মন্মথ অধিকারী আমার হাতে-ধরা পদ্মপাতায় দুখানা সদ্য-ভাজা গরম জিলিপি দিয়ে বলল, ‘বাবু, গৌরাঙ্গের কৃপায় আমি এই কাজে গত বিশ বছর নানা মালিকের দোকানের সঙ্গে অন্তত সত্তর-আশিখানা মেলা দেখেছি। কত মানুষ। কত কাণ্ড! কত ব্যাপারী। কত কেলেঙ্কারী। কত ঝড় জল। কত উটকো হাঙ্গামা। কিন্তু সব মিলিয়ে ভারী আনন্দ, যাই বলুন সবই গৌরাঙ্গের খেলা।’
এইভাবে ‘গৌরাঙ্গের কৃপা’ আর ‘গৌরাঙ্গের খেলা’ শব্দ দুটিকে অনর্গল অব্যয়ের মতো ব্যবহার করে মন্মথ অধিকারী আমার সঙ্গে জমিয়ে নিল। কথায় কথায় প্রসঙ্গের ফুঁপি বেরোয়। প্রসঙ্গ থেকে স্বচ্ছন্দে আরেক উলটো প্রসঙ্গে যেতে পারে মানুষটা। সেই সুযোগে আমি আমার মনে-পুষে রাখা অনেক দিনের একটা প্রশ্ন খালাস করে ফেলি; ‘এই যে পাঁচ-ছ মাস ধরে সব বাড়িছাড়া। সবাই কি সংযম করে থাকে নাকি? শরীরের ব্যাপার-স্যাপার আছে তো, না কি?’
জিভ কেটে মন্মথ বলে, ‘বিলক্ষণ। গৌরাঙ্গের খেলায় এই দেহ নিয়েই যত গোলমাল। আছে, তারও ব্যবস্থা আছে। সব মেলাতেই উস্কো মেয়েছেলে থাকে বইকী। তারা চোখে সুর্মা টেনে, পায়ে মল বাজিয়ে আমাদের জানান দিয়ে যায় সময়মতো। যার দরকার যোগাযোগ করে নেয়। সব মেলাতেই এসব চোরাগোপ্তা ব্যবস্থা থাকে। এক অগ্রদ্বীপের মেলা বাদে।’
:হঠাৎ ওই মেলাটা বাদ কেন?
:গৌরাঙ্গের কৃপায় ওই মেলা সবচেয়ে সাত্ত্বিক আর পবিত্র। ওখানে গিয়ে কুচিন্তা কি কাম একেবারে ত্যাগ করতে হবে। ও মেলার খুব মাহিত্ম্য। শুনতে চান কী রকম মাহিত্ম্য? তবে শুনুন। গৌরাঙ্গের খেলায় অগ্রদ্বীপের মেলার তিন দিনে লক্ষ লোক আসে কিন্তু দেখবেন একটাও কাক নেই, একটাও কুকুর নেই, কখনও ঝড় বৃষ্টি হয় না। আরও নিগূঢ় ব্যাপার আছে। সে সব স্বয়ং গেলে বোঝা যায়। আপনি যাবেন? তা হলে আপনাকে নিশানা দিয়ে দেব সব-কিছুর। অগ্রদ্বীপের মেলা সবচেয়ে পুরনো মেলা বাবু।’
আমি বললাম, ‘গৌরাঙ্গের কৃপায় অগ্রদ্বীপের মেলা চালু করেছিলেন কে?’
মন্মথ শূন্যে হাত ছুড়ে বলল, ‘আরে গৌরাঙ্গের খেলা। অগ্রদ্বীপের মেলা তো গৌরাঙ্গেরই তৈরি। তা হতেই সূচনা।’
চমকে বলি, ‘সে কী? গৌরাঙ্গই অগ্রদ্বীপের মেলা শুরু করেছেন?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ’, মন্মথ বিনয়নম্র বৈষ্ণবের মতো বলে, ‘গৌরাঙ্গের খেলায় আমি লেখাপড়া শিখিনি। মুরুখ্যু মানুষ। তবে আমার গুরুপাট পাটুলীতে ‘অমিয়নিমাইচরিত’ পাঠ হয়। সেখানে আর শ্রীগুরুর শ্রীমুখে শুনেছি স্বয়ং শ্রীগৌরাঙ্গ তাঁর পরিকর গোবিন্দ ঘোষকে দিয়ে ওখানে গোপীনাথ জিউ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই গোপীনাথ মন্দিরকে ঘিরে তিন দিন মেলা বসে অগ্রদ্বীপে বারুণীর সময়ে। যাকে বলে আম-বারুণী। আমি কতবার গেছি দোকানের সঙ্গে।’
: আম-বারুণী কোন সময়ে হয়?
: আজ্ঞে ওই মধুকৃষ্ণাতিথি। তার মানে গৌরাঙ্গের খেলায় যাকে বলে বসন্তকাল। অর্থাৎ যাকে বলে চৈত্র মাসের কৃষ্ণাতিথির একাদশীতে মেলা শুরু।
: কেমন করে যেতে হয়?
: নবদ্বীপধাম স্টেশন থেকে রেলে চেপে কাটোয়ার দিকে যেতে হবে। কাটোয়ার আগের স্টেশন দাঁইহাট। তার আগের স্টেশন অগ্রদ্বীপ। স্টেশন থেকে পুব দিকে মাইল দুই গেলে গঙ্গা। গঙ্গা পেরোলে গোপীনাথের মন্দির। তা গৌরাঙ্গের খেলায় একটু পথশ্রম আছে। তিনি ভক্তকে একটু বাজিয়ে নেন বইকী। তবু যাবেন।
যাবার আগে একটু তথ্যসংগ্রহ করে নেওয়া আমার রীতি। ১৯১০ সালে বেরোনো পিটারসন সাহেবের লেখা বর্ধমান জেলা গেজেটিয়ারের লেখাটুকু বড় নিষ্প্রাণ:
Agradwip is a famous place of pilgrimage and contains a temple of Gopinath at which some ten thousand pilgrims gather every April.
এর চেয়ে একটু সজীব বর্ণনা জোটে বিজয়রামের লেখা ‘তীর্থমঙ্গল’ কাব্যে। ১১৭১ বঙ্গাব্দে, তার মানে দুশো বছরেরও আগে, ভূকৈলাসের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষালের বাবা কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষালের সঙ্গে তীর্থভ্রমণ করছিলেন বিজয়রাম। সেই সময় ত্রিস্থলী থেকে ফেরার পথে তাঁরা অগ্রদ্বীপে নামেন। গোপীনাথের মন্দির দেখে তাঁদের মন ভরে যায়। বিজয়রাম লেখেন:
অগ্রদ্বীপে আসি হৈল উপস্থিত।
সেইখানে গোপীনাথ ঠাকুরের ঘর।
অপূর্ব নির্মাণবাটি দেখিতে সুন্দর ॥
ইতিহাস বলছে, অগ্রদ্বীপের মূল মন্দির এখন গঙ্গাগর্ভে। এখনকার মন্দিরটি তৈরি করে দেন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। তার মানে বিজয়রাম যে অপূর্ব নির্মাণ বাটি দেখেছিলেন সেটি কৃষ্ণচন্দ্রের তৈরি।
কিন্তু নদীয়ারাজা কৃষ্ণচন্দ্র খামোখা বর্ধমান জেলার এই মন্দিরটি বানালেন কেন? এ প্রশ্নের ফুঁপি থেকে উঠে আসে আরেক মজার কাহিনী। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাবা রাজা রঘুরামের আমলে একবার অগ্রদ্বীপের মেলায় হয়েছিল প্রচণ্ড দাঙ্গাহাঙ্গামা। দু-চার জন মারাও গিয়েছিল। খবর পেয়ে নবাব আলীবর্দীর প্রতিনিধি তখন মুর্শিদাবাদে ডেকে পাঠালেন বর্ধমানরাজ, নদীয়ারাজ আর পাটুলীর জমিদারকে। যে যার প্রতিনিধি পাঠালেন। দারুণ রেগে নবাবের পক্ষ প্রথমেই জানতে চাইলে অগ্রদ্বীপ কার এক্তিয়ারে? ভয়ের চোটে বর্ধমান আর পাটুলীর লোক মুখে কুলুপ আঁটল। সেই সুযোগে নদীয়ার ধূর্ত প্রতিনিধি বললে, ‘অগ্রদ্বীপ নদীয়া রাজেরই এক্তিয়ারে। এবারে নানা কারণে গাফিলতি হয়ে গেছে। আর কখনও এমন হাঙ্গামা হবে না হুজুর।’
