তিলক মালা কৌপীন আঁটার দল
জানে শুধু মালসা ভোগের ছল
দিন রাত কিছু না বুঝে মালা জপে যায় ॥
রামদাসের সঙ্গে আবার হাড়িরাম-বৈষ্ণব বিরোধের কথা তুললাম রাতের খাওয়া দাওয়ার অনেক পরে। তখন সমস্ত মেলাটা ঝিমিয়ে পড়েছে। রাত এগারোটা হবে। অত্যুৎসাহী কয়েকটা আখড়ায় শুধু গান হচ্ছে। ও সব বেশির ভাগ গেঁজেলদের আসর। তাদের গানে মাথামুণ্ডু থাকে না—অভিজ্ঞতায় দেখেছি। আসলে নিশি পোহালেই সব আখড়ায় অন্ন-মচ্ছব হবে। তার ব্যবস্থা করা কি চাট্টিখানি কথা? তাই সবাই যথাসম্ভব বিশ্রাম আর ঘুম সেরে নিচ্ছে। আমার ঘুম নেই। মেলায় আমি ঘুমোতে পারি না। অগত্যা রামদাসকে ভর করি। সে বসে বসে হাড়িরামের নাম জপ করছে। সরাসরি বলি ‘তোমার পেট থেকে কথা বার করবার জন্যে নয়, আমি কিন্তু সত্যি সত্যি জানতে চাই বৈষ্ণবদের সঙ্গে তোমাদের এত বিরোধ কেন? বোধহয় হিংসে, নয়? ওরা যে সংখ্যায় বেশি। তোমরা আর কজন?’
রামদাস খুব বেদনাহত মুখে বলল, ‘বাবু, আপনি জ্ঞানী মানুষ। সংখ্যা দিয়ে কি সত্য-মিথ্যার বিচার হয় কোনওদিন? হয়তো মূলে কর্তা হাড়িরাম চন্দ্রের সঙ্গে সেকেলের বোষ্টমদের বেধেছিল। কোনও বিরোধ কি বাধতে পারে না?’
‘হ্যাঁ, তা হতে পারে’ আমি ভেবে বলি, ‘প্রথমত বৈষ্ণবেরা দ্বৈতবাদী, তারা শ্রীকৃষ্ণকে সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ বলে মানে, নিজেরা থাকে ভক্ত হয়ে। আর তোমাদের ধর্ম অনেকটাই অদ্বৈতবাদী। হাড়িরাম তো নিজেকেই স্রষ্টা বলেছেন। এটা বৈষ্ণবেরা মানবে কেন? তারা তো মানুষ ভজে না। তারা অবতারতত্বে বিশ্বাসী। তারা কিছুতেই হাড়িরামকে অবতার বলে মানবে না?’
‘তবে আমরাও তাদের মানব কেন?’ রামদাস যেন বিদ্রোহীর মতো ফুঁসে ওঠে। ‘ওসব তিলকমালা রসকলি চন্দনের ছাপ আর ডোর কৌপীনে কী ভগবান থাকে? ওদের কাণ্ড তো জানি। মুখে বলে সব জাতি এক এদিকে বামনাই কি কিছু কম? ওদের সব ভাগ আছে তা জানেন? ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব, চামার বৈষ্ণব, নেমো বৈষ্ণব, টহলিয়া নানান ভাগ। তবে গৌরাঙ্গের মূল কথাটার মানে দাঁড়াল কী? আচণ্ডাল কি ওদের এক? তা হলে সহুজে বোষ্টমদের ওরা মানে না কেন? আসল ব্যাপারটা কী জানেন, সব বিটলে বামুনদের কারসাজি।
রামদাস গায়:
মানুষ মানুষ সবাই বলে
ও ভাই কে করে তার অন্বেষণ?
পঞ্চম স্বরে মনের সুখে ডাকেন তারে ত্রিলোচন।
বাধা দিয়ে আমি বলি, ‘এ গান আমি বিপ্রদাসের গলায় শুনেছি। এতে আর গোলমাল। কোথায়? এর তত্ত্ব খুব সোজা।’
অভিমানভরে রামদাস বলে, ‘তবে ওই গানের এ জায়গাটা শুনুন:
রাসলীলা হয় বৃন্দাবনে
জানে কোন ভাগ্যবানে
রাধাকৃষ্ণ নাহি জানে
নাহি জানে গোপীগণ ॥
কিছু বুঝলেন?’
: আলাদা করে কিছু বোঝবার আছে নাকি এখানে?
আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে রামদাস বলে, ‘এইখানটায় আসল তত্ত্ব। বৈষ্ণব কীর্তন করে বৃন্দাবনলীলা। তাতে কৃষ্ণ রাধা গোপীগণ থাকে। কিন্তু কৃষ্ণ মূলে যে বৃন্দাবনলীলা করেনই নি।
: সে কী?
: হ্যাঁ। ভেবে দেখুন, ব্রহ্মা সৃজনকর্তা। তাঁর স্থান আমাদের মস্তকে। বিষ্ণু হলেন পালনকর্তা। তাঁর স্থান বক্ষে। শিব হলেন সংহারকর্তা। তাঁর স্থান লিঙ্গে। বৃন্দাবনলীলা কী বলুন তো বাবু?
: সে কি যোনি-লিঙ্গে সঙ্গম?
: বিলক্ষণ। তা হলে বক্ষস্থলে থেকে কৃষ্ণ কী করে বৃন্দাবনলীলা করেন? করেন না। বৃন্দাবনলীলার আস্বাদ বা রূপ তবু কিঞ্চিৎ জানেন মহেশ্বর। কিন্তু কৃষ্ণ রাধা গোপীগণ বৃন্দাবনলীলার কী জানেন? এইখানে বোষ্টমদের মস্ত বড় ভুল। সে ভুল ধরিয়ে দেন আমাদের হাড়িরামচন্দ্র। কে বুঝিবে হাড়িরাম এ ভুবনে তব মহিমে?
মাঝরাতের ভাঙা চাঁদ যেমন অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে অগ্রদ্বীপের এই মেলার মাঠের দিকে, আমি তেমনই অবাক হয়ে রামদাসের দিকে চেয়ে রইলাম। এতগুলো নির্বাচন, সবুজ বিপ্লব, পঞ্চায়েত, পারমাণবিক সন্ত্রাস, বৈদ্যুতিন কৃৎকৌশল, জন্মনিয়ন্ত্রণ, বিশ্বায়ন, দূরদর্শনের সাম্রাজ্যবাদ এদের বিশ্বাসকে এতটুকুও টলাতে পারেনি? মেলার এতগুলো মানুষের গাঢ় ঘুমন্ত শরীরে এমন গভীরভাবে মনও রয়েছে ঘুমিয়ে? আমার তুলনায় এরা এতটাই স্পষ্ট আর পৃথক আরেক জগতের অধিবাসী? সকাল হলেই এই বিপুল সংখ্যাধিক্য মানুষের জেগে ওঠার পর তাদের স্থির বিশ্বাসের অভিঘাতে আমি কতটা বিধ্বস্ত হয়ে যাব সেই আশঙ্কিত ভাবনায় মেলা ছেড়ে পালাই। কেবলই পালাই।
*
সেই পালানো আর এবারের এই গত চৈত্রে অগ্রদ্বীপ যাওয়া, মাঝখানে দশ বছর কখন খেয়ে গেছে। অবশ্য মাঝখানে একবার এসে দু রাত্তির কাটিয়ে গেছি শরৎ ফকিরের সঙ্গে এই মাঠেই। কিন্তু এবার এসে কী দেখলাম? চরণ পালের ঘরসমেত সেই বিরাট কদমগাছ আর তার চারপাশের অন্তত চল্লিশ বর্গগজ এলাকা একেবারে গঙ্গাগর্ভে।
হঠাৎ দেখলে একটু ধন্দ লাগে। ঠিক যে চত্বরে আগে এসে বসেছিলাম, যেখানটায় রামদাস বুঝিয়েছিল বৃন্দাবনলীলার রহস্য, সেখানটা জলের তলায়? সাহেবধনী মত বা বলা হাড়ির ঘরও এই রকম করে সমাজের অতল তলে সুনিশ্চিতভাবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বোধ হয়। তার মানে ক্রমশ মানুষ থেকে মানুষের ফুঁপি বার করা কঠিন হয়ে যাবে। ভাঙা মন জোড়া লাগিয়ে তবু আবার খুঁজি মানুষেরই সূত্র। প্রথমে এসে দাঁড়াই চরণ পালের আস্তানায়। ঘরটা তো নেই। করোগেটের টিন আর পলিথিনের ত্রিপল টাঙিয়ে টেম্পোরারি আস্তানা গেড়েছেন এবারকার সাহেবধনী ফকির। শরৎ ফকির দেহ রাখায় ইনিই এখন নতুন ফকির। বসেছেন ফকিরি দণ্ড বুকে নিয়ে সাদা চাদরের ঘোমটা টেনে, যা নিয়ম। বসেছেন নতুন কেনা পাটিতে। তাতে জমছে ভক্তদের ছুড়ে দেওয়া টাকা আধুলি সিকি দশ পয়সা আর নোটের রাশি। সম্বৎসরের রোজগার। হঠাৎ সেই করোগেটের টিনের পেছন থেকে বেরিয়ে আসেন সুতোষ পাল। পুরনো আলাপী। ইনি চরণ পালেরই বংশ। তবে ফকিরি পথে নামেননি। সাহেবধনীদের মূল আসন বৃত্তিহুদাতেও থাকেন না। থাকেন নতুনগ্রামে। সেখানে দীনদয়ালের পূজা হয় বংশানুক্রমিক।
