: কেমন লাগে?
: প্রথম প্রথম খুবই খারাপ লাগত। কলকাতার জীবনের জন্যে মন টানত। এখানটা একটা ফাঁকা মাঠ বই তো নয়। মানুষজন কোথাও নেই আশেপাশে। আমি আর গুপিনাথ পড়ে থাকি। ক্বচিৎ কদাচিৎ যাত্রী বা ভক্ত আসে। নইলে সারা দিন একা। রাতেও। ভোগ রাগ দিই, পুজো করি, বৈকালী আর সন্ধেবেলার শেতল দিই। তা ছাড়া বাল্য ভোগ। মাসে একদিন হয়তো বাড়ি যাই। ওই আছি আর কী!
: এখন আর খারাপ লাগে না তা হলে?
: গুপিনাথ রয়েছেন তো। এখন মন বসে গেছে। একটা টানই বলতে পারেন। কোথাও গিয়ে শান্তিও পাই না। ভাবি তাঁর হয়তো অযত্ন হচ্ছে। কেবল ভাবি কখন ফিরব। একটু দেখব গুপিনাথকে।
: এর কারণ কী মনে হয়?
: কারণ আর কি? গুপিনাথের মায়া সব। সাংঘাতিক মানুষ তো৷ ঈশ্বরের নরলীলা। তাঁর শক্তি কি কম? মাঝে মাঝে যেমন রাতে ঘুম ভেঙে দেখি চার দিক ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা। অথচ ফুল কই? কখনও কখনও অনেক রাতে গুপিনাথের ঘরের দরজার খিল খোলা বা বন্ধের আওয়াজ পাই। মনে হয়, রাতের দিকে উনি কোথাও যান, আবার ভোরের দিকে ফেরেন। টের পাই।
পৃথক এক স্পষ্ট জগতের অধিবাসী পূজারির দিকে চেয়ে বিস্ময়ের আর তল পাই না। তাঁকে এ কথা আর জিজ্ঞেস করতে পারি না যে সর্বশক্তিমান সর্বব্যাপী দেবতার কোথাও যেতে কেন খিল খুলতে হয়? বরং জানতে চাই, ‘ঈশ্বরের নরলীলার শক্তির কথা বলেছিলেন, সেটা কী ব্যাপার?’
‘আপনি ঘোষঠাকুরের ঘটনা জানেন না দেখছি’ পূজারি খানিকটা করুণা মিশিয়ে বলেন, ‘তবে শুনুন। উত্তর রাঢ়ীয় কায়স্থ বংশের সন্তান ছিলেন গোবিন্দ, বাসুদেব আর মাধব ঘোষ এই তিন ভাই। কাটোয়ার কাছে অজয় নদীর পারে কুলাই গ্রামে ছিল তাঁদের বাড়ি। শ্রীগৌরাঙ্গের পার্ষদ ছিলেন তাঁরা। চৈতন্য চরিতামৃতের আদিখণ্ডে লেখা আছে:
গোবিন্দ মাধব বাসুদেব তিন ভাই।
যা সবার কীর্তনে নাচে চৈতন্য গোঁসাই৷৷
তো সেই গোবিন্দ ঘোষ আর অন্যান্য সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে একবার প্রভু চলেছেন রামকেলির দিকে। পথে যেতে যেতে যে গ্রামে দুপুর হয়ে যেত সেখানেই হত মধ্যাহ্ন ভোজন। এক গ্রামে সেদিন খাওয়া-দাওয়া সেরে মহাপ্রভু বললেন ‘একটু মুখশুদ্ধি পেলে হতো।’ সঙ্গে সঙ্গে গোবিন্দ গ্রাম থেকে এক টুকরো হত্তুকি জোগাড় করে তাঁকে দিলেন, আর এক টুকরো নিজের কাছে রেখে দিলেন। পরদিন মহাপ্রভুর দল পৌছাল এই অগ্রদ্বীপে। এখানে দুপুরের খাওয়া শেষ হতেই গোবিন্দ এগিয়ে দিলেন বাকি হত্তুকিটুকু। প্রভু তো অবাক। ‘কোথায় পেলে হত্তুকি?’যখন শুনলেন গতদিনের অংশ এটা, বললেন, ‘হল না। গোবিন্দ তোমার সন্ন্যাস হল না। তোমার আজও সঞ্চয় বাসনা যায়নি। তুমি গৃহস্থ হও। বিবাহ করো। থাকো এখানেই।’
‘কী আর করেন। প্রভুর আদেশ। রয়ে গেলেন। এক দিন গঙ্গায় স্নান করছেন গোবিন্দ। গায়ে কী যেন একটা ভেসে এসে ঠেকল। শ্মশানের পোড়া কাঠ নাকি? না। মনে প্রত্যাদেশ পেলেন ওটা ব্রহ্মশিলা। ওটাকে ধরো। বাড়ি নিয়ে যাও। প্রভু এলেন আবার। ওই ব্ৰহ্মশিলা দিয়ে বিগ্রহ বানাল ভাস্কর। গোবিন্দের চালাঘরে মহাপ্রভু নিজে বসালেন গোপীনাথকে। এই সেই গোপীনাথ।’
পূজারি থামলেন। আমি বললাম, কিন্তু আপনি যে তখন বললেন এ মূর্তি বিশ্বকর্মার গড়া?’
বিরক্ত পূজারি বললেন, ‘বিশ্বকৰ্মাই তো। মানুষরূপী বিশ্বকর্মা। জানেন না গোপীনাথ গড়েছিল বলে আজও দাঁইহাটের ভাস্করদের কত সম্মান? যাই হোক। গোবিন্দ তো তার. পর বিয়ে করলেন। সেবাপুজো করেন। ক্রমে পুত্র সন্তান হল একটি। ইতিমধ্যে হঠাৎ স্ত্রী মারা গেল। মহা মুশকিল। একদিকে সন্তান পালন অন্য দিকে গোপীনাথের পুজো। কোনওটাই ভাল করে পারেন না। গোলমাল হয়ে যায়। এদিকে পাঁচ বছর বয়স হলে ছেলেটি মারা গেল। গোবিন্দ শোকে পাগলমতো হয়ে গেলেন। ভাবলেন সন্ন্যাস হল না। গোপীনাথকে বললেন, ‘তোমার কথায় সংসারী হলাম। স্ত্রী নিলে, একমাত্র সন্তানকেও নিলে? যাও তোমার সেবা পুজো বন্ধ। তোমাকেও খেতে দেব না। নিজেও খাব না। আত্মঘাতী হব। দেখি তোমার বিচার।’ তখনই ঘটনাটা ঘটল।’
: কী ঘটনা?
: গোপীনাথ বললেন, ‘তোমার কি দয়ামায়া নেই? একটা ছেলে যদি দৈবগতিকে মরেই থাকে তাই বলে আর এক ছেলেকে তুমি না খেতে দিয়ে শুকিয়ে মারবে?’সটান উঠে বসে গোবিন্দ। বলে, ‘তুমি আমার ছেলে? তুমি ছেলের কাজ করবে আমার?’ কী কাজ?’ গোপীনাথ জানতে চান। গোবিন্দ বলেন, ‘শ্রাদ্ধ। ছেলে থাকলে আমার শ্রাদ্ধ করত। তুমি তা করবে?’ ‘করব। কথা দিলাম।’ সেই থেকে এই ঘোষ-ঠাকুরের শ্রাদ্ধ চলছে। প্রতি বছর তিন দিন কাছা পরে থেকে তিনি একাদশীতে শ্রাদ্ধ করেন।
: তিন দিন কেন? আমি জানতে চাই।
: বৈষ্ণবদের শ্রাদ্ধ তো তিন দিনেই হয়। কিন্তু আসল কথাটা কী ধরতে পারলেন? ভক্তবৎসল ঈশ্বরের আসল মহিমাটা খেয়াল করলেন?
: কী বলুন তো?
: নিজের ছেলে যদি বেঁচে থাকত গোবিন্দ ঘোষের তবে বড় জোর সে যে-ক’বছর বেঁচে থাকত সে-ক’বছর শ্রাদ্ধ করত বাবার। কিন্তু ভক্তবৎসল প্রভু যে এখানে পাঁচশো বছর ধরে শ্রাদ্ধ করছেন। যতদিন সৃষ্টি থাকবে ততদিন এখানে এই ঘোষ-ঠাকুরের শ্রাদ্ধ আর পিণ্ডদান করবেন গুপিনাথ। এ কী সোজা কথা? সেইজন্যে এখানকার এত মাহাত্ম্য। এত মানুষ। সব রকমের সাধু সন্ন্যেসী বাউল বৈরাগী দরবেশ অবধূত এখানে আসেন। এখানে এসেই চরণ পাল তাঁর দীনদয়ালকে পেয়েছিলেন। সেইজন্যে ওই উত্তর দিকে, চরণ পালের ‘আসন’ বসে প্রত্যেক বছর। যান দেখে আসুন।
