গুড়ের মতন যে দেখছি গুরুধন
ভিয়ান না করিলে গুড়ে সন্দেশ হয় না মন।
যেমন গুড় ভিয়ান করে
তেমনই গুরু সেবার তরে
ময়রা হয়ে থাকে পড়ে
সেই তো রসিকজন।
সেবায় রাজা ভিয়ানে খাজা
যে করে সেই মারে মজা
করতে নারলে থাকে প্রজা
বুন্ধুর মতন ॥
গান শেষ হলে দাদু গোঁসাই তাঁর শিষ্য গগনকে বললেন, ‘শ্রীগুরুতত্ত্ব পাঠ করো।’ গগন একটা পুঁথি, লাল খেরো বাঁধানো, বার করে পড়তে লাগলেন:
শ্রীহরি-বৈষ্ণবের অচিন্ত্যভেদাভেদ প্রকাশই শ্রীগুরুদেব। দাদু গোঁসাই ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘ওই জন্যেই বলা হয় গুরু-কৃষ্ণ-বৈষ্ণব তিনে এক, একে তিন। তারপর কী বলছে গগন? পড়ো তো?
গগন পড়লেন:
অভেদ-বিচারে তিনি উপাস্য, পরাকাষ্ঠা-‘সাক্ষাদ্ধরিত্বেন
সমস্ত শাস্ত্রৈরুক্ত।’
তথাপি শ্রীপ্রভু ভগবানের নিত্য প্রেষ্ট।
দাদু গোঁসাই বললেন, ‘তোমরা সাধারণ মানুষ। এত বড় শাস্ত্রের উক্তি তোমরা বুঝবে না তাই সরল করে বলি, শ্রীগুরু আশ্রয়জাতীয় তত্ত্ব আর শ্রীকৃষ্ণ বিষয়বস্তু। তাই শ্রীগুরুদেবের ভগবান হয়েও সেবক। তোমরা সেই সেবকের সেবক।’
এ যে রীতিমতো ইনটেলেকচুয়াল ব্যাপার-স্যাপার। আমি গুঁড়ি মেরে আসরের মধ্যে টুক করে সেঁধিয়ে যাই। সম্রম করে অনেকে আমাকে জায়গা করে দেন। বুঝতে পারি এখানে দাদু গোঁসাই একতরফা বক্তা। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেবে কে?পাল্লা দিলে এক গগন বৈরাগ্য দিতে পারে কিন্তু এত শিষ্য-সেবকের মধ্যে তিনি নিজের গুরুকে খণ্ডন করতে যাবেন কেন?
দাদু গোঁসাই এবারে বলেন, ‘গুরু কেমন জান। যেমন নৌকোর হাল। নৌকো পৌছবে ঘাটে অর্থাৎ ভগবানের কাছে। নিজে নিজে নৌকো যেতে পারে না। হাল চাই। হাল ঠিক থাকলে তবে নৌকো ঘাটে পৌছবে, নইলে ভেসে যাবে।’
গগন বৈরাগ্য একজন গ্রাহককে বললেন, ‘তোমাদের গানে কী বলছে গো? গুরু কেমন? গুরুকে বাদ দিয়ে কি সাধন হয়?’
গাহক মুখে মুখে খালি গলায় গায়:
যারা গুরুকে ভুলে
‘হরি হরি’ বোল বলে
তারা গাছের গোড়া কেটে
যেমন আগায় জল ঢালে ॥
‘বেশ বেশ’ উদ্দীপ্ত হয়ে দাদু গোঁসাই বলেন, ‘খুব হক কথা। আগে গুরু পরে হরি। আগে পথ তবে মন্দির। আগে সাধন পরে প্রাপ্তি।’ গগন বৈরাগ্য আবার বললেন গাহককে, আর কী বলছে গুরুতত্বে?’
গাহক গাইল:
গুরু রূপ ধরে সদয় হন তিনি
মন্ত্রদান করেন শিষ্যের শ্রবণে।
যদি গুরু চেনো মন
পাবে কৃষ্ণ দরশন
পরম সুখে রয়ে যাবে
বৈকুণ্ঠ ভবন।
হলে গুরুত্বে মনুষ্যবুদ্ধি
সাজা দেবে শমনে ॥
দাদু গোঁসাই বললেন, ‘এই শেষের কথাটা জরুরি। গুরুকে কখনও মানুষ ভাববে না। তিনি অনেক বড় অনেক উঁচু। তাই বলছে: গুরু ছেড়ে গোবিন্দ ভজে সে পাপীর জায়গা হয় নরকমাঝে। তোমরা শ্রীগুরুর নামে একবার হরি হরি বলো।’
সবাই হরিধ্বনি দিল। আসর ভাঙল। দাদু গোঁসাই গেলেন তাঁর নিজের আখড়ায়। আসর এখন ফাঁকা। বসে আছি আমি আর মাসি। অনেকটা চিন্তামগ্ন ভঙ্গিতে সামনে এসে বসলেন গগন বৈরাগ্য। পরিচয় হল পরস্পরের। মাসি যেন কৃতার্থ। গগন বললেন, ‘কেমন লাগল আমাদের সান্ধ্য গুরুবন্দনা? এর আগে গুরুবন্দনা শুনেছেন?’
বললাম, ‘ সত্যিই আগে শুনিনি। এমন গুরুবন্দনার আসর আগে তো কোনও আখড়ায় দেখিনি।’
: বোধ হয় মারফতি ফকির আর দীনদয়ালের ঘরে আপনার বেশি গতায়াত। আমাদের মত ও পথ কিছু ধরতে পারলেন?
: মত আর পথ জানতে গেলে দেখতে হয় করণ-কৌশল। আপনাদের করণ তো কিছু দেখিনি এখনও। আপনাদের কোন ঘর?
: আমাদের পাটুলি স্রোত।
: তার মানে সহজিয়া ধারা। কিন্তু আপনাদের গুরুবন্দনার আসর বড় কৃত্রিম বলে মনে হল। ওতে কি মন ভরে?
: ও তো বাহ্যের করণ। সাধারণ ভক্তদের জন্যে দায়সারা অনুষ্ঠান। এ থেকে মূল কথা কিছু ধরতে পারবেন না। আসল কথা আপনাকে পরে বলব। রাতে থাকবেন? বেশ। তখন খানিকটা বুঝিয়ে বলব। এখন শুনুন নিগূঢ় গানের এই কথা কটা:
ভয় করে না তাতে
যার আছে গুরু প্রতি নিষ্ঠারতি।
হেলায় পারে সাঁতার দিতে
রসিক সেকি পড়ে পাঁকে?
ডুবে সে রত্ন মিলায় সে বাঁকেতে ।।
মানে বুঝলেন?
মনে হল বুঝলাম না। তবে এ কথা স্পষ্ট হল যে গানের ধূপছায়ার আড়ালে আছে গাঢ় জীবনসত্যের আগুন। গুরুতত্ত্ব যত সহজ ভাবছিলাম তত হয়তো নয়। এখানে ‘ভয় করে না তাতে কথাটায় ‘তাতে’ মানে কী হতে পারে? ‘সাঁতার দেওয়া’ এই ইঙ্গিত কীসের? ‘বাক’ মানে কী বোঝাচ্ছে? ‘রত্ন’ কী? বুঝতে পারছি খুব সুনিশ্চিতভাবে তত্ত্বের গভীরে যাচ্ছি। যেন খুলে যাবে সেই স্পষ্ট কিন্তু পৃথক বিশ্বের চাবি এবারে। মনের মধ্যে জাগছে একটা নতুন ভাবনা।
এদিকে চার দিকে অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে। দ্বাদশীর চাঁদ হিসেবমতো আজ উঠবে আরও একটু রাতে। মাসি কোথায় চলে গেছে। গগন বৈরাগ্য হঠাৎ রহস্যজনকভাবে সামনে এসে আমার মাথাটা জোরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সব ভুলে যান। যা জেনেছেন সব ভুল। গুরু মানে নারী। সাধনসঙ্গিনী।’
তাঁর আচম্বিত ব্যবহারে চমকে গিয়েও আমি প্রতিবাদে মাথা নাড়ি ঘন ঘন। ‘তা কি হয়, আমরা জানি পতি পরম গুরু। সেকি তবে ভুল?’
: তবে সত্য কী?
:সত্য নারীদেহ। সেই সবচেয়ে বড় গুরু। তার কাছে ইঙ্গিত নিয়ে তার সাহায্যে তবে সাঁতার দিতে হবে। তার শরীরের বাঁকে মানে দশমীদ্বারে লুকিয়ে আছে মহারত্ন। আলগা স্রোতে ডুবে না গিয়ে ডুবতে হবে তলাতল অতল পাতালে। তবে মিলবে রত্নধন। সেই বাঁকে মাসে মাসে বন্যা আসে। তাকে বলে গভীর অন্ধকার অমাবস্যা। নারীর ঋতুকাল। সেই বাঁকা নদীর বন্যায় মহাযোগে ভেসে আসে মহামীন অধরমানুষ। তাকে ধরতে হবে। তার সঙ্গে মিলনে অটল হতে হবে। তাকেই বলে গুরুপ্রাপ্তি। আর ভুল হবে কোনওদিন?
