যেমন হুট করে উঠে দাঁড়িয়েছিল তেমনই হুস করে বসে পড়ল নিজামী। আমি হতভম্ব হয়ে সেই প্রায়ান্ধকার ঘরে নিজামীর ছায়াবাজি দেখতে লাগলাম। সে এই ওঠে এই বসে আর আউড়ে চলে:
হে প্রভু, তুমি যে ছবি এঁকেছ আমায়
সেই ছবি পৃথিবীতে জন্ম রূপান্তর
তাই আমি নিজেই সেই ছবি দেখছি।
যাঁর যত চিন্তা তাঁর ততই নিঃসঙ্গ
বেঁচে থাকতে ইচ্ছা জাগে, প্রকৃতিকেই
কেন্দ্র করে মনের গোপন প্রতীক্ষায়।
চিন্তায় রয়ে গেছে আমার মুক্তি পথ
যতই চিন্তা করি আমি নিঃশব্দ থাকি
প্রকৃতির নিঃশব্দ সাধনায় ধর্ম কী?
প্রেমের মধ্য দিয়ে মানুষ সৎ ভাবে
বেঁচে থাকতে পারে, মানুষের অপ্রেম
মধ্যে বেঁচে থাকতে সৎগুণের মৃত্যু।
মুশকিল যে, নিজামীর রচনা নিতান্ত ফেলনা নয়। শুনেই বুঝছি তার মর্মরস আছে। কেমন করে এমন লেখে আধা পাগল আধা ফকির নিজামী? আমার সঙ্গে আলাপ হওয়া থেকে এই মধ্যরাত পর্যন্ত সে অবিশ্রাম গাঁজা খাচ্ছে। বুঝছি তার মাদকেই এই বকে যাওয়া নিজামীর। কিন্তু এ সবই তার অপূর্বকল্পিত রচনা মুখে মুখে? সত্যিই ফকিরদের জগৎ খুব আধো রহস্যে নিমীল। বিশেষ করে নিজামীর সঙ্গে রাত কাটানো এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। বাকি রাতটুকুতে যখনই ঘুম ভাঙে দেখি নিজামী বসে আছে আর বিড় বিড় করছে। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড জোরে আঙুলে তুড়ি মেরে বলে উঠছে ‘আল্লা আল্লা’। আগের সন্ধেবেলা সে আরেক কাণ্ড করেছিল। সম্মেলনে তখন একজন অধ্যাপক বক্তৃতা দিচ্ছিলেন লোকসংস্কৃতি বিষয়ে। তাঁর ভাষণে লোকজীবন-অভিজ্ঞতার ছাপ ছিল না বরং কেতাবি বিদ্যে বড় জাহির হচ্ছিল। টোটেম, জাদু বিশ্বাস, ফার্টিলিটি ওয়ারশিপ, কাল্ট, সেক্ট্ এ সব খুব কপচাচ্ছিলেন। সভ্যভাবে বসে সবাই তা শুনছিলেন, নিরুপায়। হঠাৎ শ্রোতাদের মধ্যে থেকে খাড়া উঠে দাঁড়িয়ে তুড়ি মেরে নিজামী বলে উঠল, ‘আল্লা আল্লা, জ্ঞান দে জ্ঞান দে।’ অধ্যাপক হতচকিত, আমরা তো অবাক। অবশ্য কাজ হল। অধ্যাপক জ্ঞানদানে বিরত হলেন।
এক এক সময়ে ভাবছিলাম রোজকার জীবনে এমন এক-আধটি নিজামী থাকলে মন্দ হয় না। সবরকম ভণ্ডামি আর বক্তৃতা, অহংকার আর তাত্ত্বিকতার মধ্যে এমন করে ঠাণ্ডা জল ফেলার দরকার খুব। যাই হোক শেষ রাতের দিকে নিজামীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি সারা রাত ঘুমোও না?
নিজামী বলল, ‘রাতেই তো তাঁর সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়। যা-কিছু চিন্তাভাবনা, বয়েত রচনা সবই আমার রাতে। রাতেই তাঁকে দেখা যায়। সবাই তখন ঘুমিয়ে থাকে। আর ঘুম জিনিসটা কী বলুন তো? নিজামী তার বয়েতে বলছে,
আমার ঘুম এসে যায় যখন চিন্তা
করার যুক্তি থাকে না। যুক্তি নিয়ে বেঁচে
থাকাটাই ঠিক জীবনের জ্ঞান শক্তি।
নিজের রচনাপ্রতিভায় আত্মমুগ্ধ নিজামী তুড়ি মেরে বলল, ‘হা হা হা, আল্লা আল্লা, নিজামী ঠিক লিখেছে। আপনি ঘুমোন, কাল জ্ঞান দেবেন মিটিঙে। ততক্ষণ আমি একটু স্মোকিং করি। স্মোকিং মানে রাজার অভ্যেস জানেন তো? স্মো-কিং, কিং মানে রাজা, হা হা আল্লা আল্লা।’
খুবই আশ্চর্য অস্তিত্ব সন্দেহ নেই। একজন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের যুবা বেঁচে আছে মাদক আর শব্দের মাদকতায়। অনায়াসে লেখে গাঢ় ভাবনার বয়েত। কেমন করে হয়? আহার নিদ্রার ঝোঁক একেবারে নেই। শুনেছি সুফি সাধকদের সাধনার দুই স্তর—‘ফানা’ আর ‘বাকা’। ঈশ্বর বা উপাস্যের সঙ্গে লীন হয়ে থাকার অদ্বৈত অবস্থাকে বলে ফানা। আর উপাস্যের সঙ্গে অবিশ্রান্ত ভাব বিনিময়ের স্থায়ী দ্বৈতলীলাকে বলে বাকা। নিজামীর কোন অবস্থা? ফানা না বাকা?
হয়তো কোনওটাই নয়, নিতান্ত বায়ুরোগী বা অর্ধোন্মাদ। সেদিক থেকে সব বাউল ফকিরই তো অর্ধোন্মাদ। নিজের ঘর গেরস্থালি ছেড়ে ব্রাত্যজীবনে এই যে আত্মানুসন্ধান দেহের দিক থেকে, সেও কি কম পাগলামি? ‘বা’ মানে আত্ম, ‘উল্’ মানে সন্ধানী—এই থেকেই নাকি বাউল শব্দের সৃষ্টি। আবার কেউ বলে বাতুল থেকে বাউল। কে জানে? ফকির কথাটার মানে অবশ্য সে তুলনায় অনেক স্পষ্ট। সব কিছু ছেড়ে ফকির বনে যাওয়া। সব কিছু বলতে বেশির ভাগ মানুষ ভাবেন ভোগ সুখ বিত্ত ঐশ্বর্য। তা কিন্তু নয়, সবকিছু মানে সব রকমের সংস্কার বর্জন, জন্ম মৃত্যু-পুনর্জন্ম-লোকলজ্জা-সমাজ। নিজামী বলেছিল যখন চিন্তা করার যুক্তি থাকে না তখন ঘুম এসে যায়। আপাতত আমার চিন্তা করার যুক্তি এত প্রবল যে ঘুম ছুটে গেল। ভোরও একটু একটু করে মাঘের কুয়াশা ভেদ করে উঠতে চাইছে। নিজামী বিড় বিড় করছে। আমি বললাম, ‘নিজামী কী করছ?’
অর্ধনিমীল চোখে সে বলল, ‘ফজরের নামাজ কায়েম করছি।’
আমি বললাম, ‘দুঃখিত, তোমার নামাজে বাধা দিলাম।’
: কিছু না। আমাদের বাতুনে (অপ্রকাশ্য) নামাজ। অন্তরের গভীরে চলছে। সেখানে মানুষের স্বর পৌঁছায় না।
তুড়ি মেরে আল্লা আল্লা বলে নামাজ শেষ হল। একগাল হেসে বলল, ‘খুব ঘুমোতে পারেন দেখলাম। বেলান্তই ঘুমোচ্ছেন, চোপর রাত।’
: চোপর রাত আর কোথায়? শুতেই তো এলাম দুপুর রাতে।
: হা হা, আল্লা আল্লা। কখন যে দুপুর কখন যে চোপর কে জানে। সব সমান নিজামীর কাছে। আল্লার কাজ-কারবার সারাদিন ধরে চোখ মেলে দেখি আর তাজ্জব বনে যাই। রাতে কিছু দেখা যায় না। দেখুন আল্লার হেকমৎ। তখন গোরু আর গোলাপ সবই আঁধার। ঠিক তখনই রুহু মানে আত্মার আলো জ্বলে ওঠে। আল্লা রাতস্মরণীয়। হা হা। আল্লা রাতস্মরণীয়।
