তবে কেন জপতপ এত
করে রে জলেস্থলে।
যে পথে পঞ্চভূত হয়
মলে তা যদি তাতে মিশায়
ঈশ্বর অংশ ঈশ্বরে যায়
স্বৰ্গনরক কার মেলে॥
এতসব যুক্তিতর্কের উতোর চাপানো ভজকট ব্যাপার। তাই ওইসব গোলমালে যেতে চাইনি। তবে একেবারে ছাড়িওনি। যাকে বলে তক্কে তক্কে থাকা তাই ছিলাম।
এমন সময়ে একদিন এলেন বহরমপুর থেকে আকবর আলী শেখ নামে এক উদ্যমী যুবা। অধ্যাপক শক্তিনাথ ঝা তাঁকে পাঠিয়েছেন আমার কাছে। বাউল ফকির সংঘের তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলনে নেমন্তন্ন সামনের জানুয়ারিতে। সংঘের সভাপতি শক্তিনাথ ঝা, সম্পাদক আকবর আলী। বাউল ফকির সংঘ ব্যাপারটা কী?
প্রথমে আকবর আলী হাতে ধরালেন এক লিফলেট। তাতে সার কথা এই;
ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, খ্রীস্টান বা ইসলামের মতো বাউল ফকির মতবাদ কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায় নয়। এ এক জীবন দর্শন ও জীবন চর্চা পদ্ধতি। যে কোনো ধর্মের মানুষ স্বধর্মে থেকে এ মতবাদকে স্বীকার ও পালন করতে পারেন।
যে-সমস্ত কল্পনা বা চিন্তার বস্তুগত কোনো ভিত্তি নেই; পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে যা পাওয়া যায় না—এমন সমস্ত চিন্তাকে ফকির-বাউল অনুমান বলে অগ্রাহ্য করে।…কাল্পনিক দেবতায় তার অনীহা। জীবিত মানুষ সৃষ্টির সর্বোচ্চ বিকাশ, তার অনুসন্ধেয় ও মান্য।…
জাত, পাত, ধর্মের বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রবল বাষ্পে ভারতবর্ষ আজ মুহ্যমান। আমরা বাউল-ফকিরগণ যা-কিছু মানুষকে বিভক্ত করে তার বিরোধী। আসুন আমরা আমাদের মহান মানবতাবাদের বাণীকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরি।
কথাগুলি তো সুন্দর। এবারে শুরু করি প্রশ্নমালা আকবর আলীকে।
: আপনাদের সংঘের প্রথম সম্মেলন কবে হয়েছিল? কোথায়?
: ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আমাদের সংঘের সূচনা। প্রথম সম্মেলন হয় মুর্শিদাবাদের স্বরূপপুরে। ১৯৮৪-র ১২ মার্চ।
: দ্বিতীয় সম্মেলন?
: মুর্শিদাবাদের হরিহর পাড়ায় ১৭ মার্চ ১৯৮৫।
: এবারে?
: এবারে নদীয়া সীমান্ত করিমপুরের সন্নিকট গোরাডাঙ্গা গ্রামে হবে ২৫ আর ২৬ জানুয়ারি। যাবেন তো?
‘যাবার ইচ্ছে তো খুবই’ আমি বললাম, ‘কিন্তু তার আগে সব ব্যাপারটা তো জেনে নিতে হবে। আচ্ছা, আপনাদের বাউল-ফকির সংঘ হঠাৎ গড়ে উঠল কেন?’
আকবর আলী শান্তভাবে কিছু স্পষ্ট করে বললেন, ‘সত্যিকারের কারণ হল সংঘবদ্ধ হবার দরকার ছিল তাই। বলতে পারেন মারপিটের জবাবে বাধ্য হয়ে এক হওয়া। শুনেছেন কি গত ক বছরে বাউল ফকিরদের ওপরে কী রকম অত্যাচার করে চলেছে কট্টর ধর্মান্ধরা?’
: শুনেছি বললে ভুল হবে, বলা উচিত পত্র-পত্রিকায় পড়েছি। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদেই বোধহয় বেশি।
: হ্যাঁ। ওই জেলাতেই তো বাউল-ফকিরদের সংখ্যা বেশি, মসজিদ মৌলবীর সংখ্যাও বেশি। ঘটনা তাই ওই দিকেই বেশি ঘটে। তবে ছোটখাটো ঘটনা এদিক ওদিকেও হয়, খবর আসে না। তবে আমরা খবর পাই। রুখে দাঁড়াই। প্রশাসনকে বলি।
: সম্প্রতি বছর দুয়েকের মধ্যে ঘটে যাওয়া কোনও বিশেষ অত্যাচারের খবর বলতে পারেন?
‘পারি।’ আকবর আলী ডাইরি খুলে পড়তে লাগলেন, ‘১৯৮৪ সালের ১২ এপ্রিল মুর্শিদাবাদের নওদা থানার দুর্লভপুরে লতিফ বলে এক ফকিরকে বল্লম দিয়ে মেরেছে। ১৯৮৫ সালে ১৩ জুলাই জলাঙ্গী থানার ফরাজি পাড়ায় আমাদের সভা করতে দেয়নি, মারধোর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। ১৪ জুলাই সারগাছির অন্তর্গত বাণীনাথপুরের মীর্জাপুর পাড়ায় আমাদের রুহুল আমিনের ওপর অত্যাচার করে। তাকে মেরে চুল-দাড়ি কেটে, গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ১৫ জুলাই বেলডাঙা থানার গোপীনাথপুরে অত্যাচার হয়েছে আবদুর রহিমের ওপরে। এ ছাড়া গালমন্দ, শাসানি, চোখরাঙানি এ সব তো সর্বদাই লেগে আছে। এর পরও যদি আমরা সংঘবদ্ধ না হই…’
‘হ্যাঁ, ঠিক কাজই করেছেন’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই যাব আমি। ২৪ তারিখেই পৌঁছে যাব। গোরাডাঙা গ্রামে অবশ্য যাইনি কখনও। ওখানে আবার সভাসমিতি করা যাবে তো?’
: কোনও ভয় নেই। ফকিরদের শক্ত ঘাঁটি। গাঁয়ের মানুষজন ভাল।
মাঘ মাসের শেষ বেলায় পৌঁছে গেলাম ধুলোডোবা গ্রাম গোরাডাঙায়। নামেই নদীয়া জেলা, আসলে ভাষাভঙ্গি কথার টানে পাক্কা মুর্শিদাবাদ। ছোট্ট গ্রাম। শ-দেড়েক পরিবার বাস করেন। একচেটিয়া মুসলমান। চাষবাস একমাত্র জীবিকা। এ সব নানা খবর হাঁটতে হাঁটতেই সংগ্রহ হয়ে যায়। অবশেষে সম্মেলনের জায়গায় পৌঁছে যাই। উদ্যোক্তাদের করতলের উষ্ণ আহ্বানে সাড়া দেয় আমার করতল। শ্রান্তভাবে বসে পড়ি সামিয়ানার নীচে। চারপাশে ইতস্তত জটলা বাউল-ফকিরদের। এখনই গাঁজাসেবা শুরু হয়ে গেছে। শক্তিবাবু আলাপ করিয়ে দেন মযহারুল খাঁ-র সঙ্গে। এই গ্রাম আর এই চত্বরের প্রধান ব্যক্তি। দোহারা চেহারা। ধুতি আর শার্ট পরনে। লাজুক হেসে একবার মযহারুল দেখা দিয়ে যান। সবাই পাকে সাকে ব্যস্ত। শ্রান্তি কাটতে না কাটতেই এসে যায় চা আর মুড়ি। শুরু করি মযহারুল ফকিরের সঙ্গে আলাপচারি। উদার স্বভাবের গৃহী ফকির। সম্পন্ন চাষি-পরিবার। সম্মেলনের ঝুঁকি আর গুরু দায়িত্ব প্রধানত তাঁরই চওড়া কাঁধে। সংলগ্ন বড় বাড়িটাও তাঁর। তাঁর ছেলেরাও ফকিরি ধর্ম মেনে চলে। ফকিরি গান গায়।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ গাঁয়ে ফকির সম্মেলন করছেন, কোনও বাধা হবে না তো? কোনও হাঙ্গামা?
একগাল হেসে মযহারুল বললেন, ‘কে করবে হাঙ্গামা? কেন করবে? কারুর সঙ্গে তো বিরোধ নেই। আসলে কী জানেন, এ গাঁয়ের দেড়শো ঘর মুসলমানের মধ্যে একশো ঘরই ফকিরি মতে চলে।’
