সুতোষবাবু বললেন, ‘কী ব্যাপার? হঠাৎ এত বছর পরে? নতুন কোনও গবেষণার সুত্র পেলেন বুঝি?’
আমি বলি, ‘লোকধর্মের গবেষণা তো অন্তহীন। এবারে এসেছি দেখতে অগ্রদ্বীপের মেলা দশ বছরে কতটা পালটালো। এখানে এসেই তো ব্যাপার দেখে হতভম্ব হয়ে গেছি। গঙ্গার ভাঙন এতটা?’
: ফরাক্কার জল ছাড়ার ফল। ওপারে আরও বেশি ভাঙন হয়েছে বলে শুনেছি। আসুন। আমার তাঁবুতে জিনিসপত্র রাখুন। এখানেই দুটো সেবা হোক। কী রাজি? বেশ বেশ।
অবশ্য তখনও তাঁবু তৈরি হয়নি। নিমেষে চারজন গ্রামীণ মানুষ চারটে বাঁশ পুঁতে তাতে পলিথিন শিট বেঁধে আচ্ছাদন করল। এবারে বসা দরকার। কিন্তু কীসে বসা হবে? সঙ্গে সঙ্গে বাবুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে একজন কিনে আনল একটা মাদুর। তাতে বসে আমার মনে হল অগ্রদ্বীপে বেশ একটা বাউণ্ডুলে বোহেমিয়ান ভাব আছে। অর্থনীতিতে যাকে বলে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ফেসিলিটি’ তা এখানে কিছু নেই। শুধু কিছু মাটির হাঁড়ি কলসি আর জ্বালানির ডালপালা ছাড়া আর কিছু মেলে না। সবই তাই বয়ে আনতে হয়। অবস্থাটা বেশ মজার। যেমন সুতোষ পালের তাঁবুতে মাদুর পেতে বসেই বললাম, ‘খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। একটু জল পাওয়া যাবে?’
সঙ্গে সঙ্গে একজন ছুটল টাকা নিয়ে। ফিরে এল একটা কলসি আর সরা কিনে। তাতে জল আনা হল গঙ্গা থেকে। জল খেয়ে প্রাণটা বাঁচল। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, হঠাৎ সামনের মানুষটি, যার নাম রমজান, এগিয়ে দিল একখানা সদ্য কেনা হাতপাখা। বলল, ‘এটা হুকুম হবার আগেই কিনে আনলাম। আপনি যা তোয়াজি মানুষ।’ লজ্জা পেলাম। সুতোষবাবু বললেন, “আজ অন্ন-মচ্ছব। তার এখন অনেক দেরি। কিছু খেতে হবে আপাতত, কী বলেন?’
কী আর বলি? মুখ ফুটে সে কথা কি জানান দেবার বয়স আছে আমার?
‘ওহে, মোজাম্মেল, কিছু আছে নাকি তোমার?’ সুতোষ পাল হাঁকলেন, ‘দাও দেখি কিছু খেতে।’
: আজ্ঞে, আছে বইকী। বাড়ি থেকে এনেছি টাটকা মুড়কি বানিয়ে আর চেঁকিতে কোটা চিঁড়ে। সেবা হোক বাবুদ্বয়।
আমি বললাম, ‘বাঃ, দীনদয়াল ভালই জোটালেন।’
শুকনো চিড়ে-মুড়কি খেয়ে তারপর একপেট গঙ্গাজল। আঃ, খুশির উদ্গার উঠল একটা। রমজান বলল, ‘বাবু যা খেলেন একেবারে সিমেন্টের ছল্যাব ঢালাই হয়ে গেল পেটের মধ্যে। বেলা দুটো পজ্জন্ত নিশ্চিন্তি।’
আমি হেসে তাদের কাজ দেখতে লাগলাম। চারজন মানুষ। রমজান, মোজাম্মেল, ফড়িং আর বদন। সুতোষ পালের নতুনগ্রামের ধান-পাটের জমি ভাগে চাষ করে। এখানে তাদের না-আসলেও চলে। তবু আসে কেন? আমাকে চুপিসারে বলে মোজাম্মেল, ‘বাবু কেনাকাটায় গেছেন, এই ফাঁকে বলি, আসি বাবুর টানে। না এলে উনি তো এখানে খেতে শুতে বসতে পাবেন না। তাই আসা। এ তো এক পুরুষের নয়। ওঁর বাবা তার বাবা সব আমলেই কেউ-না কেউ আসবেই। আমার বাবা চাচারাও আসত। সেটাই নিয়ম।
: উনি যেখানেই যান সেখানেই তোমরা সঙ্গে যাও নাকি?
জিভ কেটে ফড়িং বলে, ‘সব জায়গায় যাওয়া আর রগ্গদ্বীপ কি এক? এ হল সিদ্ধ জায়গা। এখানকার মহিমে মাহিত্ম্য আলাদা। সত্যি কথাটা তবে বলি বাবু। আমরা এই সুযোগে এসে দীনদয়ালের অন্ন-মচ্ছবও একটু ভোগ করে যাই। এখানে তো হিন্দু মুসলমানে কোনও তফাত নেই। রগ্গদ্বীপে সবাই সমান। তুমি সব আখড়া ঘুরে ঘুরে দ্যাখো। হিন্দু রাঁধছে বা মুসলমানে রাঁধছে আর সবাই গোল হয়ে বসে খাচ্ছে।’
: তোমাদের দুজনের নামে তো বোঝা যাচ্ছে মুসলমান। আর দুজন কি হিন্দু?
: আজ্ঞে ফড়িংটা হিদুঁ আর বদনটা মুসলমান। বদন বিশ্বেস। ভাল কথা হ্যাঁরে ফড়িং, তোর ভাল নামডা কী রে?
ফড়িং জাঁক করে বলে, ‘আমার নাম গোবিন্দচন্দ্র মণ্ডল।’
‘বাপরে, নামের দাপ আছে’ বদন বলে, ‘তোর ফড়িং নামটাই ভাল। যেমন ধারা চেহারা তেমন নাম।’
ফড়িং বলল, ‘ বদ্না, তোর বাপের নাম মদনা। তুই আমার মাঠে যাবার বদনা।’
‘এই এখানে অশৈল কথা রাখ,’ মোজাম্মেল বয়োজ্যেষ্ঠ, তাই শাসন করে, ‘কাজ কর। হাত চালা। তোদের কোনও কাঁক কাঁকর জ্ঞেয়ান নেই। রগ্গদ্বীপে এসেও মুখখিস্তি। মাটি কাট।’
বসে বসে দেখি, কোদাল দিয়ে প্রথমে লম্বা করে ড্রেনের মতো মাটি কাটা হল। তাতে পাশাপাশি তিনটে নতুন হাঁড়ি বসিয়ে দেখে নিল ঠিকমতো কাটা হয়েছে কি না। রমজান বলল, ‘বাবু, একে বলে জোল। ওপরে হাঁড়ি থাকবে, নীচ থেকে অড়র গাছের পালা দিয়ে জ্বাল হবে।’
আমি বললাম, ‘একটা জোল কত বড় হতে পারে? মানে সবচেয়ে বেশি কটা হাঁড়ি ধরে?’
: ধরুন দশটা। সারা দিনমান আছেন তো? একটু পরেই দেখতে পাবেন চরণ পালের আখড়ার জোল কাটা হবে। পর পর চারখানা পাশাপাশি। একেবারে চল্লিশখানা হাঁড়ি বসবে। দীনদয়ালের অন্ন-মচ্ছব। তার প্রসাদ এখানকার সব্বাই এটুখানি পাবে। সে পেসাদ রান্নার সাহিত্যও আলাদা। আমরা পারব না।
: কেন?
: শরীলে শক্তি চাই। মনে ভক্তি চাই। চাই দীনদয়ালের কৃপা।
: কারা রাঁধবে?
: সেই চরণ পালের আমল থেকে হয়ে আসছে একই ধারা। দেবগ্রামের কাছে একটা গেরাম আছে কমলবাটি। সেখানকার ভক্তরা দীনদয়ালের অন্ন-মচ্ছব পাক করে চিরকাল। ওদের ওপর দীনদয়াল গোপ্ত বাবাজির কৃপা আছে।
: কী রকম?
: বাবু, বললে বিশ্বাস করবেন না। এই সব পাঁচ সের চালের বড় বড় গরম ফুটন্ত হাঁড়ি ওরা কোনও ন্যাকড়া ন্যাতা না নিয়ে শুধু হাতে নামিয়ে ফেলে।
