শ্রীরূপ রঘুনাথ কবিরাজ গোঁসাই
অটলবিহারী করোয়াধারী কইয়ে সাধু
মধুরস বাণী। দীনদয়ালের নামে একবার হরি হরি বলো।
সমস্বরে সবাই বলল: ‘হরিবোল’।
বাবা চরণ পালের নামে একবার।
হরি হরি বলো
সবাই সমস্বরে বলে উঠল, ‘হরিবোল’।
ব্যাস। অগ্নি সংযোগ হল চারটে জোলে। শুরু হল অন্ন-মচ্ছব। ‘যাতে কোনও বিঘ্ন না হয়। যাতে ঝড় জল না হয়ে সবাই অন্ন-মচ্ছব সেবা করে। যাতে পাক ঠিক হয়। এই-সব ভেবে এই অনুষ্ঠান। বুঝলেন তো?’ সুতোষ পাল বোঝালেন।
আমি বললাম, ‘এ সব রান্না শেষ হয়ে অন্ন-মচ্ছব হবে কখন?’
: বেলা গড়াবে। তার আগে আমার তাঁবুতে দুটো মাছ-ভাত খেয়ে নেবেন সকাল সকাল।
‘তার আগে আমি বরং একটু চারদিক ঘুরে আসি’, আমি বললাম, ‘চিঁড়ে মুড়কির স্ল্যাব একটু তাতে যদি কমে!’
ঘুরতে ঘুরতে দেখি এক এক গাছতলায় এক এক আখড়া। কোথাও গান হচ্ছে। কোথাও কুটনো কোটা আর রান্নার আয়োজন। কোথাও খাঁটি বৈষ্ণব মতে চার দিকে কাপড় ঘিরে মালসা ভোগ নিবেদন হচ্ছে, বাইরে চলছে কীর্তন। কোথাও মানুষজন অঘোরে ঘুমোচ্ছ। একটা আখড়ার বাইরে ছোট কাঠের উনুনে একজন মধ্যবয়সী বিধবা হাঁড়িতে কী রাঁধছে আর বাঁখারি দিয়ে নাড়ছে। আমি তাকে বললাম, ‘বাখারি কেন গো মাসি, হাতা নেই?’ স্নেহের তিরস্কার কণ্ঠে ঢেলে মাসি বললে, ‘ও ছেলে, তুমি রগ্গদ্বীপের নিয়ম জানো না বুঝি? এখানে হাতাখুন্তি চলে না। বাঁখারি নিয়ে নাড়াঘাঁটা আর মুচি কি ভাঁড় দিয়ে পাতে দেওয়া।’ হাঁড়িতে কী রান্না হচ্ছে বোঝা শক্ত। টগবগ করে ফুটছে। ফোটার চাপে হাঁড়ির মুখে উঠে আসছে চাল ডাল বেগুন কুমড়ো আলু মুলো পটল। আশ্চর্য ব্যাপার তো? ‘কী রান্না এটা?’ মাসিকে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না।
: ও ছেলে, তুমি তো শিক্ষিত মানুষ। দেখে বুঝলে না? একে বলে জগাখিচুড়ি।
এই নাকি জগাখিচুড়ি? কখনও চোখে দেখি নি, শুধু নাম শুনেছি। জগাখিচুড়ি তা হলে একটা ‘ব্যাপার’ নয় রীতিমতো একটা খাদ্য? মাসিকে বলি, ‘তোমাদের নিবাস কোথায়?’
: ভোলাডাঙা চেনো? সেখানে নেমে যেতে হয় নাংলা পোমে। সেখানে আমাদের গুরুপাট। গুরুর নাম রাখাল ফকির। ওই দ্যাখো বসে রয়েছেন।
ফকিরের কোঁকড়া চুল। চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। পরনে ধুতি আর টেরিকটনের শার্ট। মৌজ করে বসে সিগারেট খাচ্ছেন। আমাকে অপাঙ্গে দেখে নিয়ে আবার সিগারেট টানতে লাগলেন। আমি আখড়ার বাইরে যেখানে অন্য একদলের রান্না হচ্ছে এক বিরাট কড়ায়, সেখানে দাঁড়াই। কড়াতে করে খিচুড়ি পাক করছে যে বলিষ্ঠ মানুষ তার মাথায় বাবরি আর পরনে ঘন নীল ফতুয়া। সারা মুখ পান খেয়ে লাল। নাম জিজ্ঞেস করতে বলল, ‘সতীশ ভুগলে।’
: ভুগ্লে আবার কী পদবি?
: আজ্ঞে আমরা জাতে গোয়ালা। আমাদের অনেক খারাপ নামে ডাকে লোকে। কেউ বলে ভেমো গোয়ালা, কেউ বলে ভুগ্লে।
: কী করো? জাত ব্যবসা?
: আজ্ঞে না, আমি গো-বদ্যি।
: অগ্রদ্বীপে কি সব জাত, সব বৃত্তির লোকই আসে নাকি?
: আজ্ঞে। ছত্রিক জাত আর সব ব্যবসার মানুষ। ওই দেখুন ওই পাশের আখড়ার মনিষ্যিরা মাছ-মারা জেলে আর নিকিরি।
: জেলে আর নিকিরি আলাদা নাকি?
: আজ্ঞে হ্যাঁ। দুজনরাই মাছ ধরে। তবে জেলেরা হিন্দু আর নিকিরি মুসলমান।
ভাবলাম, শেখবার কি শেষ আছে? এ সব মেলায় কত কী দেখা কত কী জানা। সভ্যতার ঊষাযুগে মানুষ বোধহয় জোল কেটে রাঁধত, এমনই গর্ত কেটে তাতে খাদ্য রাখত। ষোড়শ শতকে লেখা মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে কালকেতু-ফুল্লরার যে অন্ত্যজ জীবনের খবর আছে তাতে পড়েছি-‘আমানি খাবার গর্ত দ্যাখো বিদ্যমান। গরিব মানুষ বাড়ির দাওয়ায় গর্ত খুঁড়ে তাতে ভাত আমানি খেত। তারই একটা ধারা হয়তো অগ্রদ্বীপের মেলায় ভিন্ন রূপে রয়ে গেছে। এ মেলার বয়স তো কিংবদন্তি অনুসারে পাঁচশো বছর। খুব কঠোরভাবে ইতিহাস মানলেও তিনশো বছরের কম নয়।
চিন্তায় বাধা পড়ল, কেননা মাথায় পাতার মুকুট গলায় ফুলের মালা পরা এক মহিলা আচম্বিতে আমার সামনে এসে গালে মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘ওরে আমার সোনামানিক, ওরে আমার আসমানের তারা। তারপরেই রীতিমতো সুরেলা গলার গান:
বাহারে খবর আসে তারে তারে তারেতে
এ তার নহে সে তার ভাই যে তার মিশে তারেতে।
পুবে মুগুর মারলে তারে পশ্চিমে এসে উত্তর করে
সে কি তারের তার তারে কহ শুধায় তারেতে।
এমন আকস্মিকতায় খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। মহিলা যেমন হঠাৎ এসেছিলেন তেমনই চলে গেলেন। তবে যাবার সময় পাছা দোলালেন এতটাই অভব্য রকমের যে বোঝা গেল তার মাথার গণ্ডগোল আছে। সেটা জানতেই অস্বস্তি কেটে গেল। গো-বদ্যি সতীশ বললে, ‘উনি হলেন নছরত বিবি। ফাজিলনগরে ওনার সাকিন। মাথার ব্যামো।’
: তুমি চিনলে কী করে?
: আমি গো-বদ্যি, মানুষ চিনব না?
কথার বৈপরীত্যে হাসি এসে গেল আমার। গো-বদ্যির কাজ কি মানুষ চেনা না গোরু চেনা? আমার হাসিতে কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে সতীশ বলল, আপনি হাসছেন কিন্তু কথাটা সইত্যি। গো-বদ্যিকে কাঁহা কাঁহা যেতে হয় আপনা ভাবতে পারেন? যেখানে গো-মাতার ব্যাধি সেখানেই ডাক পড়ে। মানুষজন ওই জইন্যে আমার অত চেনা। আসল বিত্তান্ত হল, গো-বদ্যি চেনে মানুষ আর শকুন চেনে গো-বদ্যিকে। একা পেলেই ঠোকল মারে। গো-বদ্যির সঙ্গে শকুনের চের জীবনের আড়াআড়ি।’
