‘নেহার’ মানে তো দৃষ্টির গভীরে ডুব দেওয়া, চেতনার অতলে। সে ক্ষমতা কি আছে আমার? আমি শুধু ভাবি যে, মেটাফিজিকাল কবিতা চেখেছি, সুররিয়ালিজম ঠুকরেছি, কিন্তু দুশো বছর আগেকার গ্রাম্য গীতিকার বাংলা ভাষায় লিখে গেলেন এমন অন্তর্গহন বাক্য ‘যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে?’
ইমানালী মুচকি হেসে বলেন, ‘শেষপর্যন্ত সেই নিঃশব্দই সার। সেই সৃষ্টির পয়লা দিনে ছিল নিঃশব্দ, আখেরি দিনেও থাকবে নিঃশব্দ। মাঝখানে এই কদিন আমরা তৈরি করেছি শোরগোল—শব্দ। শব্দও থাকবে না। মানুষকে ধরো তবে মানুষ কী তা জানবে।
ধরো ধরো মানুষ ভগবান
মানুষ ভজলে পাবি নন্দের নন্দন
সে যে সদা বর্তমান।
আমি বললাম, ‘কোথায় বর্তমান?’
ইমানালী বললেন, ‘মানুষের মধ্যেই বর্তমান। সবই মানুষে আছে। সেইজন্যেই বলেছে,
মানুষরূপে গুরু
মানুষ কল্পতরু
মানুষ রত্ন পায়।
আবার মানুষ ডুবুরি মানুষের কাছে—
ও তুমি মানুষের গুরু
মানুষকে জানো।
আমি পড়ে গেলাম ধন্দে। এ যেন সেই লালনের গানের মতোই, ‘কথা কয় দেখা দেয় না’ গোছের। এ সব ফকিরদের বাক্য বোঝা ভার। বেশ বুঝছি বেশ বুঝছি, হঠাৎ গহিন জল। আসলে আমি তো বুঝতে চাইছি আমার উচ্চশিক্ষালব্ধ লজিকে। ইমানালী বোঝাচ্ছেন তাঁর বোধবুদ্ধির নিজস্ব ধরনে ও ভাষায়। যে জায়গাটা বুঝছি না ভাবছি সেটা মিস্টিক অতীন্দ্রিয়। ওটাও পুঁথিপড়া লেবেল। এঁটে দিয়ে নিশ্চিন্দি।
এইরকম ধন্দকার নির্বোধ গুমোটে অনেক সময় গান দিয়ে দুদণ্ডের স্বস্তি আনা যায়। তাই বললাম, ‘বরং একটা গান করুন।’
লোকায়ত স্বভাবের মানুষটি সোজা সুরে ধরলেন অকপট গান—
চলো সখী দেখিতে যাই
শ্যাম আছে যেখানে।
শুনি নাথ বিরাজ করে
হা হে হু ভুবনে ॥
গানে বাধা দিয়ে বললাম, ‘কী বললেন? হা হে হু ভুবনে? এ সব শব্দের কি কোনও মানে আছে?’
নিরুত্তরে গান চলল,
অচিন চিনিবার তরে
আমি গিয়েছিলাম শ্যামনগরে।
বসে কালা নিগম ঘরে মুরলী বাজায়—
হুহুহুহুহু-এর ধ্বনি মধুর শোনা যায়।
অচিন দেশে শ্যাম নিশানা
হা হে হু-র বারামখানা।
শুরু হল শব্দের পেছনে ছোটাছুটি। হাহা-হুহু-হেহে। এ সব তবে ধ্বন্যাত্মক শব্দ নয়? মন আমার হুহু করছে। হাহা করে হাসি। এইসব শব্দ প্রয়োগ কি তা হলে ভুল করেই করলাম এতদিন?
আমি যেন ‘গুপ্তধন’ গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের মতো আমার চারপাশের নির্বোধ গুমোটে করাঘাত হেনে বলতে চাইলাম—‘সন্ন্যাসী দরজা খোলো।’ ইমানালী বললেন, ‘প্রথমেই কি আর শব্দের মানে পাবে? এ কি অভিধান? খুললে আর পেয়ে গেলে? সব শব্দ কি অভিধানেই থাকে? পড়ো দেলকেতাব।’
যেন যুগান্ত পেরিয়ে একটা গান হঠাৎ স্মরণে এল। খুব ছোটবেলায় শুনতাম দিগনগর গ্রামে একজন ভিখিরির গলায়:
হুহু করে আসিয়াছি
হাহা কইর্যা যাব।
কিশোর মন তখনকার মতো এ গানের এক লাগসই মানে করে নিয়েছিল। অর্থাৎ কিনা মনের মধ্যে একটা হুহু শূন্যতাবোধ নিয়ে আমাদের আসা এই জগতে, আবার যাবার কালেও সেই হাহাকার। এবারে সব ছেড়ে যাবার দুঃখ।
কিন্তু গোঁজামিল ধরা পড়ল এতদিনে। একটা মস্ত ফাইল একেবারে। তাই বলে এই ‘হা হে হু-র বারামখানা’ এতদূর? মানে কী ধ্বনিগুলোর? কলেজে কতদিন পড়িয়েছি কেতাবি ভাষাতত্ত্ব। ফনোলজি, মরফোলজি, সেমান্টিকস্। সুসান ল্যাংগারের বই। আর আজ?
আমার আপন খবর আপনার হয় না।
কিংবা
হাতের কাছে হয় না খবর
ঘুরে বেড়াও দিল্লি লাহোর।
তবে কি এই অবস্থাকেই বলা যাবে আপন ঘরে পরের আমি? আমার বাঙালি শরীরে হরেক দেশের কেতাব পড়া একটা অন্য মানুষ পুষছি নাকি?
আমার বিপন্নতা বুঝে ইমানালী বললেন, ‘শব্দের রাস্তা খুলে যাবে। নাও লিখে নাও—হা মানে আদম বনিয়াদ, হে মানে আল্লা, হু মানে নবী। কিছু বুঝলে?
:না।
: মানে বুঝলেই তা হলে সব নয়। চা-পাতা আছে, চিনি আছে, দুধ আছে। কিন্তু তিনটে মেশালে তবে চা তৈরি হবে। কিন্তু ঠাণ্ডা জলে হবে না। গরম জল চাই। তেমনই ফকিরি বুঝতে গেলে দেহ চাই আগে। তৈরি দেহ, পক্ক দেহ।।
: কেমন করে দেহ তৈরি হবে?
: জল কীসে গরম হল? আগুনে তো? তোমার দেহ তৈরি হবে গুরুর উপদেশের আগুনে। মুর্শেদ ধরো। পণ্ডিত সেজে ভ্যানতারা কোরো না। এটা কী, ওটা কী। ছাড়ো সব বুজরুকি।
সত্যি বলতে কী সেই থেকে ফকিরদের এড়িয়ে চলতাম। একে ইসলামি শাস্ত্র ভাল পড়া নেই, আরবি-পারসি শব্দও ভাল জানি না, তায় আবার শব্দের ভেতরের ধন্দ। আরও গোলমাল আছে। মারফতি ফকিররা শরিয়ত-বিরোধী। কলমা, রোজা, হজ, জাকাত, নামাজ সবই তারা অগ্রাহ্য করে। আত্মমৌন। আচরণবাদী। বস্তুবাদী শুধু নয়, লালন নিজেকে তো ‘বস্তু ভিখারি’ বলেছেন। এই বস্তুবাদের অতিকৃতি থেকে বাউলরা অনুমানমার্গ ত্যাগ করে। কল্পনার কোনও ভিত্তিই স্বীকার করে না। কথাটা ‘সখের বাউল’ নামে প্রসিদ্ধ কাঙাল হরিনাথ এইভাবে বলেছিলেন যে,
যদি কল্পনা ক’রে অরূপীর সে রূপ দেখা যেত
তবে সাধন ভজন ছেড়ে লোকে
কল্পনা করিত।
কত জল্পনা করিত ॥
এই বস্তুবিশ্বাস থেকে তারা দেহবাদী। পূর্বজন্ম ও পুনর্জন্ম দয়েই অবিশ্বাসী। তারা মানে পঞ্চভূত থেকে দেহের পুষ্টি। জীবনাবসানের পর পঞ্চভূত মিশে যায় আবার পঞ্চভূতে। যুক্তির শস্ত্র তুলে লালন প্রশ্ন করেন:
মলে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে কেন বলে।
মলে হয় ঈশ্বরপ্রাপ্ত
সাধু অসাধু সমস্ত
