জগৎপতি জগৎপিতা
হেউৎ মউতের কর্তা।
তুমি আমায় রক্ষা কর ॥
রামদাস এর পর আসরের সবাইকে উদ্দেশ করে বলে:
‘রসিক শ্রোতাগণ আর আমার মরমী পাল্লাদার গাহক বন্ধু, আমি এবারে যে গানের তত্ত্ব করব তা আমাদের হাড়িরামের নিগূঢ় তত্ত্ব। এ আসরে এতক্ষণ তত্ত্ব করা হল যে ব্ৰহ্মাই আসল। আর আমরা বলি,
আরে তা না না না না না না না না।
শুনি এক ব্রহ্মা দ্বিতীয় নাস্তি
সে কী কথার কথা হয়?
হাড়িরাম অন্য কথা কয়।
শুনি ব্রহ্মা হন সৃজনকর্তা
বিষ্ণু হন পালনকর্তা
আর শিব হন সংহারকর্তা
তবে এক ব্রহ্মা কীসে কয়?
গানটি আরও যুক্তির পথে এগিয়ে যখন শেষ হল তখন সবাই বললে, ‘বলিহারি। এ যে অকাট্য গান।’
রামদাস বললে, ‘গান অকাট্য নয়। এ গানেরও কাটান আছে। তবে সে গান গেয়ে আমি নিজের গানের কাটান তো দেব না। আমি শুধু বলি আমাদের হাড়িরামের তত্ত্ব অকাট্য। তাই বলেছে—
হাড়িরামের তত্ত্ব নিগূঢ় অর্থ
বেদবেদান্ত ছাড়া।
এ তত্ত্ব জেনে নিমাই সন্ন্যাসী
এ তত্ত্ব জেনে শিব শ্মশানবাসী।
শ্রোতাগণ, তোমরা হাড়িরামের নামে বলিহারি দাও।’
সবাই বললে, ‘বলিহারি বলিহারি বলিহারি।’
এ সব সুযোগ সাধারণত আমি ছাড়ি না। আসর থেকে রামদাস যেই বাইরে বেরিয়েছে ধূমপান করতে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় বসে পড়ি। ইতিমধ্যে আকাশে একাদশীর চাঁদ দেখা দিয়েছে। তার আলোয় রামদাস মানুষটার স্পষ্ট নিরিখ হয়। সরু খড়েগর মতো নাক, নির্মেদ চেহারা, মাঝখানে সিঁথিকাটা চুল, চোখ দুটি সুন্দর। এ-সব মানুষের শরীর সম্পর্কে দুর্বলতা থাকেই। কথাটা তাই সেদিক থেকেই তুললাম, ‘নাকটা তো তোমার বেশ লক্ষণযুক্ত। তোমার তো এত নীচে পড়ে থাকার কথা নয়।’
কথায় চিঁড়ে ভেজে। লাজুক হেসে রামদাস বলে, ‘বাবু তবে ধরেছেন ঠিক। সবাই বলে আমার মধ্যে সাধক লক্ষণ আছে। এই গরুড় নাসা ঐহিক মানুষের হয় না। আমাদের হাড়িরামের প্রধান শিষ্য তনু, তার এমন নাক ছিল। আপনি তনুর সম্পর্কে বাঁধা গান শুনেছেন?’
‘শুনিনি তো?’ আমি বললাম; ‘আমি মেহেরপুরে গেছি, নিশ্চিন্দপুরে গেছি। বিপ্রদাসের কাছে অনেক গান শুনেছি।
‘নিমেষে রামদাস গাইল;
ত্রেতাযুগে ছিল হনু
মেহেরাজে তার নাম তনু
পেয়ে পায়ের পদরেণু
চার যুগে সঙ্গে ফেরে।
হঠাৎ গান থামিয়ে রামদাস আকাশের দিকে চেয়ে প্রণাম সারল। তারপর বিড় বিড় করে বলতে লাগল—
হাড়িরাম হাড়িরাম
স্বয়ং রামচন্দ্র পূর্ণ ব্ৰহ্ম সনাতন।
সীতাপতি হনুমানকে যেমন করে
করিলেন উৎপত্তি—
তেমনই নিজগুণে কৃপাদানে
এ অধমের করো গতি।
তুমি আমার মাতাপিতা তুমি আমার পতি
শ্রীচরণে করি এই মিনতি।
জয় হাড়িরামের জয়। জয় হাড়িরামের জয়
জয় হাড়িরামের জয়।
আমি এত দিন এত লোকধর্ম সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশেছি কিন্তু কারুদেরই প্রায় পুরোপুরি বাংলা মন্ত্র নেই। সব হ্রীং ক্লিং শ্লিং বোঝাই মন্ত্র। কেবল এই হাড়িরামের মন্ত্র সব দিক থেকে ব্যতিক্রম। এরা চলতি বাংলা ভাষায় মন্ত্র বানিয়েছে। তার উচ্চারণে তাই বিশ্বাসের জোরটাও শোনবার মতো। আমি রামদাসকে এই কথা ভেবে বললাম, ‘তোমাদের মন্ত্রে সংস্কৃত নেই কেন?’
: এটা বুঝলেন না। সংস্কৃত তো বৈদিক ধর্মের ভাষা। আর হাড়িরামের তত্ত্ব বেদবেদান্ত ছাড়া। তার বাদে আরও যুক্তি আছে।
: কী রকম?
: আমরা তো অনুমানের সাধনা করি না। আমাদের সব বর্তমান। তো বাংলা ভাষা তো বর্তমান। এই তো আপনি-আমি তাইতেই কথা কইছি, নাকি বলেন? আর সংস্কৃতে কি কেউ কথা বলে? ওটা অনুমানের ভাষা।
চমৎকার অনুমান-বর্তমান তত্ত্বের একটা নতুন ভাষ্য পাওয়া গেল যা হোক। হাড়িরামের লোকেরা বেশ মেধাবী আর বিচারশীল দেখছি। তার একটা কারণ হল এ সম্প্রদায় বহু দিন ধরে বৈষ্ণব আর বাউলদের থেকে আলাদা পথে চলেছে। পদে পদে তাদের সঙ্গে তাত্ত্বিক লড়াই করে তবে হাড়িরাম তত্ত্বকে টেকাতে হয়েছে। এই যেমন আজকের শব্দগানের আসরে ‘এক ব্রহ্ম দ্বিতীয় নাস্তি’ তত্ত্বটা রামদাস তাদের গানে চমৎকার কাটান দিল। অবশ্য আমি রামদাসকে সত্যি কথাটা বললাম না যে, ব্ৰহ্ম আর ব্রহ্মা এক নয়। লৌকিক গাহকের অতখানি জ্ঞান থাকে না। তারা খানিকটা শব্দের ফেরে বা বাক্যের ধন্দেও পড়ে যায় কখনও কখনও। যাই হোক, আমার কাজ এখন রামদাসের পেট থেকে কথা বার করা। তাই প্রশ্ন তুললাম, ‘রামদাস, তোমাদের ধর্মে তো গুরু নেই।’
কথা শেষ হবার আগেই রামদাস বললে, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের গুরু নেই বাউল বোষ্টমদের মতো। আমাদের এক তত্ত্ব হাড়িরাম। সে আবার—
কোটি সমুদ্র গভীর অপার
যে জানে সে নিকট হয় তার
কলমেতে না পায় আকার
শুদ্ধ রাগেই করণ ॥
তো সেই হাড়িরামের তত্ত্ব রাগের পথে জানতে হয়। বুঝতে হয় তিনিও যা আমিও তা। তবে তফাত আছে। তিনি কিঞ্চিৎ ঘন/আমি কিঞ্চিৎ কণ।’
: তার মানে?
: তার মানে তিনি কিছুটা ঘন-গভীর আর আমি তার কণ মানে কণা। তবে তাই বলে নিতান্ত ফেলনা নই। হাড়িরামের মহিমা যে জেনেছে সে কি ফেলনা হতে পারে?
আমি বললাম, ‘তোমাকে যে কথাটা জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম তা এই যে, তোমার তো গুরু নেই তা হলে এত কথা শিখলে কোথায়?’
: আজ্ঞে হাড়িরামই বলাচ্ছেন। তাঁরই হেকমৎ। তবে হ্যাঁ, সঙ্গও করেছি বইকী। আপনি তো নিশ্চিনপুরে গেছেন, সেখানে পূর্ণদাস হালদারকে দেখেছেন?
