রমজান বললে, ‘তুই তো সব তাতে বিড়ির সালিশ করিস। বিড়ি কি তোর কব্বরেও যাবে নাকি?’
মোজাম্মেল বলে, ‘বাবু, একবার কী হয়েছিল জানেন? কব্বর বলতে মনে পড়ল। তখন আমার সবে নিকে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি গেচি। সম্পর্কে আমার এক দাদাশ্বশুরের এন্তেকাল হয়েছে। সবাই গেছি কব্বরস্থানে। হঠাৎ আমি বলে বসলাম, ‘লাসের সঙ্গে দু তাড়া বিড়ি দিয়ে দাও। মানুষটা খাবে কী?’ কী কাণ্ড। বলে ফেলেই কী লজ্জা। দিলাম ছুট।’
রমজান বলল, ‘বাবু, মোজাম্মেল যখন দুঃখ্যু পায় মনে, তখন কী বলে জানেন? বলে হে ধরণী দ্বিধা হও, দু তাড়া বিড়ি নিয়ে ঢুকে যাই। ব্যাটা মহা রসকে।’
আনন্দ করে রসিকতা করে রমজানরা কখন আমার মনের বাষ্প কাটিয়ে দিল কে জানে? খাওয়া-দাওয়ার শেষে মনটা বেশ হালকা বোধ হল। আমি তাঁবুর বাইরে রমজানদের খাওয়া দেখতে লাগলাম একটা ছালায় বসে। ‘কেমন খাচ্ছ?’ প্রশ্নের জবাবে ফড়িং বলল, ‘চালটা বড় চিকন। এ হল বাবুদের চাল, এ সব আমাদের মতো কাবুদের চলে না।’ রমজান বলল, ‘বাবু আমাদের মুসলমানি রান্না। ঝাল বেশি। কেমন খেলেন?’ বদন বললে, ‘হেঁদুরা খাবার কী বোঝে? তাই জিগাও। ওরা খায় শুক্তো ঝোল আর সেদ্ধ। থোড়, কচু আর ডুমুর। গোস ছাড়া খাওয়া হয়? মশল্লা ছাড়া রান্নার সুতার হয়?’ ফড়িং বলে ‘সেই হেঁদুর রান্না খাবার জ্বালায় তো মরিস। আমার মা ভাল কিছু রাঁধলেই, বুঝলেন বাবু, বলে ‘আহা থাক এট্টু, বদনা মাঠ থেকে এসে ফড়িঙের সঙ্গে দুটো খাবে। শালা নেমকরহারাম।’
দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেল। সুতোষ বাবুর বোধহয় একঘুম সারা। বাইরে এসে বললেন চরণ পালের আখড়ায় যেতে। সকলে মিলে গেলাম। সেখানে সব জাত সব বর্ণ বসে একসঙ্গে অন্নসেবা করবার জন্যে হাজির। ভাত ডাল তরকারি। দেখলাম, অন্তত কয়েক হাজার নরনারীর দাপাদাপি, চিৎকার আর তাদের পায়ে পায়ে ছেটানো ধুলো নিমেষে অন্ন-মচ্ছবকে ধূসর না করে রঙিন করে দিল। রবীন্দ্রনাথের গানে কতবার শুনেছি ‘পথের ধুলোয় রঙে রঙে আঁচল রঙিন’ করার কথা। এ যে সেই জিনিস একেবারে চাক্ষুষ দেখা! বিরাট বিরাট গর্তে ভর্তি-ভর্তি ভাত ব্যঞ্জন। সরায় করে সবাইকে দেওয়া হচ্ছে। হিন্দুও দিচ্ছে মুসলমানও দিচ্ছে। সেই পূত খাদ্য নিয়ে এবং খেয়ে রমজানও নাচে, ফড়িংও নাচে। খবরের কাগজে নিত্যই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খবর পড়ি, শহুরে হিন্দু-মুসলমানের বানিয়ে তোলা অসহিষ্ণুতা আর অভিমানের কথা শুনি। উর্দুস্থানের দাবি তোলে মূঢ়তার ভেদবুদ্ধি, ঝলকিয়ে ওঠে শিবসেনা ও হিন্দুত্ববাদীরা। কই, কোথাও কখনও তো দীনদয়ালের অন্ন-মচ্ছবের খবর পড়ি না?
তবে কি আমরাই, শিক্ষিতরাই স্পষ্ট পৃথক এক অহংকারের জগৎ বানালাম? তার দ্বিধা তার দ্বিচারিতা তার স্ববিরোধ শেষে কি আমাদেরই কুরে কুরে খাবে? এই সব ভাবছি আমার শীর্ণ অহমিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে এমন সময় একজন বয়স্কা বিধবা এসে আমার দুখানি হাত চেপে ধরে মিনতি মাখা কণ্ঠে বলল, ‘ও ছেলে, তুমি আমায় চেনা দাও। আমি যে অনেক সময় ধরে তোমার পানে তাকিয়ে আছি। ভাবছি, দেখি গোপাল আমায় চেনে কি না! তা চিনলে কই? শেষে আমি নিজেই ধরলাম তোমার হাত দুখানা। এবারে চিনবা তো?’
অসহায় চেয়ে থাকি। একদম চিনি না। কোথায় দেখেছি? কোন মেলায়? কোন বা আখড়ায়? কী বিপদ।
বুড়ি বললে, ‘লজ্জা পেয়োনা গোপাল। ভ্রম মানুষেরই হয়। অনেকদিন আগে, তা দশ বছর তো হবেই, তোমার সঙ্গে কথা হয়েছিল এই রগ্গদ্বীপ আসবার পথে ওই গঙ্গার চড়ায় হাঁটতে হাঁটতে, তোমার মনে পড়ে? এক সঙ্গে হাঁটছিলাম। সঙ্গে ছিল আমার সই। আহা গো, সে দেহ রেখেছে। বড় পুণ্যবতী। এবারে চিনেছ তো বাপ?
চিনেছি এবারে। বললাম, ‘হ্যাঁ মাসি এবারে চিনেছি। তোমার একটা কথা আমার মনে গেঁথে আছে আজও।’
: কী কথা গো ছেলে?
: বলেছিলে, ‘গুরুকে আমি তেমন আপন করে নিতে পারিনি এখনও। তিনিই আমারে আপন করে নিয়েছেন।
: বলেছিলাম বুঝি? আহা। সেই মুরুখ্যু মেয়েমানুষের কথা আজও মনে করে রেখেছ সোনা? এ কি মহতের কথা যে ধরে রাখবা? তা শোনো বাপ। সে কথাডা আজ আর সত্যি নয়। এখন গুরুকে আমি আপন করে নিতে পেরেছি। বাড়িঘর ছেড়ে আমি এখন গুরুর চরণ ধরে গুরুপাটেই আশ্রয় নিয়েছি। সেই আমার গুরু শ্রীমৎ গগন বৈরাগ্য বামুনডাঙার। তোমাকে এখনই যেতে হবে আমার গুরুর আখড়ায়। সেখানে আমার গোঁসাই আছেন। দাদু গোঁসাইও এয়েচেন। চলো চলো গোপাল।
দুটি হাত ধরে এমন মিনতিভরা টানাটানি, আমার অন্তরের মধ্যে উষ্ণতা টনটন করে ওঠে। ভাবি, কে এই অনাত্মীয়া ‘মুরুখ্য মেয়েমানুষ’ এমন ভালবাসার মাধুরীক্ষরণ ঘটিয়ে দেয় এমন করে? তবে কি অগ্রদ্বীপে সকলেই কিছু পায়? গোবিন্দ গোঁসাই পায় গুপিনাথকে, চরণ পাল পায় দীনদয়াল আর আমি পাই এই স্নেহরিত মানবিকতার তুলনাহীন অভিজ্ঞান? মনে হল নাসির হাত দুখানি অমন তপ্ততাতেই ধরে বলি ‘নিয়ে চলো সংসর্গে, সমন্বয়ে। আমার স্পষ্ট পৃথক শীর্ণ অনান্তরিক জগৎ থেকে ছিন্ন করে, বড় করে, সংলগ্ন করে দাও তোমাদের বিশ্বাসের বিশাল বিশ্বে।’ বলতে পারি না। কিন্তু আমার না-বলা কথার আভাটুকু কি ধরা পড়ে মাসির চোখে?
সমস্ত মানুষকে এড়িয়ে পেরিয়ে পশ্চিমদিকে একটা নাবাল জমিতে একটি টেরে গগন বৈরাগ্যের আখড়া পিটুলি গাছতলায়। সেখানে সন্ধে নামছে দারুণ রাজসিকতার গন্ধ মেখে। ধূপ আর নানা রকম গন্ধদ্রব্য মাতোয়ারা করে রেখেছে পরিবেশ। বসেছে গানের আসর সান্ধ্যাহ্নিক। একজন গাহক গাইছে আর শুনছে অন্তত দুশো ভক্ত মানুষ। প্রৌঢ় গগন বৈরাগ্য আর তাঁর বৃদ্ধ জটাজুটধারী গুরু পাশাপাশি বসে আছেন পদ্মাসন করে। নিমীলিত চোখ। মুখ প্রশান্ত। গাহক গাইছে গুরুতত্ত্ব:
