেন নবীর। কিন্তু মানুষ অন্ধ তাই নিজের পরিণাম দেখে না। মানুষ কালা তাই নবীর উপদেশ শোনে না। নফ্সকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করলেই খোদা মিলবে। নফ্সের গোলামি করলেই শয়তান এসে ধরবে। মনসুরের পদ শোনেন,
নফ্সে খোদা নফ্সে শয়তান
করি নফসের তাঁবেদারি।
মায়া-বেড়ি পায়ে পরেছি,
নারীর ফাঁদে ঘুরিফিরি।
: নফ্স রক্ষার জন্যে তোমরা আল্লার মেহেরবানি চাও না?
: আল্লার মেহেরবানি তো সবসময়ই দোয়া করি। তবে মারফতি পথে বড় কথা আপ্ত সাবধান। নিজের অসাবধানতার জন্যে খোদাকে টানা কি ঠিক? সেইজন্যেই বলেছে,
আপন হাতে জন্মমৃত্যু হয়
খোদার হাতে হায়াৎ মউৎ কে কয়?
বীর্যরস ধারণে জীবন
অন্যথায় প্রাপ্তি মরণ
আয়ুর্বেদ করে নিরূপণ করি নির্ণয়।
নিজে বীর্যক্ষয় করে
পশুর মতো পথে পড়ে
কতজনে যায় মরে খোদার দোষ দেয়॥
হা হা, আল্লা আল্লা, জীয়নকাঠি আর মরণকূপ দুটোই সামনে রেখেছ। হা হা, এখন নিজামী কোন্টা নেয়। আল্লা কী বলছেন জানেন তো? ফাজকুরুনি ওয়াসকুরুকুম অর্থাৎ আমাকে যে স্মরণ করে আমি তাকে স্মরণ করি। হাহা, আল্লা, নিজামীরও মাঝে মাঝে বিস্মরণ হয়।
যেন ঘোরের মধ্যেই কেটে যায় কতটা সময়। সম্মেলন বিরতিতে খাওয়াদাওয়া চলছে। সবাই অভিযোগ তুললেন, ‘তেমন করে আপনাকে পেলাম না।’ আমি কী আর বলি? নতুন জগতে দিশাহারা। সহজিয়া বাউলদের জগৎ যদি বা জানি ফকিরদের জগৎ একেবারে অজানা। একটু-আধটু বেনোয়ারি ফকিরের সঙ্গ করেছি বই তো নয়। সে আর কতটা? আমি শুধু চোখ মেলে দেখছি অজানা এক জগতের মানুষজনের।
সামনে বসে সেবা করছেন কত অজানা অনামা ফকির। জানতে হবে এদের করণ কারণ। আধ-পাগল নিজামীর কারবার নয়। ও তো রসখ্যাপা। মনজুর এসে বলল, ‘আব্বাজি ডাকছেন আপনাকে’। গেলাম মযহারুল খাঁর ঘরে। বললেন, ‘কথাবার্তা কই হল না তো? এ সব মেলা মচ্ছবে কি কথার হবার জো আছে? আজ আছেন তো? রাতে কথা হবে।’
বললাম, ‘না। আজ দুপুরেই চলে যাব। মনে দুঃখ রাখবেন না। আসব আবার খুব শিগগির। আসতেই হবে। জানতে চাই অনেক কিছু। বলবেন তো?’
আমার দুটো হাত দু হাতে চেপে ধরে চাপ দিয়ে মযহারুল বললেন, ‘আজকে যে চলে যাচ্ছেন বুকে দাগা দিয়ে তার শোধ হবে আবার এখানে এলে। সত্যিই আসবেন তো? ফকিররা ফাঁকা কথায় আর পোশাকে ভোলে না।’
