: কী করে এমন হল?
: আমি করেছি ক্রমে ক্রমে সহজে কি হয়েছে? সময় লেগেছে।
: একটু বলুন, শুনি।
: আমার বয়স এখন ষাট। ছোটবেলা থেকে আমার ফকিরি মতে আগ্রহ। তখন থেকে ওদের সঙ্গে ঘোরাফেরা। বাড়িতে কত ঝগড়া হয়েছে বাপজানের সঙ্গে। তাড়িয়ে দিয়েছেন। খাঁটি শরিয়তি মুসলমান ছিলেন তো। তর্ক বাধত। আমিও ইসলামি শাস্ত্র পড়েছি। আরবি জানি, কোরান আর হাদিসের মর্ম বুঝি। এ দিগরে কোনও আলেম মোল্লা আমার সঙ্গে বাহাসে পারেনি। এখন আর ঘাঁটায় না।
আত্মপ্রত্যয়ী মানুষটিকে ভাল লাগল। বুঝলাম মযহারুলের ব্যক্তিত্বে, বিচারে আর প্রভাবে গোরাডাঙা গ্রামের মানুষজন সবাই ফকির না বনে গেলেও ফকিরদের বিষয়ে অসহিষ্ণু নন, বরং সহযোগী। এই তো একপাশে বটগাছতলায় যে শত শত মানুষের জন্যে রান্না হচ্ছে তাতে হাত লাগিয়েছে কত গ্রামবাসী। রাতে ফকিরি গানের আসরে মনপ্রাণ দিয়ে গান শুনবে যারা তারা হিন্দু না মুসলমান? শরিয়তি না মারফতি? কোনওটাই নয়। তখন তারা মানবরসিক। গান পাগল। কিন্তু খাঁটি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব নাকি বলে গান জিনিসটা হারাম, বেয়াদাত। কটাক্ষ করে আসাদ্উল্লা নামে এক নীতিবাগীশ একবার লেখেন,
কোন কোন পীর তোক বাজনা বাজায়।
সুর দিয়া গান করে হাততালি দেয় ॥
জবাবে আবদুর রসিদ চিস্তি তাঁর ‘জ্ঞান-সিন্ধু বা গঞ্জে তৌহিদ ইত্যাদি’বইতে লেখেন,
যে গানের সাহায্যে আল্লাহ্ ও রসুলের প্রতি আসক্তি জন্মে, তাহাকে ধর্মসঙ্গীত বলে। কিন্তু মৌলভী সাহেবদিগের ফতাওয়া অনুসারে যদি তাহাও বেয়াদাৎ হয় তবে মৌলবী সাহেবরা ওয়াজের মজলিশে মওলানা রূমের মসনবী, দেওয়ান হাফেজ, দেওয়ান শামন তবরেজ, দেওয়ান লোক, দেওয়ান মইনুদ্দিন চিস্তি, দেওয়ান জামী প্রভৃতি সিদ্ধ পুরুষদিগের দেওয়ান ও মসনবীর বয়াত গাহিয়া ওয়াজ করেন কেন? যত দোষ কি কেবল বাঙ্গলাগানের বেলায়?
আসলে গানই মারফতিদের ভাষা। একতারাই তাদের জীবনের প্রতীক। সেই একতারা যদি কেউ কেড়ে নিয়ে ভেঙে দেয়, গান গাইতে না দেয়, তবে মারফতিদের ধর্মসাধনাতেই তো হাত পড়ে। প্রতিরোধ তো করতেই হবে সে অন্যায়।
ইতিমধ্যে একজন ধরে আনেন রুহুল আমিনকে। এই সেই রুহুল যার কথা শুনেছিলাম আকবর আলীর কাছে। গত বছরে জুলাই মাসে মীর্জাপুরে এই রুহুলের দাড়িগোঁফ কামিয়ে, একতারা ভেঙে দিয়ে, বাড়ি পুড়িয়ে ধর্মান্ধৱা তাড়িয়ে দিয়েছে তার স্বগ্রাম থেকে। রুহুল এখন আর দাড়ি রাখেন না ঘৃণা আর গ্লানিতে। চোখে গাঢ় অভিমান। কেউ যেন খুব বড় ধরনের বিশ্বাসভঙ্গ করেছে তাঁর সঙ্গে, মুখের ভাষা তেমনতর থমথমে। একখানা সাদা ধুতি পরনে, সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে রুহুল সামনে বসে আছেন চুপ করে। আমার অন্তরে মর্মান্তিক বিবেক দংশন।
আমি কেবল রুহুলের হাতদুটো ধরি গভীর মমতায়। রুহুল তাকায় ব্যথিত চোখে। আশ্বাস খোঁজে এতগুলি মানুষের সান্নিধ্যে।
ইতিমধ্যে ছোট এক জটলায় দোতারা বেঁধে গান ধরেছে এক অজানা বাউল। গানটা এই মুহুর্তের গুমোট কাটাতে খুব প্রাসঙ্গিক মনে হল:
সাঁই রাখলে আমায় কূপজল করে
আন্দেলা পুকুরে।
হবে সজল বরষা
রেখেছি এই ভরসা
আমার এই দশা যাবে
কত দিন পরে॥
কূপজলের বদ্ধতায় আটকে আছে বহতা সমাজের ধারা। ধর্মান্ধতা, হানাহানি, ঈর্ষা আর অসূয়া সব দিকে।
সন্ধের পর শুরু সম্মেলন। গান আর গান, ভাষণ আর ঐক্যবদ্ধতার প্রতিজ্ঞা। সবকিছুর মধ্যেও কিন্তু আমার মনের পর্দায় কেবলই সুপার ইম্পোজের মতো ভেসে থাকছিল রুহুলের বেদনাবিদ্ধ অভিমানী মুখ। অথচ কত বাউলের সঙ্গে কত দরবেশি ফকিরের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হল সে রাতে। খাওয়ার অভিজ্ঞতাও খুব নতুন রকমের। পাটকাঠি পাতা মর্মর্ শব্দের আসনে বসে গরম খিচুড়ি খাওয়া সরষের তেল দিয়ে। তখন মাঘের মধ্যরাত। শিরদাঁড়া পর্যন্ত কাঁপছে থরথরিয়ে। কোনও রকমে খেয়ে উঠেই দৌড় রাতের আশ্রয়ে। একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমানের দলিজে শোওয়া গেল। আশ্রয়দাতা শরিফ মানুষটিকে বললাম, ‘এই বাড়ি আপনার?’
ফকিরি ধাঁচে উত্তর দিলেন, ‘গ্রামের সবাই তাইতো বলে।’
ওদিকে মাইকে শোনা যাচ্ছে অবিশ্রান্ত ফকিরি গান। সারা রাত চলবে। পাশে বকবক করে চলে আধপাগল মানুষ মানউল্লা। এক সময়ে নাকি ফকিরি করত। গাঁজার মাত্রাভ্রমে মাথার গণ্ডগোল। নিবাস মাদারিপুর। আমাকে বলে, ‘লোকে আমাকে পাগল বলে। কিন্তু আমি পাগল নই। আমি খ্যাপা। অসহ্য সইতে পারি না। এই যে রুহুল ফকিরের ওপর অত্যাচার তার প্রতিবাদে আমি গান বেঁধেছি। জানেন, আমি প্রবেশিকা পর্যন্ত পড়েছি। আমার ছদ্মনাম নিজামী। ওই নামে আমি লিখি।’
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘নিজামী মানে কী?’
: নিজামী শব্দের মানে হল সজ্জাকর বা প্রসাধক। কিন্তু ভাবার্থ হল—কলুষনাশক, পবিত্রকারী, সংস্কারক। যেমন কিনা ধরুন সূর্য। পৃথিবীর সব আবর্জনা, পাঁক, মালিন্য তিনি লেহন করে নিচ্ছেন।
হঠাৎ বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে উঠে নিজামী বলে উঠল নাটকীয়ভাবে হাত নেড়ে, ‘যখন মানবসমাজ সম্পূর্ণভাবে কলুষকুণ্ডে তলাইয়া যাইতে থাকে, যখন ওই ঘুণধরা শতছিদ্র ডিঙ্গাখানি পাপ-সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মুখে নিমজ্জিত হইতে বসে, তখনই হয় বজ্রমুষ্টি কাণ্ডারীর প্রয়োজন। নিজামীর প্রয়োজন। যখন সমাজ তথা জনসাধারণ স্বার্থবাদী মুষ্টিমেয় কতকগুলি নরপশু, পণ্ডিত মোল্লার হস্তে নিষ্পেষিত হইতে থাকে, তখনই হয় নিজামীর প্রয়োজন।’
