লোকটা ফুঁসে বলল, ‘তুমিও তো কর নি।’
আমি বললাম, ‘আমি ও সব মানি না। বিশ্বাস করি না।’
: আমি বিশ্বাস করতাম। আর করি না। তাই আজকের মতো গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছি। আজকে সবাই গঙ্গায় ছ্যান করবে। শুধু আমি করব না। আমি এই গঙ্গাকে সইতে পারি না।
: কেন?
লোকটা সেই অপরূপ ভোরে পুণ্যতোয়া গঙ্গার একটা দিকে আঙুল দেখিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে বলল, ‘ওইখানে আমার জমি আর বসত ছিল। রাক্ষুসী সব গিলেছে।’ আমি মানুষটার হাত চেপে ধরি। পৃথক আর এক স্পষ্ট জগতের নয়, এ মানুষটা আমার। একেবারে আমার মনের মানুষ। একেই তো এতদিন ধরে খুঁজছি আমি। শেষ পর্যন্ত আজ তাকে পেয়েছি। ধরেছি দুই হাতের উষ্ণতায়। মনে হল বারুণীর ভোরে পেলাম, আমার একান্ত অর্জন, গভীর নির্জন পথে।
১.৪ আপন ঘরে পরের আমি
সব জিনিসের মতো লোকসংস্কৃতি চর্চাতেও ভেজাল থাকে। হয়তো দেখা গেল ফিটফাট অধ্যাপক বা সপ্রতিভ সাংবাদিক গ্রামের মেলায় হঠাৎ হাজির। অজ পাড়াগাঁ-র কোনও গ্রাম্য দেবতার পার্বণী বা দিবসী অনুষ্ঠান হচ্ছে। কস্মিনকালেও কেউ এ সব উৎসবে যেত না। গত কয়েক দশক কেন যেন এ সব দিকে সংস্কৃতিসেবীদের একাংশ ঝুঁকে পড়েছে। একজন কেটো সংস্কৃতিবিদ্ একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘মশায়, এখন দু’বিষয়ে খুব ক্রেজ, ফোক আর ফরেন। যে কোনও ফরেন জিনিসে দেখবেন লোকের খুব আস্থা। তেমনই ফোক এলিমেন্ট থাকলেই তার আদর। বাঁকুড়ার ঘোড়া, পুরুলিয়ার ছৌ-মুখোশ, মধুবনী এপ্লিক, বীরভূমের বাউলগান, সাঁওতালি নাচ সব গর গর করে চলেছে।’
কিন্তু এইসব ফোক এলিমেন্টেও যে কত ভেজাল থাকে তা জানতাম না তেমন। বহু বছর ধরে বহুরকম বাউল-ফকির-সহুজে বোষ্টম ঘেঁটে এখন বুঝেছি ওই সব লোকজনের মধ্যে দু-নম্বরি চিজ বহুৎ আছে। হয়তো নিতান্তই গেঁজেল কিংবা কাম-পাগল, ম-কারান্তবাদী বা স্রেফ পারভার্ট অনেকে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করলেই শিবনেত্র হয়ে বলে, ‘ও সব নিগুঢ় ব্যাপার কি সহজ?’ কতকগুলো বস্তাপচা কথাও আছে। যেমন— দমের কাজ, পঞ্চভূত, ইড়াপিঙ্গলা সুষুম্না, ত্রিবেণী, পিড়েয় বসে পেঁড়োর খবর, গুপ্তচন্দ্রপুর, মুর্শিদাবাদ, গুপ্তিপাড়া, ছটা ছুঁচো, বাহান্ন বাজার তিপান্ন গলি। এ সব কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। মুশকিল যে, এই ধরনের ক্লিশে বাউল-ফকিরদের লাইনে এত আছে যে একআধটা ঝকঝকে শব্দ বা বাক্যবন্ধও অনেক সময় ঘুলিয়ে যায়; হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের এক অনামা মাজারে বাউলের গানে শুনেছিলাম: ‘আপন ঘরে পরের আমি’। শুনে একেবারে সারা গায়ে ঝিলিক খেলে গেল। সব শিল্পে, বলতে গেলে, এই ঝিলিকই আমরা খুঁজি। পাই অবশ্য ক্কচিৎ।
আরেক রকমের অভিজ্ঞতাও হয়। প্রথম শুনে যে সব সরল লোকগান মনে হয় কী আর এমন, হয়তো দশ-পনেরো এমনকী বিশ বছর পরে সে গানের অন্তঃপুর সহসা খুলে যায়। যেন বইয়ের পাতায় শুকিয়ে-যাওয়া চাঁপাফুল। গন্ধ নেই বর্ণ নেই তবু যেন মন-কেমনিয়া। আসলে রূপকথার গুপ্তধনের দরজা খুলতে গেলে যেমন বলতে হয় সাংকেতিক মন্ত্র তেমনই বেশ কিছু বাউল বা ফকিরি গানের মর্ম লুকিয়ে থাকে আশ্চর্য সব গূঢ় শব্দে। সেই শব্দ ভেদ করতে দশ-বিশ বছর লাগাও বিচিত্র নয়। এই ফকিরদের জগতে ‘পীর-মুরিদ’ বলে একটা সম্পর্ক চলিত আছে। অর্থাৎ কিনা গুরু আর চ্যালা। এই নিয়ে মারফতি ফকিরদের সঙ্গে মোল্লাদের লড়াই চলছে বহুদিন। কট্টর মোল্লারা বলেন আল্লাকে পেতে গেলে সরাসরি পেতে হবে। ওসব গুরু মুর্শেদ হল হিন্দুয়ানির প্রভাব। মারফতিরাও কোরান খুলে দেখিয়ে দেন যে এক জায়গায় মুর্শেদ গ্রহণের ইঙ্গিত রয়েছে তাতে। আমার অতশত বাহাসে যাবার দরকার কী? তবে আমি এইটা সার বুঝেছি যে ফকিরি গান আর বাউল গানের অনেক অংশ, বহু শব্দ আমি বুঝতে পারতাম না যদি না কোনও কোনও ফকির তাত্ত্বিক আমাকে বোঝাতেন।
যেমন ধরা যাক ইমানালী। মানুষটা প্রথম দিনই আমায় হকচকিয়ে দেন এই বলে যে, ‘বাবা, নামের কোনও শক্তি নেই যদি না তার ভেতরের বস্তু আর সেই বস্তুর স্বরূপ তুমি জেনেছ। শব্দ কী? শব্দ তো একটা ভাব। সেই ভাবের আড়ালে আছে বস্তু। বস্তুকে জানো, তা হলেই শব্দের খোসা খুলে শাঁস বেরিয়ে যাবে।’
: যেমন?
: যেমন একটা কাগজে লেখো ‘আগুন’| কাগজ কি পুড়বে? পুড়বে না, কারণ আগুন শব্দে তো দাহ্যগুণ নেই। তেমনই নাম জপ করলে নামীকে পাবে কি? পাবে না। তার বস্তুত্ব বুঝতে হবে। কোথায় তিনি, কেমন তিনি, আমি কোথায়, তাঁর আর আমার সম্পর্ক কী? সেইজন্যেই আমরা ফকিররা সব জিনিস কানে শুনে, হৃদয় দিয়ে বুঝে, তার পর চোখে দেখে, তবে মানি।
এর পর ইমানালী বলেছিলেন আরেক চমকদার বাক্য। বলেছিলেন, ‘তুমি বাবা যেমন গানের পেছনে ছুটছ এখন, এরপর সেই গানের ভাবের নিরাকরণ করতে চাইবে তো? আমি বলি কি জানো, তুমি আগে শব্দের পেছনে ছোট। তারপরে গান খোঁজো। শব্দ হল মাছের টোপ, মাছ হল গান। শব্দেরও আগে কিন্তু আছে নিঃশব্দ। তুমি লালনের সেই গানটা শুনেছ? তাতে বলছে,
যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে
আমি এক অতলান্ত চেতনার স্রোতে একেবারে ডুবে যাই। থই পাওয়াতো দূরের কথা, ঘাই মারবার ক্ষমতা থাকে না। ইমানালী শাহজির দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছি দেখে তিনি বলেন, ‘কী গো, আমাকে এমন করে নেহার করছ কেন?’
