এবারে শুরু হয় আমার শহুরে নির্বোধ প্রশ্নমালা। আপনারা কোন সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব? আপনাদের কোন ধারা? মাধবাচার্য না নিম্বার্ক না রামানুজ? কোথায় থাকেন? গুরুপাট কোথায়? মানুষটা গোঁফদাড়ির ফাঁকে আমার জন্যে ভরে রাখেন এক করুণার হাসি। বলেন, ‘বৈষ্ণব কি এক রকম? আমরা রাতটহলিয়া। কিছু বুঝলেন?’
: রাতটহলিয়া? মানে কী?
: মানে আমাদের কাজ হচ্ছে সারা রাত টহল দিয়ে নামগান করা।
: এমন কথা আগে শুনিনি। শুনেছি বৈষ্ণব দু রকম। নৈষ্ঠিক বৈষ্ণব আর সহজিয়া বৈষ্ণব। আরও অনেক বৈষ্ণব আছে নাকি?
: আছে বইকী? আমার অজানা অনেক আছে। আর জানা বোষ্টমদের কথা শুনলেই ভিরমি খাবেন। শুনুন। জাত বৈষ্ণব আর সহজিয়ার বাইরে আমার জানিত সম্প্রদায় হল রাধাশ্যামী, রূপকবিরাজী রাধাবল্লভী, হরিবোলা, গুরুদাসী বৈষ্ণব, খণ্ডিত বৈষ্ণব, করণ বৈষ্ণব, চামার বৈষ্ণব, কিশোরীভজনী, গৌরবাদী আর আমাদের রাতটহলিয়া।
: এরা সব কোথায় থাকেন? চেনেন কী করে?
: লক্ষণে চেনা যায়। ক্রিয়াকরণ আলাদা। বীজমন্ত্র আলাদা। মেলা মহোৎসব আলাদা আলাদা স্থানে। যেমন ধরুন আমাদের দীক্ষামন্ত্র আর কণ্ঠিবদল হয় মোহনপুর কেঁদুলিতে।
ততক্ষণে বৈষ্ণবীর রসকলি পরা এমনকী সর্বাঙ্গে গৌর ছাপ দেওয়া সারা। কুচকুচে কালো গায়ের চামড়ায় সেই তিলক-মাটির রং ক্যাঁট ক্যাঁট করছে। তিনি আমার দিকে এক মোহিনী কটাক্ষ করলেন। আমার জানাচেনা সমাজের বাইরে এক স্পষ্ট পৃথক পারমিসিভ সোসাইটির রূপরেখা ওই কটাক্ষে আঁকা ছিল। আমি চট করে উঠে পড়ে বললাম, ‘আপনাদের কণ্ঠি বদল কত দিনের?’
বৈষ্ণবী তার আতার বিচির মতো মিশিমাখা দাঁত বার করে বললে, ‘এবারেই পৌষ মাসে আমাদের কণ্ঠিবদল হয়েছে গো। দেখে বুঝছেন না আমাদের নবীন নাগরালি? বসুন বসুন। সকালে একটু জল-বাতাসা সেবা করুন। ঘেমে তো নেয়ে গেছে অঙ্গ।’
প্রৌঢ়ের সঙ্গে যুবতীর এই নবীন নাগরালি সুস্থ মনে সওয়া কঠিন। এ মেয়ে নিশ্চয়ই. অনেক বোষ্টমকে ঘোল খাইয়েছে। আমি অবশ্য আপ্ত সাবধান আছি। বৈষ্ণব বাবাজি খুব নির্বিকার উদাসী ভঙ্গিতে গাঁজায় দম মারছেন। এ জগতের কোনও ইশারা আপাতত তাঁর কাছে খুবই মূল্যহীন। পেতলের রেকাবিতে বাতাসা আর কদমা, ঘটিতে গঙ্গাজল। বৈষ্ণবী ভক্তিভরে আমাকে নিবেদন করে এবারে চুল বাঁধতে বসলেন। সঙ্গে গানের গুনগুনুনি। সে গানের বাণী শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম:
সখি পিরিতি আখর তিন।
পিরিতি আরতি যেজন বুঝেছে সেই জানে তার চিন।
নয়নে নয়নে বাণ বরিষণে।
তাহাতে জন্মিল ‘পি’
অধরে অধরে সুধা পরশনে
তাহাতে জন্মিল ‘রি’
আর হৃদয়ে হৃদয়ে ভাব বিনিময়ে
তাহাতে জন্মিল ‘তি’।
গানের শেষে আর-এক মোক্ষম কটাক্ষ। সেই বাণ কোনওরকমে সামলে আমি উঠে পড়ি। খেয়াঘাট অদূরে। এখুনি পার হতে হবে।
মন্দিরে পৌঁছে দেখা গেল শ্রাদ্ধ শেষ। একজন বললে, ‘দেরি করে ফেললেন গো। ছেরাদ্দ এবারের মতো শেষ। আপনার দেখা হল না। গুরুবল নেই। তা কী আর করবেন? আজ তো চিঁড়ে-মচ্ছব। বসুন আমাদের আখড়ায়। দই চিঁড়ে খান।’
গোপীনাথের মন্দির-চত্বরের পাশে ঘোষঠাকুরের সমাজ ঘর। তার মানে গোবিন্দ ঘোষের সমাধি। সেখানে নাকি শ্রাদ্ধের সকালে গোপীনাথকে আনা হয় কাছা পরিয়ে। তার হাতে দেওয়া হয় পিণ্ড আর কুশ। খানিক পরে তা স্খলিত হয়ে পড়ে মাটিতে। হই হই করে ওঠে ভক্তজন। প্রধানত গোপসম্প্রদায়। মেলাচত্বরের চার দিক মানুষে মানুষে গিজগিজ করছে।
সেখান থেকে এগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে মন্দিরে উঠে ভেতরে তাকাই। অপরূপ কৃষ্ণমূর্তি কষ্টিপাথরের। খুব নিপুণভাবে কাছা পরানো। এক অভিনব দৃশ্য বইকী। সারা ভারতবর্ষে কৃষ্ণমন্দির তো অজস্র। কিন্তু কোথাও কৃষ্ণ কাছা পরে তার ভক্তের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেন এমন কেউ শোনে নি। পূজারি মন্দিরের একপাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আপন মনে। তাঁকে বিরক্ত করলাম নানা প্রশ্নে। জবাব এল সোজাসুজি; ‘এ হল ভগবানের ভক্তবাৎসল্যের পরাকাষ্ঠা। জগতের কোথাও এমন ঘটে নি। এই যে মূর্তি দেখছেন এ স্বয়ং বিশ্বকর্মার নিজের হাতে তৈরি। কষ্টিপাথরের মূর্তি। চোখ দুটো শাঁখের।’
বিশ্বাসী জগতের মানুষটিকে আঘাত করতে ইচ্ছে করল না আজকের দিনে। তাই প্রসঙ্গ পালটে বলি, ‘আপনারা কি বংশানুক্রমে গোপীনাথের পূজারি?’
: ঠিক তা নয়। যদ্দুর খবর শুনেছি, রাজা রঘুরামের আমলে প্রথম পূজারি ছিলেন অগ্রদ্বীপের নিত্যানন্দ ভটচাজ্জি। তাঁর হাত থেকে আমাদের বংশে পৌরোহিত্য আসে। আমরা নদীর ওপারে বহড়ার লোক। আমাদের বংশে গোপীনাথের প্রথম পুরোহিত হন মধুসূদন। তাঁর ছেলে ত্ৰয়োনিধি, তাঁর ছেলে ত্রিলোচন। তাঁর ছেলে তারাপদ। তাঁর ছেলে শ্যামাপদ। তাঁর ছেলে আমি। তা হলে ক’পুরুষ হল? ছ’পুরুষ? এই ছ’পুরুষ ধরে আমরা গোপীনাথের পূজা করছি।
: আপনার ছেলেও কি গোপীনাথের পূজারি হবেন মনে হয়?
‘কী করে বলি বলুন তো?’ পৃজারি বলেন, ‘আমার নিজেরই তো এ কাজ করার কথা নয়। আমি তো চাকরি করতাম বেঙ্গল পটারিতে। কোনওদিন কি ভেবেছি এখানে এই ফাঁকা মাঠে মন্দিরে পড়ে থাকব?’
: কীভাবে পূজারি হলেন?
: বাবাই বরাবর পুজো করতেন। হঠাৎ বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে আমাকে তার করলেন। আমি ছুটি নিয়ে এসে কদিন সেবাপুজো চালালাম। কিন্তু বাবা আর তেমন সুস্থ হলেন না। তখন বললেন, ‘পুজোর দায়িত্বটা তুইই নে। হাজার হলেও গুপিনাথ আমাদের বাড়ির ছেলের মতো!’ কথাটা ফেলতে পারলাম না। রয়ে গেলাম। তা চার-পাঁচ বছর তো হয়ে গেল।
