কৃষ্ণভক্তি কখনই না হয় তাহার ॥
আমি বললাম, ‘এ কথা বলছেন কেন? এখন এইখানে এই রাতে?’
চোখ বন্ধ করে গগন বললেন, ‘আমি এখন অনেকগুলো কথা বলে যাব। বাধা দেবেন না। আমাকে বলতে দিন। আমি বলতে চাই।’
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে আমি চুপ করে বসলাম।
গঘন বলে চলেন অনর্গল: জীবনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হল জ্ঞান আর কর্ম। এখানে জ্ঞান বলতে বোঝায় জন্ম মৃত্যু সম্পর্কে জ্ঞান। সেই জ্ঞান থেকে আসে মৃত্যুভয়। যে-জ্ঞান মৃত্যুভয় আনে তাতে কাজ কী? তাতে সাধনায় বিঘ্ন আনে। জ্ঞানের খারাপ দিকটা এবারে বুঝলে?
আমি বলি: কথাটা নতুন। অন্তত আমাদের পক্ষে। আমরা জ্ঞান বলতে বুঝি শাস্ত্রজ্ঞান। শাস্ত্র মন্ত্র পুঁথি আর উপদেশ থেকে জ্ঞানের জন্ম। তারপর আসে বস্তুজ্ঞান আর ব্রহ্মজ্ঞান। ব্রহ্মজ্ঞানের কাছে আর সব জ্ঞান তুচ্ছ।
: তুমি কাঁচকলা বুঝেছ। ওসব বৈদিকের ধোঁয়া। আসল জ্ঞান আপ্তজ্ঞান। সেই জ্ঞান থাকলে অন্যসব জ্ঞান মেকি হয়ে যায়। আপ্ত না জেনে কি ব্ৰহ্মকে জানা যায়? এই গানটা শুনেছ?
যারো তারো মুখে শুনি বলে ‘আমি’ ‘আমি’
আমি না পাইনু আমায় খুঁজে দেখলাম আমি।
এই নিজে জানা, নিজেকে নিজের মধ্যে খুঁজে পাওয়া একেই বলে আপ্তজ্ঞান। বুঝেছ? তা হলে একটু আগে যে বললাম জীবনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ জ্ঞান আর কর্ম তার মানে কী দাঁড়াল। এখানে বুঝতে হবে কর্মের দ্বারা জ্ঞানের মিথ্যা ত্যাগ করে আপ্তজ্ঞান পেতে হবে। তা হলে জন্ম মৃত্যুর ভয় কেটে যাবে।
আমি ভাবলাম গগনের ধারণা ভারী অন্য রকমের। দেখা যাক তার মতে কর্মের সংজ্ঞা কোন রকম?
গগন উচ্চারণ করেন:
এক বেদগুহ্য কথা কহিবার নয়
বেদ ধর্ম কর্মভোগ জানিও নিশ্চয়।
এই কথাটা এবারে বোঝ বৈদিক ধর্ম আমাদের কর্মভোগ করায় শুধু। আমাদের মুক্ত সুস্থ থাকতে দেয় না। জ্ঞান থেকে আসে জন্ম মৃত্যুর ভয়। সেই ভয় থেকে বাঁচতে পুনর্জন্ম এড়াতে আমরা কর্ম করি, মন্ত্র পড়ি, পুতুল পূজা করি, হোম যজ্ঞ করি। সব বৃথা কর্ম। উদ্দেশ্য নিয়ে কর্ম করা পাপ। কর্ম হল মুক্ত। তাকে স্বার্থে জড়াতে নেই। তোমরা কেবলই কর্মকে জড়িয়ে ফেল।
আমি বললাম, ‘কথাটা খুব নতুন। কিন্তু কেন আমরা এমন করি? তার থেকে বাঁচার পথ কী?’
‘এই, এতক্ষণে তোমাকে পথে এনেছি’ গগন বলেন, ‘তোমরা এমন কেন করো জানো? তার কারণ তোমরা পিতা-মাতাকে গুরুজ্ঞান করো। বাপ মা কখনও গুরু হতে পারে? তারা তো মায়াবদ্ধ, অষ্টপাশে বাঁধা। কামসর্বস্ব। তারা কী করে গুরু হবে?’
কামসর্বস্ব শব্দটি যেন বজ্যের মতো কানকে ধাঁধিয়ে দেয় আমার। এই মধ্যরাতের নির্জন নদীতীরে আর ভগ্নপ্রায় মল্লিক-বাড়ির সামনে বসে কেবলই মনে হতে লাগল হয়তো আমার চেতনাও ভেঙে পড়বে এবার। আমার নির্জিত সত্তাকে আরেকটু কোণঠাসা করতেই বুঝি গগন বৈরাগ্য বলে ওঠে, ‘পিতা-মাতা কী করে আমাদের? শোনো তবে—
কামে মাতি উভয়েতে শৃঙ্গার করিল।
সৃষ্টিকালে ভালোমন্দ নাহি বিচারিল ॥
ক্ষণিকের তৃপ্তি হেতু হয়ে মাতোয়ারা।
মারিল আমারে আর নিজে মরে তারা ॥
‘চুপ করুন, চুপ করুন আপনি’ আমি অসহায়ভাবে ককিয়ে উঠলাম, ‘এ সব কোথা থেকে কী সব বলে যাচ্ছেন।’
‘চুপ করব না। তোমরা ব্রাহ্মণরা আমাদের বহুদিন টুঁটি টিপে রেখেছ। আর নয়’ বৈরাগ্যের মুখে প্রতিহিংসা ঝলসে ওঠে, ‘তোমাদের তো খুব শাস্ত্রে বিশ্বাস। শাস্ত্র কি শুধু তোমরা লিখতে পার? আমরা পারি না? এ শাস্ত্র আমরা লিখেছি। সহজিয়া পুঁথি। চুপ করে শোনো—
ক্ষণিকের তৃপ্তি হেতু হয়ে মাতোয়ারা।
মারিল আমারে আর নিজে মরে তারা ॥
মধ্যে পড়ি আমি যবে ভাসিয়া বেড়াই।
উদ্ধার করিতে মোরে আর কেহ নাই॥
কিছুকাল কষ্টভোগ করি গর্ভমাঝে
আইলাম অবনীতে দোঁহার গরজে॥
আমি দুহাতে কান ঢাকি। প্রতিবাদে মাথা ঝাঁকাই। গগন জোর করে দু হাত সরিয়ে দেয় আমার কান থেকে। বাতাস কাঁপিয়ে বলে:
আমার আসার গরজ কিছু নাহি ছিল।
দুজনার ইচ্ছায় আমায় আসিতে হইল॥
অসম্ভব এই শাস্ত্র। অসহ্য একে মেনে নেওয়া। আমি মুহুর্তে উঠে পড়ি। ছুটে পালাব? অন্ধকারে সব দিক তো চিনি না। উঁচু-নিচু হয়ে আছে ভগ্ন প্রাসাদের এলোমেলো শান-বাঁধানো চত্বর। তবু জোরে খুব জোরে পা চালাই। গগন বৈরাগ্য তার খোলা চুলে উদ্ভ্রান্ত হাওয়ায় ওড়া দাড়ি নিয়ে উন্মাদ কাপালিকের মতো ছুটে আসে দ্রুততর। কিন্তু পারে না। উত্তেজিত স্থলিত তার পা গর্তে পড়ে। সে সটান মাটিতে পড়ে উপুড় হয়ে। আর উঠতে পারে না। আমি তাকে পরিহার করে পালাই, মানুষ যেমন দুঃস্বপ্নকে পরিহার করে। একেবারে একদমে অনেকটা গিয়ে বসে পড়ি নদীর ঘাটে।
আস্তে আস্তে রাত কেটে আসছিল। প্রথমে জাগল পাখি, তারপরে মানুষ। দলে দলে মানুষজন ছায়ার মতো এগিয়ে আসছে আবছা অন্ধকার ভেদ করে। আজ বারুণী স্নানলগ্ন। ব্রহ্ম মুহুর্ত সবচেয়ে প্রশস্ত সময় সে কর্মের। আমার মনে হল স্পষ্ট পৃথক আর এক জগতের এই অধিবাসীদের সংসর্গ ছেড়ে আমাকে এখনই পৌছতে হবে স্বাভাবিক মানবসমাজে। যে-সমাজ জন্ম মৃত্যুকে মেনে নেয়। মেনে নেয় দেহের বাসনা। পিতা-মাতার পবিত্র মিলনে যেখানে কামনা করে সন্তানকে আহ্বান করা হয়। প্রতিদিন যেখানে জীবনের প্রমত্ত ছন্দে জীবন জায়মান।
না, এখানে আর নয়। আজ সবচেয়ে আগে একা আমি অগ্রদ্বীপ ত্যাগ করব। খুব দ্রুত খেয়া পার হয়ে ওপারে পৌঁছাই। অর্ধস্ফুট ভোর। যাত্রী পারাপারের বিরাম নেই। তবে সবাই এখন এ পারের টানে বারুণীর স্নানে। নৌকো থেকে আমি তাই একা ওপারে নামি। নির্জন বালিয়াড়ির পথ বহড়া গ্রাম পর্যন্ত চলে গেছে। আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে কখন আলো ফোটে। চোখে পড়ে শস্যকীর্ণ মাঠ, সূর্যসনাথ আকাশ। হঠাৎ খেয়াল হল অনেকটা আগে আগে আরেকটা মানুষ যাচ্ছে না? হ্যাঁ, যাচ্ছে আর নদীর দিকে চেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছে বার বার। তার দাঁড়িয়ে পড়ার টানে আমি পৌঁছে যাই তার কাছে। নিতান্ত সাধারণ একজন রুখোসুকো গ্রাম্য মানুষ। বললাম, বারুণীর স্নান করলেন না?’
