জলিল বলল, ‘সমস্যা কীসের? হজরত মোহম্মদ তো ঠিকই করেছেন। নিজের জন্যে খারাপটা রেখে ভালটা দান করেছেন।’
: আরে ব্যাপারটা আমি আগে বুঝিনি। আমি যৌবনে যখন মোহম্মদ শাহর কাছে সুফিমতে কলমা সাবেদ (দীক্ষা) নিই তখন এই গল্পটা একদিন ওঠে। গল্পের শেষে মোহম্মদ শাহ বললেন, হজরত মোহম্মদ ওই যে জহরটা নিজে নিলেন, তাতে পরে শিষ্যরা বলেছিল, তিনি নিজে কষ্টটা নিলেন আর আমাদের দিলেন আনন্দ। সেটা কি ঠিক হল? কষ্ট করতে যে আমাদেরও ইচ্ছে হয়। হজরত আমাদের কষ্ট পাওয়া থেকে বঞ্চিত করলেন। কষ্ট না করলে কি আল্লাতালাকে কোনওদিন পাওয়া যায়? এ ব্যাখ্যা মহম্মদ শাহ-র কাছে শুনে আমি তো অবাক। সেই থেকে বুঝলাম কাকে বলে আত্মসুখ। নিজে কষ্ট পাওয়াও একটা বড় সুখ। আল্লার এ কি তাজ্জব বন্দোবস্ত।
আমি বললাম, ‘চমৎকার এই কাহিনী। আত্মসুখের সংজ্ঞাটাও বেশ নতুন। তা হলে বোঝা গেল বাতুনী জাকাতের মানে হল নিজের প্রিয় বস্তু দান করা। কিন্তু জাহেরী জাকাত মানে কী?
: জাহেরী মানে আমরা বলি চল্লিশ ভাগের এক ভাগ দান। দেখবেন জুম্মার নামাজের পর মসজিদের বাইরে সার-দিয়ে-বসে-থাকা গরিব দুঃখী অনাথ আতুরকে ভক্ত মুসলমানরা দান খয়রাত করছে। সে তো খুব ভাল কাজ। কিন্তু শুধু দান করলেই হবে না। আসলে জাহেরী জাকাতের একটা অন্য মানে আছে। আমরা বলি, আল্লা আমাদের দেহভাণ্ডারে চল্লিশগঞ্জ মালসহ আমাদের পয়দা করেছেন। মুর্শিদ ধরে, মুরিদ ধরে, নিজের খাস মহব্বতের যে মাল আমাদের শরীরে আছে তার চল্লিশ ভাগের এক ভাগ আল্লার রাহে জাকাত দাও।
আমি বেনোয়ারি ফকিরের কথা শুনে বুঝলাম ধর্মের ব্যাখ্যায় একটা সমান্তরাল চিন্তা লোকধর্ম সর্বদাই করে চলে। শাস্ত্ৰ আপ্তবাক্য পুরোহিতের নির্দেশের বাইরে একটা ব্রাত্য কিন্তু বলিষ্ঠ জীবনভাবনা লোকধর্মের মর্মমূলে প্রাণসঞ্চার করে। আন্দাজি কথাবার্তার অন্তঃসারশূন্যতা তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সঠিক পথটা ধরতে চায়। এ পথে বহু মানুষকে আকৃষ্ট করা যায় না। কিন্তু যে কজন এতে আসে তারা বুঝে শুনে যাচাই করে আসে। আর তারা টলে না। ‘আপনাকে আপনি ভুলে পশ্চিম তরফ খাড়া হলে’-ই যে নামাজ হয় না দুদ্দু শাহ-র এই কথা গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষকে কিছুতেই বোঝানো যাবে না। ‘না দেখে রূপ করে সেজদা, অন্ধ তারে কয়’ দুদ্দুর এই কথাটা প্রকাশ্যে বললে লাঠি পড়বে মাথায়। বেনোয়ারিদের গহন পথ তাই কয়েক শতাব্দী ধরে হৃদয়বান মানুষের বোধ আর মুক্তবুদ্ধির দ্বারে মিশতে চায়। প্রতিহত হয় বারে বারে। অপমান নামে। আঘাত আসে। ক্লান্ত তবু ক্লান্তিহীন সেই মানবিক যাত্রা। সত্যিই এ পথ বড় নির্জন। আজকের এই মাঠপুকুর গ্রামের দুপুরের মতো। সমস্ত গ্রামটা যেন ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে আছে। কেবল একটা দুটো ঘু ঘু ডাকছে।
বিশ্রাম আধোনিদ্রা অনুচিন্তা আর টুকরো ভাবনায় কেটে গেল একটা পুরো দিন। পাশের ঘরে বেনোয়ারি তাঁর বিশ্রামের শেষে আমার দাওয়ায় এসে বসলেন। প্রশান্ত ধ্যানমৌন আনন। চোখ দুটির দৃষ্টি যেন অন্তর্ভেদী। বোঝা যায় কী একটা অন্তঃশীল মনের ক্রিয়া চলছে। ফকিরিতত্ত্বের খুব গূঢ় অন্তঃপুরে নাকি সুফিচিন্তাধারা মিশে আছে। সাতগেছিয়ার জাহান ফকির আমাকে একবার বলেছিল, ‘যে আল্লাহ আমাদের সৃজন পালন ধ্বংস করেন তার তত্ত্ব বা সত্য অনুসন্ধানই সুফিদের প্রধান কাজ।’ এই মুহূর্তে বেনোয়ারি কি সেই চিন্তায় অন্তর্মগ্ন? নইলে দৃষ্টি কেন এত সুদূর?
আমি জলিলকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার গুরু যেন এ জগতেই নেই। কীসের ধ্যান করছেন?’
জলিল খুব নিচু স্বরে আমাকে বলল, ‘বাবা রোজায় রয়েছেন তো। এটা যে রমজান মাস।’
চমকে গেলাম একেবারে। এত সব কথাবার্তা, শরিয়ত নিয়ে বাহাস আর শেষকালে রোজা? তা ছাড়া এ কেমন রোজা? এই তো দুপুরে আমার সঙ্গে ভাত খেলেন দিব্যি। তা হলে? মনটা খুব সংশয়ী হয়ে ওঠে। খানিক পরে বিরাট এক রেচক বায়ু ত্যাগ করে জিকির দিয়ে বেনোয়ারি জপ শেষ করে আমার দিকে সপ্রশ্ন তাকালেন। অর্থাৎ ভাবটা যেন, আপনার কি কোনও বিশেষ জিজ্ঞাসা আছে? জিজ্ঞাসা তো আছেই তবে আপাতত কাদেরিয়া ফকিরদের দমের প্রক্রিয়া দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। সেটা কাটিয়ে উঠে একটু পরে বললাম, ‘আপনি রোজায় বিশ্বাসী?’
প্রসন্ন হেসে বেনোয়ারি বললেন, ‘কলমা-রোজা-হজ-জাকাত-নামাজ সবেতেই আমার বিশ্বাস কিন্তু তার আচরণ আলাদা। আমাদের কাজ ভেতরে ভেতরে। আমাদের অন্দরের মণিকোঠায় আল্লার বারামখানা। সেখানে যাওয়াই আমার হজ, সেখানে আমার বিশ্বাসই কলমা, সেখানে আমার সর্বদা চলছে বাতেনী নামাজ সেখানে আমার নফ্স্কে জাকাত দিয়েছি, সেখানে আমার রোজার ছিয়াম।’
: ছিয়াম মানে কি উপবাস?
উপবাসের সঙ্গে সংযম। নফ্স্কে শাসনে রাখাই রোজা। দিনে উপোস রাতে খাওয়া ও তো বাদুড়ের ধর্ম। মুখে রোজা রেখে অন্তরে কাম সেটা রোজা নয়। কিছু খেলাম না অথচ একজনকে চড় মারলাম তাতে হাতের রোজা নষ্ট। সারাদিন উপোস দিলাম অথচ মনে রইল হিংসা অসূয়া দ্বেষ তা হলে মনের রোজা নষ্ট। রোজা মানে আমরা বলি আত্মশাসন।
স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষটির দিকে বিস্ময়ে চেয়ে থাকি। যেন চেতনার প্রজ্ঞার কোনও জটিল উৎস থেকে উঠে আসছে কথাগুলো। যেন আল্লার সেই আর্তি ফকিরের মুখে, যার ভাষ্য হল, ‘আমি তোমাতে আছি, তুমি কই আমাকে তো দেখছ না?’ মানুষটা আমারই পাশে বসে কিন্তু মনে হচ্ছে যেন অনেক দূরে। কী আশ্চর্য, এই কি সেই পাখিপোষা মায়ালি মানুষটা? ধ্যানের অন্তর্নিবিষ্টতার এতটা শক্তি? একেই বোধহয় বলে সিদ্ধাবস্থা। জলিল কানে কানে গাঢ় স্বরে বলল, ‘বাবু, এনার শরিয়ত হাসিল হয়ে গেছে। উনি এখন মারফতের পাকা রাস্তার সোজা সরানে উঠে পড়েছেন। ওঁকে সেজদা দিন।’
