ব্যাস। অপরাধ মকুব। সঙ্গে সঙ্গে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ চলে এলেন রাজা রঘুরামের দখলে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত গোপীনাথ কৃষ্ণনগরের রাজবাড়িতে বছরে অন্তত ছ মাস থাকেন। সেবা পূজা শেতল হয়। অবাক কাণ্ড। এমনই নাকি ছিল সেকালের নবাবি প্রশাসন?
অগ্রদ্বীপের বেশ প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায় ওড়িয়া কবি দিবাকর দাসের ‘জগন্নাথ চরিতামৃত’ বইতে। বইটি সতেরো শতকে লেখা। ওই বইতে ওড়িয়া ভাষায় লেখা আছে—
অগ্রদীপ ঘাট যা কহি।
তঁহিরে শ্রীঘোষ গোঁসাই।
এই শ্রীঘোষ গোঁসাই মানে গোবিন্দ ঘোষ। যাঁর নামে এই মেলার নাম এখনও অনেকে বলেন ‘ঘোষ ঠাকুরের মেলা।’
ঘোষপাড়ার কর্তাভজাদের বিখ্যাত নেতা দুলালচাঁদ ওরফে লালশশীর মতো মান্যগণ্য লোকও যে অগ্রদ্বীপ গিয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁর গানের এই উক্তিতে ধরা আছে যে,
একবার অগ্রদ্বীপের মহোৎসবে দেখতে গেলাম একা
আখড়াধারী কত পুরুষ-নারী হয় না লেখা জোখা।
এ বিবরণ থেকে অগ্রদ্বীপের মেলায় আখড়াধারী অনেক সহজিয়াদের বর্ণনা পাওয়া যায়। এর চেয়েও স্বাদু বর্ণনা মেলে সাহেবধনী-গীতিকার কুবির গোঁসাইয়ের লেখায়—
যত নেড়ানেড়ি ঘোষের বাড়ি
প্রসাদ মারে রোজ দুবেলা।
রামাতনিমাত ব্রহ্মচারী
আউল বাউল কপ্নিধারী
যত শুদ্ধাচারী জপে মালা।
উদাসীন দরবেশ গোঁসাই
ফুৎকার অবধৌতি নিতাই
উন্মত্ত সদাই গেঁজাডলা।
এর পাশে সহজিয়া নাগর-নাগরীর প্রেমচিত্রও কম আকর্ষণীয় নয়। সেখানে দেখা যায়—
নাগরী চারিদিকে বেড়াচ্ছে পাকে পাকে
দ্যাখে যারে তাইরে ডাকে ‘এসো প্রাণবন্ধু’ বলে।
এই মনের মতো হলে পরে
নামের মালা দেয় তার গলে।
বলিতেছে ‘ধরো ধরো’, ধরো ভাই যত পারো,
প্রেমসেবা যদি করো মনের সাধে সকলে।
অবশ্য অগ্রদ্বীপের মেলা নিয়ে যে খারাপ কথাও চালু আছে তা আমি জানতাম না। জানালেন এক বহুদর্শী ফকির। বললেন, ‘মেলায় নানা রকম মানুষ আসে নানান তালে। সবাই তাদের মধ্যে ভাল নয়। ঠগ, জোচ্চোর, দেহব্যবসায়ী, কামপাগল, শয়তানও থাকে বইকী। আমাদের চলতি কথায় ওইজন্যে অগ্রদ্বীপের মেলা সম্বন্ধে বলে: অগ্রদ্বীপের মেলা/ কে কার পাছায় মারে ঠেলা। তার মানে জায়গাটায় অশৈল কাজটাজও হয়। আমি ওই জন্যে অগ্রদ্বীপে আর যাই না। আশেপাশের গ্রামের ছেলেমেয়েরা আজকাল মেলায় এসে নোংরামি করে। ও মেলার মর্যাদা চলে গেছে।’
বাংলার মেলা নিয়ে তেমন সমাজতাত্ত্বিক কাজ হয়েছে বলে শুনিনি। হলে, মেলার আকার প্রকার স্বভাবের বিবর্তন থেকে সমাজ-বিবর্তনের একটা ছক পাওয়া যেত। যেমন দেখা যায় আশি বছর আগে মুরুটিয়ার স্নানযাত্রার মেলা দেখে যে বিবরণ দীনেন্দ্রকুমার রায় এঁকেছিলেন তাঁর ‘পল্লীচিত্র’ বইতে তার সঙ্গে এখানকার মেলার মিল বেশ কম। তিনি লিখেছেন:
বারবিলাসিনীগণের ‘দোকান’-এ অঞ্চলের মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মেলায় ইহাদের সমাগম যত অধিক হয় জমিদারদের লাভও তত অধিক হইয়া থাকে; এইজন্য তাঁহারা মেলাক্ষেত্রের একটি অংশ ইহাদের জন্য ঘিরিয়া রাখেন। ইহারাই মেলার কলঙ্ক। ইহাদের প্রবেশাধিকার না থাকিলে, শুনিয়াছি, মেলা জমে না! এক একটি রূপজীবিনী তিন চারি হাত লম্বা ‘টোঙ্গে’ রূপের দোকান খুলিয়া বসিয়াছে। মেলার একপ্রান্তে এরূপ শত শত ‘টোঙ্গ’! অর্থোপার্জনের আশায় এখানে নানা পল্লী হইতে তিন শতাধিক রূপজীবিনীর সমাগম হইয়াছে।….শিকারের সন্ধানে অনেকে চারিগাছা মলের ঝনঝনিতে গ্রাম্য চাষীদের ও পাইক পেয়াদা নগদীগণের তৃষিত চিত্ত উদভ্রান্ত করিয়া মেলার মধ্যে বিচরণ করিতেছে। জনারণ্যে নারীদেহে যেন সাপ, বাঘ!
জমিদারতন্ত্রের প্রশ্রয়ে গড়ে-ওঠা দেহব্যবসা এখন অনেক মেলাতেই নেই। দেহব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা এখন মেলায় থাকে না। টোঙ্গ আর শত শত স্বৈরিণী এখন কল্পনাতীত। তার কারণ শরীরী ব্যবসা এখন শহরকেন্দ্রিক এবং অনতিপ্রকাশ্য। অথচ আগেকার দিনে কৃষিভিত্তিক গ্রামদেশের মানুষের যৌনতার দীক্ষা হত সম্ভবত মেলাখেলায়। সেই জন্যে শিষ্ট সমাজে আজও গ্রাম্যমেলা সম্পর্কে একটা সশঙ্ক ধারণা আছে। সেকালের কত মেলায় যে কত মেয়ে হারিয়ে যেত।
সে কথা থাক। কিন্তু আমার যে কথাগুলো জানা ছিল না তার মধ্যে বড় কথা হল গোপীনাথকে সবাই বলে ‘গুপিনাথ’। স্বরসঙ্গতির ব্যাপার। এ কথাটাও জানতাম না যে অগ্রদ্বীপের উচ্চারণ অঞ্চলবিশেষের গ্রাম্যতায় দাঁড়াতে পারে ‘রগ্গদ্বীপ’। জানলাম প্রথম যেবার অগ্রদ্বীপে যাই সেবার ট্রেনে উঠে সহযাত্রী দলের বৈরাগী একজন আমাকে বললে: বাবু কি আমাদের মতোই রগ্গদ্বীপে যাচ্ছেন? চলুন। অন্য বার আমরা নদীপথে যাই এবারে যাচ্ছি এলে চড়ে।
‘এল’ মানে রেল। আশ্চর্য বর্ণবিপৰ্যায়। রেল হল এল, কিন্তু অগ্রদ্বীপ হল রগগদ্বীপ।
যাই হোক, প্রথম বারে আমার রগ্গদ্বীপের গুপিনাথ দেখতে যাওয়া ‘এলে চড়ে।’ ‘এল’ যে স্টেশনে থামল তার নাম অগ্রদ্বীপ। যদিও জায়গাটার নাম অগ্রদ্বীপ নয়। জায়গাটার নাম বহড়া। অগ্রদ্বীপ বহড়া গ্রাম থেকে আড়াই মাইল পুবের একটা গ্রাম। দুইগ্রামকে ভাগ করেছে গঙ্গা। আড়াই মাইল দূরের গ্রামের নামে স্টেশন? একেই বোধ হয় বলে অগ্রদ্বীপের মাহিত্ম্য।
চৈত্রের মাঝামাঝি সময়, কাজেই মাটিতে তাত উঠছে বেলা দশটাতেই। তার উপর গঙ্গার মস্ত চড়া আর বালিয়াড়ি। অন্তত একমাইল চড়া পেরোতে গৌরাঙ্গের কৃপায় বেশ ভালরকম ভক্তির পরীক্ষা ঘটে যায়। তবে ক্লান্তি লাগে না, কেননা সঙ্গে চলে অনেক মানুষজন, তাদের কলকাকলি। খুব তেষ্টা লাগলে কিনে খাওয়া যায় টাটকা তালের রস। কিংবা চড়ায় মাঝে মাঝেই কিনতে পাওয়া যায় ‘বাখারি’ অর্থাৎ এক রকমের লম্বাটে কাঁকুড়। সরস স্নিগ্ধ। কেউ চলেছে মাথায় করে একটা মিষ্টি কুমড়ো নিয়ে। ‘বিক্রি করবা নাকি কুমড়ো?’ জবাবে সে বলে ‘না গো, গাছের প্রথম ফল গুপিনাথকে দেব।’ যত মানুষ চলেছে তার বারো-আনাই মহিলা। বেশির ভাগ মানুষের ভাষা থেকে মালুম হয় যে তারা পূর্ববঙ্গের মানুষ। ব্যাপারটা কী? পুর্ববঙ্গের এত মানুষ এই রাঢ়ের অগ্রদ্বীপে কেন?
