সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়াই। অভিবাদন করি।
সূর্য পাটে বসেছে। রাগরক্তিম মাঠপুকুর গ্রাম থেকে এবার বিদায়লগ্ন। শেষবারের মতো বেনোয়ারি ফকিরকে বিনতি জানিয়ে বলি, ‘চলে যাচ্ছি এবার। আবার কবে আসব জানি না। শেষ কথাটা বলুন আপনার। কী পেলেন? কী বুঝলেন? মনের মধ্যে কোন কথাটা ভরে নিয়ে বাড়ি ফিরব?’
যেন ফেরেশ্তার মতো মহামহিমাময় উঠে দাঁড়িয়ে বেনোয়ারি বললেন, ‘তাঁকে জানা যায় না এইটে জানাই চরম জানা। চিরপবিত্র আল্লাহ্ তাঁর কাছে পৌঁছোবার রাস্তাটাই তাঁর তৈরি মানুষের সামনে খোলা রাখেননি। একটা রাস্তাই খোলা আছে শুধু—সেটা হচ্ছে তাঁকে জানা যায় না এই কথাটা জানার পথ।’
অনেকটা রাস্তা গিয়ে, প্রায় মাঠপুকুর গ্রামের প্রান্তে পৌঁছে, একবার ফিরে তাকালাম জলিলের বাড়ির দিকে। দিগন্তবিসারী ধানক্ষেত পেরিয়ে একটা কুঁড়েঘর। তার সামনে দুটো মানুষের স্পষ্ট সিল্যুয়েট।
* নজর রাখতেন, কারণ তাঁরা জানতেন যারা হিন্দুধর্মের ক্রিয়াকাণ্ড ত্যাগ করে জাতিবর্ণহীন কর্তাভজা হয়েছে তাদেরই পরে খ্রিস্টান বানানো সহজ হবে। ১৮৯৯ সালে লন্ডন থেকে ছাপা Eugena Stock তাঁর The History of the Church Missionary Society, its Environment, its men and its work বইয়ের প্রথম খণ্ডে দিয়েছেন কর্তাভজাদের গ্রামকে গ্রাম খ্রিস্টধর্মগ্রহণের বৃত্তান্ত। সময় ১৮৩৯ সালের আশেপাশে। উৎসাহী পাঠক পড়ে নিন ‘সাহেবধনী সম্প্রদায় তাদের গান’সুধীর চক্রবর্তী, পুস্তক বিপণি, কলিকাতা, ১৯৮৫ বইয়ের ২৬-২৭ পৃষ্ঠা।
* এ কথার শাস্ত্রীয় অর্থ: নিশ্চয় তোমাদের দোষগোপনকারী প্রভুকে দেখতে পাবে (কেয়ামতের দিন) যেমন এই চাঁদকে দেখতে পাচ্ছ। [ লেখক ]
* উৎসাহী পাঠক পড়ে নিন ‘বাউল মতবাদ ও ইসলাম’ বইয়ের ‘বাউল সাধনার পদ্ধতি ও ইসলামী শরিয়ত’ অধ্যায়। লেখক এ এইচ এম, ইমামদ্দিন। বাংলাদেশ। ১৯৬৯
* জাকাত বলতে বোঝায় আয়ার পবিত্রতা সাধন করা, ধুয়ে মুছে সাফ করবার ক্রিয়া।
১.৩ পৃথক, আর এক স্পষ্ট জগতের অধিবাসী
যারা দেহাত্মবাদী সহজিয়া তাদের সাধনার স্থূল কথা হল মানুষভজন। তারা কথায় কথায় বলে ‘মানুষ ধরা’। প্রশ্ন হল কোন মানুষকে ধরা যায়, কেই বা যথার্থ মানুষ? তারা রহস্য করে বলে মানুষের আবার বাছাবাছি কী? সব মানুষই সমান। কার মধ্যে যে কখন কী পাওয়া যাবে তা নাকি আগে থেকে বলা যায় না। কথাটার একটা লৌকিক উপমা দিয়েছিল, জেহান বলে এক দরবেশ। পরনে তার এক বর্ণরঙিন আলখাল্লা, মাথায় এক অদ্ভুত টুপি। গলায় একগাছা পাথর আর কী সবের মালা। হাতে খেলকা, করোয়া কিস্তি আর চিমটে। চোখদুটি নিমীলিত করে সে ধ্যানস্থ ছিল কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়ার লালন ফকিরের মাজারে। সন্ধে হয়ে আসছে তখন। মাজার শরীফের বড় বড় থাম আর গম্বুজ-ঘেরা সৌধ ভেদ করে শেষ সূর্যের একটা দ্যুতিহীন আলো সমস্ত এবাদতখানায় এক আধোছায়ার ম্লানতা এনেছিল। আলো কমে এলে যেমন রঙিন পাখির রং মরে আসে তেমনই জেহান দরবেশের আলখাল্লা আর কণ্ঠ-মালার বহুবর্ণদ্যুতি এক মলিন সিল্যুয়েটে জেল্লা হারাচ্ছিল ক্রমশ। ধীরে নেমে আসছিল শীত সন্ধ্যার কালিমা। সেই সময় জেহান দরবেশ তার আশ্চর্য লৌকিক চিন্তার মৌলিক উদ্ভাবন থেকে বলেছিল, ‘সুতোর ফুঁপি দেখেছেন তো? সেই রকম সব জিনিসের ফুঁপি থাকে। কোনও জিনিস ফুরোয় না। টান দিলেই পরেরটুকু এসে যায়। তেমনই মানুষ। কার টানে যে কোন মানুষের খবর আসে কে বলতে পারে?’
ভাবলে এখন অবাক লাগে যে দরবেশের কথার প্রমাণ মিলল কত দিন পরে গাইঘাটা থানার মোড়লডাঙার পৌষসংক্রান্তির মেলায়। সেখানে ঘুরতে ঘুরতে বেশ চন্মনে খিদে পেয়েছে। দেখি একটা বিরাট মিষ্টির দোকানে গরম গরম ঢাকাই পরোটা আর অমৃতি জিলিপি ভাজা হচ্ছে। টেম্পোরারি দোকান। নড়বড়ে হাইবেঞ্চ আর কাঠের চেয়ার। টিনের গেলাসে জল আর পদ্মপাতায় করে খাবার দেওয়ার চল। আমার নাক-বরাবর বিরাট উনুনের সামনে বসে মোটা মার্কিনের ন্যাকড়া টিপে টিপে অদ্ভুত শিল্প গড়ছিল অমৃতি জিলিপির কারিগর। মাঝবয়সী মানুষ, গালে পাঁচ-ছ দিনের না-কাটা পাকা দাড়ির কদমফুল। মানুষটা যে রকম একাগ্র নিষ্ঠায় জিলিপির প্যাঁচ বানাচ্ছিল তাই দেখেই কথা বলতে ইচ্ছে হল। ব্যাস, বেরিয়ে পড়ল ফুঁপি। হরিণঘাটার নগর উখরা গ্রামে থাকে এই মন্মথ অধিকারী। ভেকধারী বোস্টম। বাড়িতে পরিবার বলতে বিধবা এক বোন আর তিন ছেলেমেয়ে। ‘বিয়ে-থাওয়া করিনি বাবু, বর্ষার কালটা বাদ দিলে সম্বৎসর মেলা থেকে মেলা এই কাজে ঘুরি। মানুষজন দেখি। বেশ কেটে যায়। আর বর্ষার সময় হরিণঘাটার আশপাশে হালুইকরের কাজ করি। বিয়ে পৈতে শ্রাদ্ধ যা জোটে। এখন আবার নতুন দুটো ভোজকাজ হয়েছে, আপনাদের ওই যাকে বলে, বিবাহবার্ষিকী আর জন্মদিন। এইসব করে টেনেটুনে চলে যায়।’
এই হল, যাকে বলে, খাঁটি প্যারাম্বুলেটিং ট্রেড। একটা থোক মূলধন জোগাড় করে জনকয়েক কর্মচারী, বাসন-কোসন, বেঞ্চি-চেয়ার, বাঁশ আর ত্রিপল নিয়ে কেবলই ঘোরাঘুরি। এক মেলা থেকে আরেক মেলা। সব চান্দ্রমাসের হিসেবে। মালিক বরিশাল থেকে আসা যোগেশচন্দ্র দেবনাথ। ফতুয়া পরা ষাট-বয়সী, ঝানু আর ধূর্ত। জিজ্ঞেস করতেই ঝটিতি মেলার নামাবলী পেশ করলেন, ‘প্রথমে ধরেন এই গাইঘাটার পৌষসংক্রান্তি মেলা। চলবে একমাস। সেখান থেকে মাঘী পূর্ণিমায় স্বরূপনগর থানায় দেওরার মেলা বা যমুনার মেলা। সেখান থেকে ঠাকুরনগরে চৈত্র একাদশীতে বারুণীর মেলা। সেখান থেকে গাইঘাটা থানার জলেশ্বরে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা। এইভাবে চলতে চলতে শেষ হবে বানপুর মাটিয়ারিতে অম্বুবাচীর মেলা আষাঢ় মাসে। বর্ষার দুমাস বাদ দিয়ে আবার আশ্বিন থেকে শুরু হবে সিজন।’
