কীভাবে?
এ কৌতূহলের ফুঁপি থেকে আরেকটা রহস্যের জট খুলে যায়। পূর্ববঙ্গের নিম্নবর্গের বেশির ভাগ মানুষ গৌরভক্ত। দেশ ভাগের সময় তাদের অনেকে পুনর্বসতির জন্যে তাই বেছে নেয় ‘গৌরগঙ্গার দেশ’ অর্থাৎ নবদ্বীপ আর তার আশপাশ। দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের যে-সব গ্রামীণ মেলায় কৃষ্ণের অনুষঙ্গ আছে সেগুলি বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে এ ব্যাপারটা অনেকে খেয়াল করেননি। সেই সঙ্গে এটাও লক্ষ করা হয়নি যে বেশির ভাগ অন্যান্য মেলার নাভিশ্বাস উঠেছে। কেননা গ্রামে গ্রামে এখন সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা টেমপো আর ম্যাটাডোরের কল্যাণে এত সুনিশ্চিত যে মেলায় গ্রামীণ মানুষের কেনার সামগ্রী অনেক কম। মেলা এখন শুধুই বিনোদন আর প্রচল। শীর্ণ প্রথা কিংবা নৈমিত্তিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অগ্রদ্বীপের রমরমাই আলাদা। মানুষ, শুধু মানুষ। দশটা খেয়া নৌকো মানুষ পারাপারে কিছুতেই সামলে দিতে পারে না।
পথে যেতে লক্ষ করা যায় সকলেরই কেমন যেন একটা পৌঁছবার তাড়া রয়েছে। যেন ছুটছে। ‘ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারব তো?’ দেরি ‘হয়নি তো?’ কীসের ঠিক সময়? দেরিই বা কেন? এক জনকে জিজ্ঞেস করতে বলে, ‘এগারোটার মধ্যে তো শ্ৰাদ্ধ হয়ে যাবে। তাই এত তাড়াতাড়ি।’
: শ্রাদ্ধ? কার শ্রাদ্ধ?
: আপনি কোনওদিন আসেননি বুঝি? শ্রাদ্ধ মানে ঘোষঠাকুরের শ্রাদ্ধ।
: ঘোষঠাকুর মানে গোবিন্দ ঘোষ? তার শ্রাদ্ধ কে করে?
: কে আবার করবে? করেন স্বয়ং আমাদের গুপিনাথ। আজকে আম-বারুণীর একাদশী। আজ গুপিনাথ কাছা পরে ঘোষঠাকুরের শ্রাদ্ধ করবেন। চলুন, পা চালান।
উর্ধ্বশ্বাসে চলমান এই বাহিনীর সঙ্গে আমি তাল রাখতে পারি না বোধহয় চাইও না। আমার মনে এ সব ঘটনা বড় জোর কৌতূহল আর কৌতুক জাগায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি যে মধুকৃষ্ণা একাদশী তা কি আমার কোনওভাবেই খেয়াল থাকে? আম-বারুণীর কোনও আহ্বান কি আমার জীবনে থাকতে পারে? অথচ আমার সঙ্গে দ্রুত ধাবমান এই ভক্ত-জনতা প্রতি বছর সে সব তিথি আলাদা করে মনে রাখে আর দিন গোনে। ঘোষঠাকুরের শ্রাদ্ধ দেখার জন্যে তাদের এই মুক্তকচ্ছ দৌড় আর খেয়া নৌকোয় বিপজনক লাফ দেওয়া, তার পিছনে যে-মনের টান, হিসেব করে দেখি, তার একটা অণুকণা আমার মনের অতলে জমা নেই। এরা কি তবে জীবনানন্দ-কথিত ‘পৃথক, আর এক স্পষ্ট জগতের অধিবাসী?’ পৃথক তো বটেই। কেননা এই বিরাট সৌর পৃথিবীর অন্তর্গত আমাদের প্রতিদিনের যে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই-করা জীবন তার সঙ্গে এদের অটল ভক্তিবিশ্বাসের জীবন একেবারে পৃথক। স্পষ্ট, কেননা এদের লক্ষ্য স্থির, বিশ্বাস ধ্রুব, আচরণ সুনির্দিষ্ট, চলাচল ভক্তির পথে। সেখানে তাদের সংশয় সন্দেহ নেই। আমার পিছন পিছন দুই মাঝবয়সী বিধবা যাচ্ছিলেন বহু রকম কথা বলতে বলতে। তাঁদের আলোচনার একটা গুরুতর প্রসঙ্গ হল সঠিক গুরুনির্বাচন। চলার পথে গুরুনির্বাচনে ভুল হলে নাকি সমূহ সর্বনাশ। একজন আর একজনকে বলছেন, ‘আমি ওই কালোর দিদির মতো নাপিয়ে নাপিয়ে গুরুসঙ্গ করতে পারব না।’ এ কথা শুনে মনে হল ‘নাপিয়ে নাপিয়ে’ শব্দটার মানে যদি হয় উল্লম্ফন তবে কালোর দিদির মনের চাঞ্চল্য বোঝা যায়। অর্থাৎ তিনি কেবলই গুরু পাল্টান। সেটা খারাপ।
এ কথার জবাবে অন্য মহিলা বললেন, ‘গুরু পাওয়া কি সোজা কথা? পেরথমে লোকের মুখে সাধু কথা শুনে জন্মায় ছেদ্দা। পরে সাধুদর্শনে লোভ জাগে। সেই লোভ থেকে হয় সাধুসঙ্গ। সেই সাধুতে আসে গুরুজ্ঞান। এ সবের মূলে থাকে গুরুর কথা। আমার গুরুলাভ হয়েছে। হ্যাঁগো, তোমার গুরুলাভে শান্তি হয়েছে?’
: খুব শান্তি। নইলে তাঁর কাছে এত ব্যগ্র হয়ে ছুটে যাচ্ছি কীসের জন্যে? আমার তো অত গুপিনাথ দেখার লোভ নাই। সেখানে গুরু গেছেন, তাঁর আদেশ হয়েছে, তাই আমার যাওয়া। আমার মনের দুঃখ কী জানো? গুরুকে আমি তেমন আপন করে নিতে পারিনি এখনও। তিনি কিন্তু আমাকে আপন করে নিয়েছেন।
এ সব শুনতে শুনতে এদের স্পষ্ট পৃথক অস্তিত্ব আবার টের পাই। পিছিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে বসি, ‘আপনাদের গুরু কে? থাকেন কোথায়?’
‘ও বাবা। তুমি বুঝি আমাদের কথা শুনে ফেলেছ? কী লজ্জা। তা যাকগে। বাবা আমাদের গুরুর নাম গগন বৈরাগ্য। গুরুপাট বামুনডাঙ্গা। এখানে তিনি এসেছেন মচ্ছব দিতে। তুমি যেয়ো আমাদের আখড়ায়। খুব শান্তি পাবে। গুরু আমাদের মাটির মানুষ। কী করে আখড়া চিনবে? লোকজনকে জিজ্ঞেস কোরো, চরণ পালের আখড়া কোথায়। এখানে চরণ পালের আখড়া তো খুব নাম করা। তারি পশ্চিমে আমার গুরুর আখড়া পিটুলি গাছতলায়। হ্যাঁগো ছেলে, যাবা তো?’
কথা দিয়ে এগিয়ে চলি। বেশ পরিশ্রান্ত লাগে। একটু বসতে পারলে বেশ হত। কিন্তু তপ্ত বালির চড়ায় বসি কোথায়? শেষপর্যন্ত পৌঁছানো গেল গঙ্গার ধারে। এবারে এই ধারের পথ ধরে অন্তত সিকি মাইল হাঁটা রাস্তা শেষ হলে খেয়াঘাট। আপাতত গঙ্গার ধারে বহুলোক স্নান করছে। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। চোখে পড়ে এক বৈষ্ণবী স্নান সেরে, গৈরিক বাস পরে, আপন মনে একটা ছোট আয়না মুখের সামনে ধরে বসে বসে মুখে নাকে কপালে রসকলি আঁকছে। পাশে তার প্রৌঢ় বৈষ্ণব বাবাজি বসে গাঁজা সেবা করছেন। পৃথক এই মানুষটার সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছে জাগল। বাবাজি খাতির করে তাঁর শতরঞ্চির একটা কোণে বসতে বললেন। আঃ কী শান্তি।
