উত্তর দিকে এগিয়ে যাই। সত্যিই নদীর ধারে চরণ পালের আসন। বসে আছেন এক ফকির। তাঁর সামনে রক্তাম্বরধারী এক সাধক। অগণিত নরনারী আসনে নিবেদন করছে দই চিঁড়ে কলা মুড়কি। আজ যে চিঁড়ে মহোৎসব।
যদিও এ সবই জানি, তবু সুযোগ পেয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে এসে চরণ পাল তাঁর দীনদয়ালকে পেয়েছিলেন সেই বৃত্তান্ত কী জানেন? দীনদয়ালই বা কে?’
লোকটি বলল ‘দীনদয়াল দীনবন্ধু আমাদের সাহেবধনীদের উপাস্যের নাম। আর চরণ পাল আমাদের গুরুবংশের একজন আদিগুরু। তাঁর নিবাস নদে জেলার দোগাছিয়ায়। জাতে গোপ। তিনি একদিন মাঠে গোরু চরাচ্ছিলেন, এমন সময় এক উদাসীন এসে দুধ খেতে চাইলে। গোরুর পালে বেশিরভাগ এঁড়ে আর বলদ। কেবল একটা বাঁজা গাই ছিল। চরণ তাই বললেন: ‘দুধ কোথায় পাব?’ উদাসীন বললেন, ‘ওই বাঁজা গাইতেই দুধ দেবে।’ কী কাণ্ড, সত্যিই তাই। চরণ পাল কেঁড়ে ভর্তি দুধ দুইয়ে চেয়ে দেখেন উদাসীন কোত্থাও নেই। এই যে ছিল, তবে হঠাৎ মানুষটা গেল কোথায়? খোঁজ খোঁজ। হাতে দুধের কেঁড়ে নিয়ে চরণ পাল ছোটে। দৃষ্টি এলোমেলো। কোথায় গেল উদাসীন? মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে ভর-সন্ধেবেলা এই অগ্গদ্বীপে এসে তাঁকে এই গাছতলায় পেলেন। উদাসীন সেই দুধ খেয়ে বললেন, ‘যাঃ তোর মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। তুই দীনদয়াল পেয়ে গেছিস। আজ থেকে তুই বাক্সিদ্ধ। তোর পরের ছ’পুরুষ থাকবে বাক্সিদ্ধ।’ তো বাবু, এই তো বিত্তান্ত।’
আমি বললাম, ‘বাক্সিদ্ধ কাকে বলে?’
: আজ্ঞে, যাঁর বাক্য ফলে যায়। এই যেমন ধরুন বাক্সিদ্ধ বললেন, ল্যাংড়া সেরে যাবে, বোবায় কথা বলবে, অন্ধ চোখে দেখবে, বাঁজার সন্তান হবে, তো তাই হবে। তিনি পশ্চিমে সূর্য উদয় দেখাতে পারেন। বাক্যের বলে লক্ষ লোককেও অন্ন-মচ্ছব করাতে পারেন। এই যেমন ধরুন, এখানে চরণ পালের হুকুম আছে তাই কোনওদিন এ মেলায় ঝড়জল হয় না, গাছে একটা কাকপক্ষী নেই, নেই কুকুর শেয়াল। এ সব বাক্সিদ্ধ সাধকের হেকমৎ।
: বাক্সিদ্ধ ছাড়া অন্য কোনও রকম সিদ্ধপুরুষ হয় নাকি?
: আজ্ঞে হ্যাঁ। তাকে বলে সাধনসিদ্ধ। আমাদের চরণ পালের শিষ্য কুবির গোঁসাই ছিলেন সাধনসিদ্ধ। তার একটা গান আছে—
সাধনেতে সিদ্ধ হয়েছি।
ভক্তিভাবেতে কেঁদে প্রেমের ফাঁদে
অধর চাঁদকে ধরেছি।
অতি যত্ন করে রত্ননিধি।
হৃদয়মাঝে রেখেছি।
ঘুচায়ে মলামাটি হয়েছি পরিপাটি
করিনে নটিখটি
খাঁটি পথে দাঁড়িয়েছি॥
বাবু, এই অগ্গদ্বীপ খুব পবিত্র স্থান। এখানে ঘোষ ঠাকুরকে নিয়ে গুপিনাথের লীলা, এখানেই চরণচাঁদ তার দীনদয়ালকে পেয়ে হন বাক্সিদ্ধ, এখানেই কুবিরের সাধনসিদ্ধি।
আমি সেই ঐশী মাটিতে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবাহিনী গঙ্গার দিকে চাইলাম। অস্তরাগবিধুর অপরাহ্ণ। সেই ম্লানতায় বর্ণরঞ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভেঙেপড়া অগ্রদ্বীপের বিখ্যাত জমিদার হরি মল্লিকের বাড়ি। সে বাড়িও অস্তমুখী। আমি মনে উচ্চারণ করলাম দাশরথি রায়ের পদ:
ধরাধামে হরি মল্লিক বংশ ধন্য!
অগ্রদ্বীপ অগ্রগণ্য
যেথায় গোপীনাথের লীলা ॥
হঠাৎ অন্ধকার নেমে এল। আখড়াগুলোয় জ্বলে উঠল সাঁঝবাতি, লণ্ঠন আর হ্যাজাকের আলো। চারিদিকে অসংখ্য মানুষের কথা বলার শব্দ, একতারা দোতারা গুপিযন্ত্র আর বাঁয়ার শব্দ, মেলার ব্যাপারীদের চিৎকার, বাউল ফকিরদের শব্দগানের তান। কেবলই মনে হয়, এখন, এই অগ্রদ্বীপে প্রায় লক্ষ লোকের বসত, আর কাল বাদে পরশু সকালে আম-বারুণীর স্নান সেরে সবাই ফুরুৎ। শুধু পড়ে থাকবে এই বিরাট মাঠের শূন্যতা, পশ্চিমের গঙ্গা, কয়েকটা গাছ, ভেঙে পড়া মল্লিক বাড়ির উদাসী রিক্ততা আর পাঁচশো বছরের কিংবদন্তি-পুরুষ গুপিনাথ।
একটা আখড়ার আলোকে নিশানা করে এগোই। অন্ধকারে আর মানুষের চলমানতায় ভাল করে এগোনোও যায় না। এখনও একাদশীর চাঁদটুকু ওঠেনি। রাত বাড়বার আগে একটা জুতসই আখড়া খুঁজে না নিলে সারা রাতের খাওয়া শোওয়ার খুব দিগদারি হবে। দেখা যাক সামনের আখড়ায় একটু নাক গলিয়ে, এই ভেবে ভিড় ঠেলে মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে ভেতরে তাকাই। ভেতরে গানের লড়াই হচ্ছে। আমি সোজা সেঁধিয়ে যাই একেবারে আসরের মাঝখানে। ভব্যিযুক্ত চেহারা দেখে একজন বলে; ‘বাবু বসুন।’ আড় চোখে আমাকে দেখে নিয়ে গায়ক গেয়ে চলে:
জগতে ব্রহ্ম বস্তু সার।
এই ব্রহ্মা হতেই সৃষ্টি সবার।
তোমরা অন্য তত্ত্ব খুঁজো না ॥
গানটা যখন সাঙ্গ হয়ে আসে তখন এই গায়কের যে প্রতিদ্বন্দ্বী গায়ক সে ধীরে সুস্থে পায়ে ঘুঙুর বাঁধে। তারপরে গান শেষ হতেই সবাই বলে, ‘কী গানের তত্ত্ব কাটান দেবে নাকিন?’
‘দেব বইকী। এ সব গানের তত্ত্ব তো আমার কাছে শিশু। হাড়িরামের কৃপায় আমার ঝুলিতে গান কি একটা?’ মানুষটা সদর্পে বলে।
হাড়িরামের কৃপা? একেবারে যাকে বলে কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি বুঝলাম নিশ্চিন্দিপুরের বিপ্রদাসের বাইরেও তা হলে হাড়িরামের গাহক আছে। ‘কী নাম গাহকের?’ ‘বাড়ি কোন গ্রামে?’ আমার প্রশ্নের জবাবে গাহক বলে: ‘আজ্ঞে নিবাস বেতাই জিৎপুর। হাড়িরামের এই অধম সেবকের নাম রামদাস সরকার।’
এবারে একতারা কানের কাছে ধরে হেঁকে বলে রামদাস:
বলরামচন্দ্র হাড়ি গোঁসাই।
হাড় হাড়ডি মণি মগজ
তারকব্রহ্ম রামনারায়ণ।
