: গরম তাত ছ্যাঁকা লাগে না?
: আশ্চর্যি। একটুও গরম লাগে না। অথচ দেখবেন আমরা যখন এখানে রাঁধব, মেটে হাঁড়ি তেতে একসা হয়ে যাবে।
অবাক লাগে শুনে। এর আগে অগ্রদ্বীপ এসেছি অথচ এ সব শুনিনি। শুনিনি, কেননা তখন ছিলাম শরৎ ফকিরের অভিজাত সঙ্গসুখে। একেবারে মাটির মানুষের সঙ্গে না মিশলে তো মাটির খবর মেলে না। এই যে চারটে অর্জ্ঞমূর্খ কৃষিজীবী আমার সামনে কথা বলে যাচ্ছে আবার হাতের নিপুণতায় কেটে যাচ্ছে জোল, আরও নানা গর্ত, সানুপুঙ্খ নানা নেপথ্য বিধান নীরবে ঘটাচ্ছে এই সব দীনদয়ালের দীনাতিদীন সেবকদের অংশগ্রহণেই আসল মেলা জমে ওঠে। দেখছি তিনটে গর্ত কেটে তারা নিকিয়ে নেয় সুন্দরভাবে। আমি কৌতূহলী হয়ে জানতে চাই, তিনটে গর্ত কী হবে?
: আজ্ঞে, একটায় ভাত, একটায় তরকারি।
সে কী? গর্তে রাখবে? কাদা লেগে যাবে না?
: কিচ্ছু হবে না। এ তো রাঢ়ের মাটি। একেবারে পাথর। তার ওপর দীনদয়ালের মাহিত্ম্য। খাওয়ার সময় ধরতেই পারবেন না।
বদন গর্ত তিনটে নিকোয়। ফড়িং তাতে হলুদ গুঁড়ো ছিটোয়। হলুদ গুঁড়ো কেন? বদন বলে, মাটির দোষ কেটে যাবে।
শ্রমক্লান্ত মানুষগুলি এবার একটু বসে। তাদের গা দিয়ে কুল কুল করে ঘাম ছোটে। গামছা দিয়ে মোছে আবার গামছা ঘুরিয়ে বাতাস খায়।
গঙ্গার দিকে মুখ করে দুজনে বসি এক অতি প্রাচীন বটগাছ তলায়। এদিকটায় মেলায় যাত্রী বেশ কম। একটু ফাকা ফাকা। আমি সুতোষ পালকে বললাম, ‘আপনি তো উচ্চশিক্ষিত মানুষ। এখানে বছর বছর আসেন কীসের টানে?’
: বলতে পারেন এটা আমাদের পারিবারিক দায়িত্ব। আমরা সরাসরি চরণ পালের বংশ। এখানকার অন্ন-মচ্ছবে থাকাটা আমাদের কর্তব্য। যাতে সুষ্ঠুভাবে ভোগরাগ হয়, সবাই সেবা পায়, এ সব তো দেখতে হবে? তা ছাড়া আমার বাবার আদেশ। বাবা তো আসতেন! তাঁর অবর্তমানে আমিই আসি। মনে খুব শান্তি পাই। আবার মোজাম্মেল রমজানরাও খানিকটা তাড়িয়ে আনে। ওরা চোতমাস পড়লেই ভ্যানর ভ্যানর করতে থাকে। বাবু, যাবেন তো রগ্গদ্বীপ?
: আচ্ছা, ওদের এত কেন উৎসাহ বলুন তো? ওরা তো আপনাদের মতো দীনদয়ালের সাধক নয়, শিষ্যও নয়।
: এ রহস্য বোঝা শক্ত। এখানে কী একটা আছে। একটা টান। ধর্ম টর্মের ব্যাপার খুব গৌণ। ওরা দারুণ কষ্ট করে আসে। ভূত-খাটুনি খাটে। জোল কেটে রান্না করে। আবার সব গুছিয়ে-গাছিয়ে নিয়ে ফেরে। তবু আসে। বলে, ‘বাবু দীনদয়ালের অন্ন-মচ্ছব না সেবা করলে মনটা কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে।’ এ সব কি যুক্তি দিয়ে বোঝা যাবে?
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আপনাদের বাড়িতে তো দীনদয়ালের আসন আছে। তার পুজো কে করে?’
: সাধারণত দাদা করেন। ছুটিছাটায় স্কুল বন্ধ থাকলে আমিও করি। তবে বেস্পতিবারে আমাদের বিশেষ পুজো। আর দশুই চৈত্র আমাদের দীনদয়ালের বিশেষ প্রসাদ ভোগ। সেদিন তাকে পাঁচ সিকের মিষ্টি নিবেদন করি। সেটাই নিয়ম। পাঁচ সিকে, তার বেশিও নয় কম নয়।
: আচ্ছা কোনও শিষ্য যদি কোনওদিন কিছু নিবেদন করে?
: হ্যাঁ, তার মান্সার জিনিস আমরা নিবেদন করে দিই।
: সাধারণত কী তারা দেয়?
: জল মিষ্টি কি পায়েস। কি সাধারণ চিঁড়ে দই সন্দেশ। হ্যাঁ, ভাল কথা মনে পড়েছে। কেউ কেউ মাংস পরোটাও দেয়।
: ‘মাংস পরোটা’? আমার অভিজ্ঞতাও এবারে টাল খায়। কোনও লৌকিক দেবতাকে মাংস পরোটা উৎসর্গ করার কথা কখনও শুনিনি। তবে কি এর পিছনে কোনও ইসলামি বিশ্বাস কাজ করে? সাহেবধনীর ‘সাহেব’ তো স্পষ্টই ইসলামি অনুষঙ্গ আনে। সন্দেহটা সুতোষবাবুকে জিজ্ঞেস করতেই বলেন, ‘মুসলমান ধর্মের ভালমতো প্রভাব আছে আমাদের ঘরে। মুসলমান শিষ্যও তো আমাদের ঘরে বহুজন। আসলে এ সব হিন্দু-মুসলমানে মিলে গড়েছিল মনে হয়।’
আমি জানতে চাই, ‘আচ্ছা, আপনাদের নিত্যপুজোয় এমনকী কিছু লক্ষ করেছেন যা মুসলমানদের ধর্মাচরণের সঙ্গে মেলে?’
: তা হলে শুনুন। আমাদের ঠাকুরঘরে দীনদয়ালের শয্যা আছে। তাতে মশারিও থাকে। দীনদয়ালের সব কিছু দক্ষিণমুখো আর আমরা তাঁর পুজো করি পশ্চিম দিকে মুখ করে। এ রীতি কি মুসলমানি নয়?
: হ্যাঁ। ঠিক তাই। আচ্ছা, আপনাদের রোজকার কৃত্য কী কী? ঠাকুরঘরে?
: প্রতিদিন দীনদয়ালের হুঁকো আর লাঠি তেল জল মাখিয়ে স্নান করাতে হয়। দীনদয়ালের নিত্যভোগ হল চাল মিষ্টি পান আর জল। তারপরে কলকেতে তামাক ধরিয়ে হুঁকোয় করে নিবেদন। ঠিক যেমন একজন মানুষকে দেওয়া হয় আর কী! তবে কলকের আগুন ধরাবার সময় ফুঁ দিতে মানা।
আলোচনার মাঝখানে বদন এসে বলল, ‘বাবু, আপনার ডাক পড়েছে। যান।’
: কীসের ডাক?
: চলুন। ওই দিকে ওই চরণ পালের আখড়ায় যে জোল কাটা হয়েছে তাতে আগুন জ্বালা হবে এবার। আমাদের গিয়ে দাঁড়াতে হয়। সেটাই রীতি।
সত্যি দেখবার মতো দৃশ্য। পর পর চারটে লম্বা জোল কাটা। তাতে চল্লিশটা হাঁড়ি বসানো। পাল বংশের নানা শরিকের যে কজন অগ্রদ্বীপে আছেন সবাই দাঁড়ালেন পর পর। কমলবাটির রাঁধুনিরা হাত জোড় করে দীনদয়ালের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে আশীর্বাদ চাইলেন। তাদের হাতে দেওয়া হল পান সিঁদুর তেল সন্দেশ। সেগুলো জোলের পাশে রেখে সবাই জোলকে গড় হয়ে প্রণাম জানাল। একজন চেঁচিয়ে উঠল:
প্রেম কহে রাধাকৃষ্ণ বলিয়ে।
প্রভু নিতাই চৈতন্য অদ্বৈত
