: হ্যাঁ, দেখেছি বইকী। অবশ্য তখনই তার অনেক বয়েস।
: তিনি দেহ রেখেছেন। তো সেই পূর্ণ হালদারের সঙ্গে আমি অনেক ঘুরেছি সেই কোথায় কোথায়। ধাপাড়া, ধোপট, পলশুণ্ডো, কোমথানা, হাঁসপুকুর, বান্নে, ফুলকলমী। সব ঘুরে ঘুরে কত তক্ক-বিতক্ক শুনেছি বোষ্টমদের সঙ্গে বাউলদের সঙ্গে। তার থেকেই আপ্তজ্ঞান হয়েছে। এখন আমিই বেশ তক্ক করতে পারি। একটা ঘটনা শুনবেন?
: বলো।
: সাহেবনগরের ফণী দরবেশের নাম শুনেছেন তো? তার ঘটনা। সেই সাহেবনগরের কাছেভিতে এক বোষ্টমদের আখড়া আছে। সেখানে একদিন তারক ব্রহ্ম নাম হচ্ছে। আমি তখন ফণী জ্যাঠার বাড়ি কদিন রয়েছি। তো জ্যাঠা বললে, ‘চল নাম শুনে আসি। নামেই তো মুক্তি।’ গেলাম দুজনে। নাম শুনলাম। তারপর বোষ্টমরা সব নিতে বসল সার বেঁধে, মালসাভোগ। আমরা তো বোষ্টমদের মালসাভোগ নেব না।
‘কেন?’ আমার খটকা লাগল ‘প্রসাদে আপত্তি কী?’
‘ও, আপনি বুঝি নিষেধবাক্য জানেন না?’ রামদাস খুব আত্মপ্রসাদ নিয়ে বলল, ‘তবে খেয়াল রেখে শুনুন:
না করিব অন্যদেবের নিন্দন বন্দন।
না করিব অন্যদেবের প্রসাদ ভক্ষণ ॥
বাস। সাফ কথা।
: তখন কী হল?
: যতই ওরা মালসাভোগের সেবা নিতে বলে ততই ফণী জ্যাঠা না না করে। আসল কথাটা, মানে হাড়িরামের নিষেধের কথা তো বলতে পারে না। পাছে ওরা আঘাত পায়। কিছুতেই শেষপর্যন্ত পার পাই না আমরা। একজন বোষ্টম হুল ফুটিয়ে বললে, ‘সেবা ধর্মে আপত্তি কীসের? আমাদের ঘেন্না কর?’ জ্যাঠা আর সামলাতে না পেরে বললে, ‘কথাটা কি তুমি না বলিয়ে ছাড়বে না বাবাজি? তবে শোনো। প্রশ্ন হল, সে তো নেব কিন্তু দেব কাকে?’ শুনে তো বাবাজি থ। বলে, “বাপরে, তোমার কথার তো খুব ভাঁজ আছে? চলো তোমাকে মোহান্তের কাছে নিয়ে যাই।’ নিয়ে গেল আমাদের দুজনকে মোহান্তের কাছে। বাবু, মোহান্ত বোঝেন তো?
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। তা বুঝি। মানে ওই আখড়ার যিনি প্রধান বৈষ্ণবগুরু।’ রামদাস বললে, তাঁর কিন্তু খুব মান্যতা! তেমনই চেহারা। একেবারে যাকে বলে কি না ঘৃতপক্ক। সংসারের আঁচ তার গায়ে লাগেনি। তাঁকে বাবাজি সব সাতকাহন করে তো বলল। তিনি সব শুনে হাসলেন, তারপর চাঁদির চশমা পরে খানিকক্ষণ জ্যাঠাকে নিরীক্ষণ করে পরিহাস করে বললেন, ‘সাধনার পথে তুমি খানিক কাঁচা রয়েছ দেখছি। তা এই যে আমরা দুজন বসে আছি, আমাদের তফাত কোথায়? দুজনেই তো মানুষ, ভক্ত, সেবক। তা হলে?’
: তখন ফণী দরবেশ কী জবাব দিলে?
: ও, সে মোক্ষম জবাব। বললে, ‘আপনাতে আমাতে বসে আছি বটে, তবে অনেকটাই তফাত। কেমন তফাত শুনবেন? আপনি বসে আছেন যে পাটিতে, তার ওপর রয়েছে ধোকরা, তার ওপরে কাঁথা, তার ওপরে চাদর। এত সব কিছুর ওপরে আপনি। আর আমি মাটিতে জন্মে এই মাটিতেই তো বসে আছি। আপনাতে আমাতে তফাত নেই?’
: তারপর কী হল?
: মোহান্ত চুপ মেরে বসে রইলেন খানিক। তারপরে একটু পরে বললেন, ‘যাই হোক, সেবা নেবে না কেন? সেবা দেবার লোক পাচ্ছ না? কেন? পরমাত্মাকে সেবা দাও। কী? জবাব নেই যে? হেরে গেলে তো এবার?’ জ্যাঠা আমাকে টোকা মেরে বললে, ‘কী রামদাস? এ কথার কী জবাব হবে বলো দেখি?’ আমি হাড়িরামকে স্মরণ করে বললাম, ‘মোহান্তজি, এই মালসাভোগ তো আপনার পরমাত্মাকে উৎসর্গ করেছেন, তো সেই এঁটো জিনিস কেন আমার পরমাত্মার সেবায় দেব বলুন?’ মোহান্ত চুপ। জ্যাঠা বললে, ‘সাবাস রামদাস। বলিহারি। তুই হাড়িরামের মুখ রেখেছিস।’
একাদশীর রাতে এমন একটা মোক্ষম তর্কসভার বিবরণ শুনে আমি তো রীতিমত শিহরিত। সত্যি কথা, কোন ফুঁপি থেকে কোন কথা যে এসে পড়ে। হাড়িরামের সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈষ্ণবদের যে এত আড়াআড়ি তা জানতাম না। ব্যাপারটা কৌতূহলজনক। আর একটু গভীরে যাবার জন্যে আমি রামদাসকে উস্কে দিয়ে বললাম, ‘তোমার জ্ঞানবুদ্ধি তো ফণী দরবেশের চেয়েও পাকা মনে হয়। বলো দেখি বৈষ্ণবদের সঙ্গে তোমাদের প্রধান তফাত কী?’
রামদাস বলে, ‘ওদের পঞ্চতত্ত্ব, জপতপ আর তুলসীমালা। আমাদের ও সব নেই। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আখড়াধারী বোষ্টমদের যা নিয়ে বাধে তা এই যে ওরা প্রকৃতির ছায়া মাড়ায় না আর আমরা গৃহী।’
আমি বললাম, ‘প্রকৃতি সাধনা না করলে ক্ষতি কী? নিষ্কাম ধর্ম নেই?’
: আজ্ঞে, প্রকৃতিকে কি এড়ানো যায়? নিষ্কাম বৈষ্ণবের কি স্বপ্নদোষ হয় না? সে স্বপ্নদোষ কি প্রকৃতি দেখে হয়, না পুরুষ দেখে? বাবু, আপনি কিন্তু আমাকে চটিয়ে পেটের কথা বার করছেন। আমি এবারে আপ্ত সাবধান হব কিন্তু।
আমি হেসে বললাম, ‘যাঃ। বুঝে ফেলেছ। তা হলে এখন আর কথা নয়। কথা হবে আবার রাতে। এখন একটা গান শোনাও। কিন্তু তোমাদের হাড়িরামের গান নয়। ও গানে বড় তত্ত্বের কচকচি। তুমি অন্য গান গাও।’
রামদাস বলল, ‘এমন একটা গান গাইছি যাতে আপনি বোষ্টমদের স্বরূপ বুঝে ফেলবেন খুব সহজে। শুনুন। এ গান আমাদের নয়, তবু আমরা গাই—
নদের গোরা চৈতন্য যারে কয়
সে শাক্ত ভারতীর কাছে শক্তি মন্ত্র লয়।
পরে গিয়ে রামানন্দের কাছে
বাউল ধর্মের নিশানা খোঁজে
তবে তো মানুষ ভজে পরমতত্ত্ব পায়।
বাউল এক চণ্ডীদাসে।
মানুষের কথা প্রকাশে
সেই তত্ত্ব অবশেষে বৈষ্ণবেরা নেয়।
মর্কট বৈরাগী যারা
এক অক্ষরও পায় না তারা
গীতা ভাগবত শাস্ত্র পড়া পণ্ডিত সবায়।
