: প্রাতঃস্মরণীয় নন?
: প্রাতঃকালে মানুষের থাকে জঠরের চিন্তা, বিষয় চিন্তা। খেজমতের গলায় গান শোনেননি? শুনুন,
আমার এই পেটের চিন্তে
এমন আর চিন্তে কিছু নাই।
চাউল ফুরাল ডাউল ফুরাল
সদাই গিন্নি বলেন তাই।
যখন আমি নামাজ পড়ি
তখন চিন্তা উঠে ভারী
কীসে চলবে দিনগুজারী
সেজদা দিয়ে ভাবি তাই।
আমার পেটের জ্বালা জপমালা
আমি তসবী মালায় জপি তাই॥
হা হা, আল্লা আল্লা!
আমি গান শুনতে শুনতে পোশাক পালটে নিয়ে বললাম, ‘বেশ। এবারে সম্মেলনে যাব। তুমি যাবে না?’
‘যাব, তবে এখন আমার মনে মহাসম্মেলন চলছে’ নিজামী বলল, ‘সেই সম্মেলনের ভাষণ মানে একটা বয়েত এখনই লিখে ফেলতে হবে নইলে ভুলে যাব। খুব কাকভোরে যখন ঘুলঘুলি দিয়ে আলো আসছিল, নিজামীর আলো, তখন একটা বয়েত বানিয়েছি, শুনবেন?
ভূমণ্ডলীর প্রত্যেকটা বালিকণার
মূল্য আছে। কারণ প্রতিটি বালিকণা
আলোর উজ্জ্বলতায় চিক চিক করে।
আমি প্রভাতসূর্যের প্রসন্নতা নিয়ে নিজামীর দিকে চেয়ে রইলাম সস্নেহে আর তার দুরবগাহ মনের সন্ধান করতে লাগলাম। নিজামী উঠে দাঁড়িয়ে নাটকীয় আবৃত্তির ঢঙে বলল,
আমি যা চেয়েছি তা পেয়েছি
তুমি শ্রেষ্ঠ।
এবার আমায় নিয়ে চলো শেষ যুগে
দ্বার খুলে দাও।
আমি বললাম, আমাকে কি ফেরেস্তা ঠাউরেছ না কি?
: আপনিই ফেরেস্তা, আপনিই জিব্রিল, আপনিই নবী। আপনিই খদ্, আপনিই খোদা। আপনার মধ্যেই হা হে হু-র ধ্বনি শুনছি।
বিচিত্র ভাষা, বিচিত্র জগৎ। আমি সেখানে কতটাই পরবাসী, পরভাষাভাষী। অথচ আশ্চর্য যে এই নিজামী আর আমি কাল পাশাপাশি বসে তেল-খিচুড়ি খেয়েছি। মানুষের বিশ্বাসের জগৎ কি এতটাই আলাদা? আপন ঘরে নিজের আমি নাকি পরের ঘরে আপন আমি?
সম্মেলনের প্রাতঃকালীন অধিবেশনে বসলাম মযহারুল ফকিরের পাশে। আলাপ করিয়ে দিলেন ছেলে মনজুরের সঙ্গে। কাল তার গলায় চমৎকার তত্ত্বগান শুনেছিলাম। বক্তৃতা আর প্রস্তাব গ্রহণের মাঝখানে কিছুক্ষণ বসে আমি গুটিগুটি উঠে যাই মাঠের দিকে বেড়াতে। শস্যকীর্ণ সবুজ মাঠে তখনও কুয়াশার ঘেরাটোপ। মুগ্ধ একা দাঁড়িয়ে কত কিছু দেখছি। কিছু দূরে একটা বানে খেজুর রসের তাতারসি জ্বাল হচ্ছে। জমিতে লাফিয়ে পড়ছে দুটো-চারটে ফিঙে। এই কনকনে সকালে আধাউলঙ্গ দুটি শিশু তাতারসির লোভে ঘুরছে। হঠাৎ সামনে এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালেন একজন গ্রামবাসী, মাঝবয়সি। লুঙ্গি, গেঞ্জি পরনে। নাম বললেন দেলদার হোসেন খাঁ। জিজ্ঞেস করলাম, এ গাঁয়ে যাদের সঙ্গেই আলাপ হচ্ছে তাদেরই নামের শেষে খাঁ, কী ব্যাপার? আত্মতুষ্ট হেসে বললেন দেলদার, ‘বলতে পারেন খানদানি গ্রাম। সবাই খাঁ। আশরফ অর্থাৎ কিনা শরিফ আদমি’।
: সত্যিই?
: এককালে নিশ্চয়ই ছিল। এখনও গর্বটুকু আছে। তবে সবাইয়ের চাষবাস এখন। সেই কথাটা কি শুনেছেন? সেই যে বলে,
গায়ে গন্ধ আতর আলী
চোখ কানা নজর আলী
একটাও বাক্স নেই দেদার বক্স
আমাদের অবস্থা তেমন ধারা। অবস্থা যাই হোক আমরা এক একজন খয়ের খাঁ। তবে হ্যাঁ, মযহারুল চাচা সত্যিকারের খাঁ বটে। কী বুকের পাটা। চারপাশের শরিয়তিদের মাঝখানে মারফতি ফকিরদের নিশেন ধরে আছে।
: আচ্ছা, মুসলমানদের কী শ্রেণী বর্ণ আছে?
: জাহেরে নেই, বাতুনে আছে। মানে ভেতর ভেতর। দেখুন আল্লার এই দুনিয়া চলছে দু নিয়া অর্থাৎ দুটো জিনিস নিয়ে। সে দুটো কী? বড়লোক আর গরিব লোক। ধনী আর দরিদ্র। আশরাফ আর আতরাপ।
: আরেকটাও তো আছে—আরজল?
: ওটাকে মুসলমানদের মধ্যে ধরবেন না। আরজল কারা জানেন? এই বেদে বাজিকর পোটো চামার এইসব। পতিত শ্রেণী।
: আশরাফ কারা?
: আশরাফ হল উচ্চশ্রেণীর মুসলমান—সেখ সৈয়দ মোগল পাঠান। এদের মধ্যে সৈয়দরা সবচেয়ে খানদানি। তাদের আবার দুটো গোষ্ঠী, ফাতেমীয় আর উলবি। এদের আবার উপগোষ্ঠী আছে—হুসেনী, হাসনী, মুসাবী, রাজভী, কাজিমী, তাকাবী, নাকাৰী এইসব। কিন্তু এ সব শুনতে কি আপনার ভাল লাগছে?
: কেন লাগবে না? আমাদের পাশাপাশি এই বাংলায় যারা শতশত বৎসর বাস করছে তাদের প্রায় কিছুই জানি না এটা কি ভাল? এর থেকেই তো অবিশ্বাস দলাদলি কাটাকাটি। কিন্তু এত সব জানলেন কী করে?
: মুখে মুখে শেখাতেন আব্বা। তো শুনুন, সেখদের মধ্যে সেরা হল কোরেশী কেন না ওই বংশেই হজরত মহম্মদের জন্ম। সেখদের অন্য শাখার নাম—সিদ্দিকি, ফারুকি, আলমানী, আব্বাসী খালেদী—আরও কী সব আমার মনে নেই। মোদ্দা কথা সেখ ও সৈয়দরা এসেছিল আরব থেকে। শুনেছি মধ্য এশিয়ার তুর্কীরা ভারতে এসে মোগল নাম পায়। আফগানরা হল পাঠান। এই পাঠানদেরই বংশধর আমরা অর্থাৎ খাঁ।
খেয়াল করিনি কখন নিজামী এসে দাঁড়িয়েছে চুপিসারে। দেলদার খাঁর কথা শেষ না হতেই নিজামী বলল, ‘তবে তোমরাও খানদানি খাঁ নও। আতরফ খাঁ।’
‘কেন?’ আমি জানতে চাইলাম।
: কারণ বিদেশি মুসলমানদের সঙ্গে এদেশীয়দের সাদি হয়ে যে মিশ্র শ্রেণী হয়েছিল তারাও আতরাফদের মধ্যে খানদান। তাদের টাইটেল কাজী, চৌধুরী, শেখ, খাঁ, মালিক।
দেলদার রাগ করে বললে, ‘আর তুমি কী?’
: আমি আশরফও নই, আতরাফও নই। আমি হক। মানাউল্লা হক। হক মানে সত্য, হকিকৎ। জাত বিভেদে আমি নেই। দুদ্দুর গানে শোনোনি?
এ দেশেতে জাত বাখানো সৈয়দ কাজী
দেখি রে ভাই।
যেমন বঙ্গদেশের ব্রাহ্মণ সবাই।
