ভারী অদ্ভুত কথা যা তোক। তাই বিস্ময় মেনে জানতে চাই, ‘ব্যাপারটা তো ঠিক বুঝলাম না শকুন কেন তোমায় ঠোকরাবে?
: এডা আর বুঝলেন না? খুব সরল কথা। ধরেন। মরা গোরু হল শকুনের আহার। তো গো-বদ্যির চিকিচ্ছেয় যদি গোরু ভাল থাকে, ব্যাধি সেরে যায়, তবে শকুনের খাদ্যে টান পড়ে। সে তাই গো-বদ্যি দেখলেই ঠোক্কর দেয়। মাথার ওপরে বেলান্ত পাক মারে। এবারে বুঝলেন?
বুঝলাম, এরা নয়, হয়তো আমিই এক স্পষ্ট পৃথক জগতের অধিবাসী। সে কি আমার একার মুদ্রাদোষে? এমন কেন হয়। কেন কেবলই শুদ্ধ যুক্তি মানি? কেন সব তাতে আনন্দ খুঁজে পাই না? সেই জন্যে হয়তো লৌকিকের মধ্যে কখনও অলৌকিক পাব না আমি। এক দমবন্ধ করা অসহায়তা থেকে বাঁচতে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘সতীশ, ওই নছরত বিবির মাথা খারাপ হল কেন?’
: বাবু, সে খুব দুঃখের কথা। নছরত এক ফকিরকে ভালবাসত। সেই ফকির ছিল ভণ্ড। তার ছিল গুপ্ত রোগ। সেই রোগ থেকে নছরত পাগল হয়ে গেছে।
মনে পড়ল বাউল-ফকিরদের জীবনের এই দিকটা সম্পর্কে এলা ফকির আমাকে প্রথম অবহিত করেছিল বহুদিন আগে। তাদের মধ্যে সফলতা নাকি খুব কম। বেশির ভাগ বাউল ফকির ভ্রষ্ট কিংবা ভণ্ড। প্রকৃতিজনে একটু এদিক-ওদিক হলেই পতন। তাকেই বলে ‘দশমীদ্বারে কুলুপ।’ এলা ফকির বুন্ধু শা-র একটা মারফতি গানের দু লাইন শুনিয়েছিল:
কলেমার তালায় বন্ধ এ ঘর
খুলবে না চাবি বেগড়
খুলেছে যে বুদ্ধু দুয়ার
গুরুজির চাবিতে।
গানটা শুনিয়ে এলা বলেছিলেন, ‘কলেমা বা শরিয়তি মতে আবদ্ধ থাকলে তবু মুক্তি ঘটতে পারে গুরুকৃপায় মারফতি পথে। কিন্তু দশমীদ্বারে কুলুপ পড়লে সে আর খোলে না। এর বাইরে আর এক পতন দমের কাজে ভুল হলে।’
‘সেটা কেমন ভুল?’ আমি জানতে চেয়েছিলাম।
এলা বলেছিলেন, ‘কাদেরিয়া সুফিঘরের ফকির যারা তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের অনেক কাজ শিখতে হয়। তাকে বলে দমের কাজ। ঠিকমতো জান্নেওয়ালা মুর্শিদ না ধরে দমের কাজ করলে মাথা খারাপ হবেই। কেননা বায়ু ঠিক জায়গায় না গিয়ে মাথায় ভর করবে। বায়ুর দাপ খুব সাংঘাতিক জিনিস।’
এলা ফকিরের এই কথা মিলিয়ে দেখেছি পরে। একেবারে হাদিস বাক্যের মতো নির্ভুল। সেবার পলাশীপাড়ায় জীবন ফকিরের বাড়ি মচ্ছব হচ্ছিল পয়লা বৈশাখ। রাতে বসল মারফতি গানের আসর। কুলগাছি গ্রামের তরুণ গায়ক সুকুরুদ্দি আর মুর্শিদাবাদ জেলার একচেটিয়া গায়ক বিখ্যাত ইয়ুসুফের গানের পাল্লাপাল্লি। দারুণ ফকিরি তত্ত্ব। ইয়ুসুফ মধ্যরাতে গাইলে:
একে শুন্যি দিলে দশ হয়,
এ কথা তো মিথ্যা নয়।
দুয়ে আটে মিলন হলে
নোক্তা পরে দশ হয়।
সেই মোক্তা দশ ঠাঁই।
হয়ে আছে আটে তারাই
আট আর দশে আঠারো ভাই।
মোকাম করে খোদায়।
গান শেষ হলে সবাই চঞ্চল হয়ে উঠল। কেননা সুকুরুদ্দি পায়ে ঘুঙুর বাঁধেনি। অর্থাৎ সে আর আসরে উঠবে না। কেননা ইয়ুসুফের এ গানের কাটান সে দিতে অক্ষম। লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। মারফতি গায়কের কাছে এ হারের বেদনা বড় গভীর। তার সাধন পথের ভিত যে কাঁচা রয়ে গেছে আসরের সবাই তা জানল। তবে সুকুরুদ্দিনের একমাত্র সান্ত্বনা যে যোগ্যতমের কাছে হেরেছে। তবু তো হার?
‘আসরে কেউ আছ নাকিন যে এ গানের জবাব দেবে?’ একজন হাঁক পাড়ল।
আসরের মাঝখানে বসা বৃদ্ধ জীবন ফকির বলল, ‘এ দিগরে এমন গানের জবাব একমাত্র দিতে পারত এজমালি শা। তা ওই দ্যাখো তার দশা।’
ফকির আবু তাহের আমার পাশে বসেছিলেন। তিনি আঙুল দিয়ে দেখালেন ব্যথাতুর মুখে। দেখলাম আসরের ঠিক বাইরে, যেখানে হ্যাজাকের আলো ভালমতো যাচ্ছে না, সেই প্রায়ান্ধকারে খাড়া ছ’ ফুট এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। দাড়িগোঁফ। মাথায় টুপি। আর বুকে ঝোলানো অন্তত কুড়িখানা মেডেল। শুধু চোখ দুটি শূন্য। হাতে একখানা ভাঙা একতারা। মর্মন্তুদ দৃশ্য।
আবু তাহের বললেন, ‘এজমালি শা। এত বড় এলেমদার গাহক আমরা কেউ দেখিনি। ওদিকে মুর্শিদাবাদ-রাজশাহী, এদিকে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদ কাঁপিয়ে দিত গানে। কেউ পারত না গানের পাল্লাদারিতে। শুধু লালনের গান নয়, এজমালি জানত পাঞ্জু শা-র গান, হাউড়ের গান। জানেন তো সে সব গানের তত্ত্ব কত কঠিন?’
: কী করে মাথার গোলমাল হল?
: ছিল আমাদের মতো বুদ্ধ শা-র ঘরের মারফতি। যশোরে গিয়ে পড়ল এক কাদেরিয়া সুফির পাল্লায়। তাদের সব কঠিন কঠিন দমের কাজ। এখানে বসে নিশিরাতে একা একা সে সব দমের কাজ অব্যেস করত আর জিকির দিত। ব্যস, বায়ু সব মাথায় উঠে গেল। নিশ্চয়ই কায়দার ভুল ছিল কোথাও। তাল রাখতে পারল না। একেবারে বদ্ধ পাগল হয়ে গেল। আমাদেরই বয়সী। দোস্ত। এখন আর গান মনে করতে পারে না। কেবল ফকিরি গানের আসর বসলে বুকে ওই সব মেডেল ঝুলিয়ে গিয়ে হাজির হয়। আমরা সইতে পারি নে।
আমার মনটা ব্যথায় ভরে গিয়েছিল এ সব শুনে। ওই মেডেলগুলো সে রাতে কঠিন অভিশাপের মতো ঝকঝক করছিল। মনের মানুষ খোঁজার নিঃসঙ্গ পথটি অনেক সময় প্রতারণা করে তা হলে এমন ভাবেও?
খানিকটা বিষাদ নিয়েই যেন সুতোষ পালের তাঁবুতে ফিরলাম। নছরত বিবিকে চাক্ষুষ দেখে আর এজমালি শা-র কথা মনে পড়ায় হঠাৎ অগ্রদ্বীপের সমস্ত আয়োজন, উল্লাস, উদ্দীপনা খুব ম্লান হয়ে এল যেন। এমনই হয়। সফলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তে সবচেয়ে করুণ ঘটনাটি মনে পড়ে যায়। তবু কী আশ্চর্য, মনের ম্লানতা আসে মানুষের কথা ভেবে, অথচ সে স্নানতা কাটিয়ে দেয় অন্য এক মানুষ। যেমন ঘটাল মোজাম্মেল, রমজান, বদন আর ফড়িং। এরা কেউ এলেমদার নয়। লেখাপড়াই জানে না। ‘মুরুখ্যু চাষা’ নিজেরাই নিজেদের বলে। অথচ জীবনের কবোষ্ণ তাপে ঝকমক করছে। একটু আগে গয়না আর খুঁদকুঁড়োর গান কেমন নেচেকুঁদে গেয়েছিল আর এখন তিন পদ আহার্য বেঁধে ফেলেছে দিব্যি। আমি তাঁবুতে ঢুকতেই সব হইচই ফেলে দিল। খাওয়ার জন্য উপরোধ। পাটির ওপর কলার পাতা, মাটির গেলাসে জল। গরম ভাত, ডাল আর পটল দিয়ে চারাগাছের ঝোল। ধোঁয়া উঠছে। সুতোষবাবু খেতে শুরু করলেন। আমার তখনও গুমোট কাটেনি। দু দণ্ড বসে নিচ্ছি। মোজাম্মেল বলল, ‘বাবুর কি ভাব নেগেছে? লক্ষণে যেন তাই মনে নেয়? নেশা তো নেই। নইলে বলতাম একটা বিড়ি ধরাতে। এ সময় বিড়ি খেলে ঝিম কেটে যায়।’
