জলিলের বাড়ি নিতান্ত গরিবগুরবোর কুঁড়ে। তবে সেবাধর্মের আন্তরিকতার ত্রুটি নেই। এই বসাচ্ছে, এই পাখার বাতাস করছে, এই ঠাণ্ডা জল তালশাঁস দিচ্ছে, সঙ্গে গুড়।
বেনোয়ারি বলেন, ‘গরিবদের বাহ্য চমকটা নেই তো, তাই ভগবান ওখানে আটকে থাকেন। আর ধনীর ঘরে নানা জেল্লা কারদানি আর কেরামতি। তার ফাঁক দিয়ে ভগবান কেটে পড়েন। এ নিয়ে কত বাহাস হয় আমার সঙ্গে আলেমদের। যেমন ধরুন এই হজ। হজ কি গরিবদের সাধ্য? সেইজন্যে আমাদের একটা গানে বলে—
এখানে না দিদার (দর্শন) হলে
সেখানে পাবে না গেলে।
হজ করিতে মন তুই যাবি কোন্ কাবায়?
হজের ঠিকানা না জেনে
দৌড়াদৌড়ি যাস্ কোথায়?
হজ মানে কী জানেন? মনকে বাইরে থেকে টেনে এনে অন্দরে বসানো। জলিল, তুমি বাবুকে সেই প্রকৃত হজের গল্পটা বলো তো।’
জলিল বলল, ‘একজন অবিবাহিত সৎ ধর্মভীরু মুসলমান ঠিক করল তার গ্রামের কজনের সঙ্গে হজ করতে যাবে মক্কায়। যেতে তো অনেক টাকা লাগে। তা আল্লার কৃপায় সে টাকা জোগাড় হল। যাবার আগে ভাবল শহরে গিয়ে প্রাণের দোস্তকে একবার দেখে আসি। কী জানি হজ করে ফিরতে পারব কি না। পৃথিবীতে তার মায়ার টান বলতে ছিল সেই বন্ধুর ওপর। বন্ধুর বাড়ি গিয়ে দেখে বন্ধু ক’মাস আগে মারা গেছে। চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়ে বন্ধুর বউ অভাবে পড়ে নাকানি চুবানি খাচ্ছে। টাকা পয়সার অভাবে হাঁড়ি চড়ে না এমন অবস্থা। কিন্তু হঠাৎ বাড়ির রসুইখানা থেকে মাংস-রান্নার গন্ধ লাগল তার নাকে। সে ভাবল, তবে কি বন্ধুর অভাবের কথা বানিয়ে বলল? অভাবী মানুষ মাংস রাঁধে কী করে? খোঁজ করতে বন্ধুর বউ বলল কাঁদতে কাঁদতে, তিনদিন ধরে ছেলেমেয়েদের কিছু খেতে দিতে না পেরে আজ গো-ভাগাড় থেকে মরা গোরুর রাং এনে পাক করছে। সেকি? আমার বন্ধুর বউ মরা গোরু বেঁধে খাচ্ছে গো-ভাগাড় থেকে এনে আর আমি যাব অনেক টাকা খরচ করে মক্কা? ছিঃ। মাথায় থাক আমার হজ। বাঁচলে কত হজ হবে। এই ভেবে তার সব টাকা তাদের দিয়ে গ্রামে ফিরে হজ যাত্রীদের বলল এবারে তার কোনও কারণে হজ হল না। ইনসাল্লা আসছে বছর যাবে।
‘এদিকে তার গ্রামের সেই মানুষগুলো তো হজে গেল। সেখানে গিয়ে সব জায়গাতেই সেই মানুষটাকে দ্যাখে আর ভাবে, কেমন হল? সে যে আসবে না বলল? তবে কি অন্য দলের সঙ্গে এল? ফিরে এসে খবর নিয়ে জানল লোকটা সত্যি সত্যিই হজে যায়নি। তারা তখন তার কাছে গিয়ে বলল, ভাই তোমারই সত্যিকারের হজ হয়েছে, আমাদের হয়নি।’
বেনোয়ারি বললেন, ‘এই হল হজের সত্যিকারের মর্ম। আন্তরিকভাবে খোদার কাজ করলে তবে হজ হাসিল হয়। ওই যে গরিবের পাশে দাঁড়ানো, ওই যে মানুষের দুঃখ ঘোচানো, যে তা করে সেই ন্যায্য হাজী। এই গোলমালটা আমাদের জাকাত নিয়েও হয়। জাকাত মানে দান। কিন্তু বেশির ভাগ মুসলমান জাকাতে জাঁক করে বেশি। আরে, আল্লা তোমাকে দিয়েছেন তাই তো তুমি দিচ্ছ। তা হলে তোমার অত জাঁক কীসের? নিজেকে দাও তাঁর সেবায়।’
আমি বললাম, ‘কট্টর ইসলামি নীতিনির্দেশ আর আপনাদের মারফতি চিন্তা দুয়ের মূলে কোনও বিরোধ নেই যা বুঝলাম। বিরোধ শুধু ব্যাখ্যায় আর আচরণে, তাই নয়?’
: ঠিক তাই। তবে আমাদের চোখে আগে মানুষ আর তার মনের ময়লা মোচানো। এই জাকাতের ব্যাখাই ধরুন। জাকাত* দুরকম—‘বাতুনী’ আর ‘জাহেরী’। বাতুন মানে গোপন। নিজের প্রিয় বস্তু আল্লার রাহে জাকাত দিতে হবে। নিজের প্রিয় বস্তু কি বলুন তো?
: তার কি কিছু ঠিক আছে? এক এক জনের এক এক রকম। যেমন ধরুন আমাদের হিন্দুদের একটা সংস্কার আছে যে কাশী পুরী হরিদ্বার পুষ্কর এ সব তীর্থে গেলে নিজের কোনও লাভের জিনিস গঙ্গা বা সমুদ্রে ফেলে আসতে হয়। কেউ ফেলল আম, কেউ ফেলল কলা। সারা জীবন আর সে জিনিস খাবে না। অবশ্য এ নিয়ে মজার কথাও শুনেছি। যেমন একজন তেঁতুল বা আমড়ার টক সহ্য করতে পারত না। সে কাশীর গঙ্গায় তেঁতুল আর আমড়া ফেলে এসে বললে, ‘বাবা বাঁচলাম।’ আমাদের হিন্দুধর্মে এই এক সমস্যা। তাতে গাম্ভীর্য কম। ধর্ম নিয়েও আমাদের মজা করা স্বভাব। আসলে এগুলো তো ধর্মপালন নয়, কতকগুলো আচার পালন। আমাদের কোনও আচার জোর করে চাপালেই তা নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ হবেই। সেইজন্যে আমাদের সব বাড়ির অন্দরে সর্বদা খটাখটি। মেয়েরা বলে এইটা করতে হয়, আমরা বলি তা হলে করব না। কিন্তু আপনার জবাবটা বোধহয় ঠিক দিতে পারিনি। সত্যি সত্যি আমাদের প্রিয় বস্তু কী বলুন তো?
: আমাদের স্বসুখ বাসনা। যাকে বলে আত্মসুখ। বিচার করে দেখবেন আমরা যাই করি তার মূলে আত্মসুখ। একজন ভিখিরিকে যদি একটা পয়সাও দিই তাতেও আত্মসুখ থাকে। লোভ, ভোগ, কাম, ঐশ্বর্য এ সব তো স্বসুখ বাসনা বটেই, এমনকী ত্যাগও একটা সুখ। স্বসুখ ত্যাগ খুব কঠিন। সেইজন্যে বলেছে—
থাকিলে স্বসুখ বাসনা
রাগের উদ্দীপন হবে না।
আবার বলছি সবরকম স্বসুখ বর্জন করা খুব কঠিন। কেন না কেউ কেউ কষ্টভোগ করেও সুখ পায়। এমনকী বৈরাগ্যেও আত্মসুখ থাকতে পারে। অর্থাৎ দ্যাখো, আমি কেমন সব ত্যাগ করেছি। এ নিয়ে একটা গল্প আছে খুব চমৎকার। শুনবেন?
: সব কিছু শুনব বলেই তো আসা।
মৌজ করে বেনোয়ারি বললেন, ‘তা হলে শুনুন। জলিলও শোন। এ কিস্যা তোকে আগে বলিনি। একবার হজরত মোহম্মদ ধ্যানে বসেছেন। বহুক্ষণ ধ্যানের শেষে, আল্লাতালা তাঁকে তিনটে বস্তু দিলেন—জহর, মধু আর আতর। জহর মানে বিষ, সাংঘাতিক বিষ। তো তিনি শিষ্যদের বললেন, ‘এই নাও আল্লাতালা তোমাদের জন্যে পাঠিয়েছেন মধু আর আতর। খাও মধু প্রাণ ভরে, আর আতরের খোশবু তোমাদের জীবন মাত করে দিক।’ কিন্তু তিনি নিজের জন্যে রাখলেন জহর। সেইটাই তো ঠিক। কিন্তু তাতেও সমস্যা।’
