গগন বৈরাগ্যের কঠোর কঠিন মুখখানি পাথরের মতো স্থির। তার সাঁড়াশির মতো দুটো হাত আমার হাতকে যেন চিরবন্ধনে বেঁধে রাখবে, এত তার জোর। আমি ছটফট করে উঠে বললাম, ‘ আমাকে ছেড়ে দিন। আমি কিছুই জানতে চাই না। আমি সাধন-ভজন করি না। ক্রিয়াকরণ জানি না। বিশ্বাস করি না এ পথে।’
গগনের রক্তচক্ষু আমার দু চোখে নিবদ্ধ। আমার কাঁধে ঘন ঘন ঝাঁকুনি দিয়ে তার ব্যাকুল কণ্ঠের আর্তি ঝরে পড়ল সেই নিঃসীম অন্ধকারে, ‘তবু শুনতে হবে। জানতেই হবে। আমি এতদিন ধরে সাধনা করে যা জেনেছি তা কি কাউকেই বলতে পাব না আমি?’ হঠাৎ দারুণ কান্নায় ভেঙে পড়ে অমন শক্ত মানুষটা আমার বুকে মুখ লুকিয়ে বলল, আমি আজ পর্যন্ত একটা মানুষ পাইনি। সব মুর্খ। সব বাহ্য। তাদের মন-রাখা কথা বলে বলে আমি আর পারি না। আমার কথা তুমি শুনবে না?’
রাজি হলাম। তবে কথা হল আমার যেখানে ডেরা সেখান থেকে জিনিসপত্র নিয়ে আসব এখন গিয়ে। খাওয়া-দাওয়ার পর অনেক রাতে নিভৃতে কথা হবে। মনে হল আশ্বাস পেয়ে মানুষটা বাঁচলেন যেন। কী আশ্চর্য অভিজ্ঞতা! সন্তপ্ত একজন মানুষ যেন সান্ত্বনা পেল অনেকটা। আমার কেবলই মনে হতে লাগল রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকের সেই উক্তি:
জান কি একেলা কারে
বলে?
জানি। যবে বসে আছি ভরা মনে—
দিতে চাই, নিতে কেহ নাই!
আমি জানতাম না যে, কোনও জিনিস নিঃশেষে জানার পর তা মনের মধ্যে পুঞ্জিত করে রাখার যন্ত্রণা এত মর্মান্তিক। আমি স্পষ্ট বুঝলাম লালন, পাঞ্জু শা, দুদ্দু শাহ, হাউড়ে গোঁসাই, লালশশী, কুবির গোঁসাই কেন এত অন্তহীনভাবে গান লিখে গেছেন। তাঁদের জানার যন্ত্রণা এভাবেই ব্যক্ত করে গেছেন তাঁরা। লোকধর্মে কি তাই গানের এত বিপুলতা? বুঝলাম গগন বৈরাগ্যের যন্ত্রণা কোনখানে। সে তো গান লিখতে জানে না। তার চারপাশে মূর্খ আর মুমুক্ষু কতকগুলো মানুষ সব সময়ে শরণ চায়। তাদের দিতে হয় বাহ্য করণ, লৌকিক আচার। মাসির মতো ভজনবিহীন নির্বোধ ভক্তরা গগন বৈরাগ্যকে আঁকড়ে ধরে আছে প্রাপ্তির আশায়। এ কি বৈদিক ধর্ম যে শাস্ত্র আর আচারে সব শান্তি আসবে? এ যে পদে পদে জীবন-সংসক্তির ধর্ম। মল মূত্র রজ বীর্য কিছুই যাদের ত্যাজ্য নয় তাদের বাইরের থেকে বোঝা কি খুব সহজ? এদের নিঃসঙ্গতা তাই নানা ধরনের। একে তো প্রচলিত ধর্মের পথ ছেড়ে নির্জন নিঃসঙ্গ পথে সাধনা। তারপরে সমাজ বিচ্ছিন্ন ঘৃণিত হয়ে থাকা। তারও পরে সব কিছু জানার পর, উপলব্ধির কথাগুলো কাউকে বলতে না-পারার গভীর নিঃসঙ্গ সন্তাপ। গগন বৈরাগ্য তো লিখতে পারেন না। লালন খুব ভাল লিখতে পারতেন তবু তাঁকে বলতে হয়েছিল: ‘কারে বলব আমার মনের বেদনা/এমন ব্যথায় ব্যথিত মেলে না।’ কুবির বলেছিলেন; ‘দুঃখের দুখী পেলাম কই/দুটো মনের কথা কই?’ কীসের এই নিগূঢ় ব্যথা?
এই ব্যথাই সাধকের ব্যথা। মধ্যযুগের ভারতের সন্ত সাধকেরা কিংবা রূমীর মতো সুফি সাধক এ সব ব্যথা থেকে সত্যকে পেয়েছিলেন। ‘যাঁকে জানার পর আর কিছু জানা বাকি থাকে না’ এমন উক্তির পাশে খুঁজে পাই এমনতর উলটো উক্তিও যে ‘তাঁকে জানলে তবে সব জানার শুরু।’ ‘তিনি তাঁকে জানার পথ রুদ্ধ করে রেখেছেন’ এই সদুক্তির পাশে জ্বলজ্বল করছে এই বাণী যে ‘তাঁকে জানার পথ জীবনের সব দিকে ছড়ানো।’ কোনটা সত্য এর মধ্যে? অথবা হয়তো এর সব কটা কথাই সত্য, সাধনার এক এক স্তরে।
আমি বেশ বুঝতে পারি মানুষের ফুঁপি ফুরোয় না। আমি মানুষের সেই অনন্ত ফুঁপি ধরে ধরে কেবলই ঘুরি। স্বজনে নির্জনে। নইলে এই পাঁচশো বছরের উৎসবসেবিত অগ্রদ্বীপে আমার কী এমন কাজ? আর পাঁচজন ভক্তিমান যাত্রীর মতো মন্দিরে গিয়ে গোপীনাথের দর্শনের পাট চুকিয়ে একটা বৎসরান্তিক প্রণাম নিবেদন করলেই তো চুকে যেত। ঘোষ-ঠাকুরের কিংবদন্তিতে গভীর আস্থা রেখে গোপীনাথের পাথুরে মূর্তি দেখে আমিও তো বিশ্বাস করতে পারতাম যে শ্রাদ্ধের পিণ্ডদানের সময় গোপীনাথ কাঁদেন। তার বদলে গোপীনাথ আমাকে দেখান মানুষের কান্না-হাসি। রমজান মোজাম্মেলের নর্তনানন্দের পাশে এজমালি ফকিরের জড়বৃদ্ধি স্তব্ধতা নিঃসাড়ে এসে দাঁড়ায়। অবিরল তর্কমুখর রামদাসের পাশে গভীর সন্তপ্ত মুখখানি ভেসে ওঠে নির্জন গগন বৈরাগ্যের।
এইসব ভাবনার ফাঁকে যন্ত্রের মতো কখন আসা যাওয়া খাওয়া সব সাঙ্গ হয়ে গেল। মধ্যরাতে জ্বলজ্বল করছে দ্বাদশীর চাঁদ। অসংখ্য যাত্রী চারি দিকে শুয়ে নিদ্রায় অসাড়। অন্ন-মচ্ছবে পরিতৃপ্ত ভক্তদের আমরা কেবলই পেরিয়ে যাচ্ছি। আমি আর গগন। একসময়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে আমরা মল্লিক-বাড়ির ভগ্নাংশের কাছে পৌঁছুই। সেখানে একটা উঁচু ভূমিখণ্ডে বসি। খানিকটা দূরে মানুষের গলার আওয়াজ শুনে চেয়ে দেখি অনতিম্লান চাঁদের আলোয় দুটো মানুষ মুখোমুখি বসে উত্তপ্ত আলোচনা করে যাচ্ছে। ‘ওরা কারা’ আমার এই প্রশ্ন মুখরতা পাবার আগেই গগন জানিয়ে দেন ওরা চিসতিয়া খানদানী। মধ্যরাতে ওরা ‘বাহাস’ বা তর্ক করে আল্লাহর স্বরূপ নিয়ে।
গগন বৈরাগ্য খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। হু হু করে গঙ্গার বাতাস ঝাপট মারছে মধ্য চৈত্রের রাত্রিকে। হঠাৎ গাঢ় মন্ত্রের মতো গগন বললেন,
শুভাশুভ কর্মে মতি সদা রহে যার।
