বেনোয়ারি হাসেন। বলেন, ‘আপনি একেবারে মোক্ষম জায়গাটা ধরেছেন। হয়, মাঝে মাঝে মন কষাকষি হয়। তবে আমরা তো কাউকে যেচে আনছি না আমাদের পথে। তা ছাড়া বাহ্য আচরণে সবাইকে বলি ‘নামাজ পড়ো’ ‘মসজিদে যাও’। আসলে আমরা নিজেদের মতো গ্রামের একটি টেরে পড়ে আছি। কাউকে ঝামেলায় ফেলি না। গান বাজনা করি। দল বেঁধে সবাই শুনতেও আসে।’
: কিন্তু বিয়ে থা? সমাজ?
: অসুবিধে নেই। আমাদের ঘরে অনেক মুসলমানই মেয়ে দিতে চায়। গরজ করেই দেয়। কেন বলুন তো?
: কেন?
: তালাকের ভয় নেই। ফকিরদের সন্তান হয় শান্তিপ্রিয়। তালাক তো ধর্মীয় অত্যাচার। আমরা ঘৃণা করি তালাক প্রথাকে। আমরা মানুষ ভজি। তা হলে মানুষের অপমান কেমন করে করি?
: আর আপনাদের ঘরের মেয়েদের মুসলমান সমাজ বউ করতে চায়?
: যেচে নেয়। দেখেননি আমার পাখিকে? ওর কি বিয়ের বয়স হয়েছে? জোর করে মেগে নিয়ে গেল আমার এক শিষ্যের জ্যাঠা। সে অথচ খানদানি মুসলমান, পঞ্জবেনা মেনে চলে রীতিমতো।
‘পঞ্জবেনা আবার কী?’ আমি বলি। ‘পাঁচ ছশো বছর মুসলমানদের পাশাপাশি বাস করেও তাদের অনেক কিছুই জানলাম না, শিখলাম না। এমনকী জানতে চাইলামও না। এর কারণ কী?’
: আপনাদের নাক সিঁটকানো আর আমাদের রক্ষণশীলতা দুটোই দায়ী। যাই হোক, পঞ্জবেনা সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। পঞ্জবেনা হল শরিয়তি মতে খাঁটি মুসলমানের জীবনে পাঁচটি অবশ্যকৃত্য। একেই বলে আরকানে ইসলাম।
: কী কী?
: কল্মা, রোজা, হজ, জাকাত আর নামাজ।* এর নানান খুঁটিনাটিও আছে অবশ্য।
: যেমন?
: যেমন মূলে নামাজ দু রকম। জাহেরা নামাজ আর বাতুনে নামাজ। বাতুনে নামাজের কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। সর্বদাই সে নামাজ চলে, শয়নে স্বপনে সর্বত্র। আর জাহেরা নামাজ পড়তে হয় পাঁচবার বা পাঁচরোক্ত। পাঁচবারের নাম আর সময় আলাদা আলাদা। শুনবেন?
: বলুন। কিছুই তো জানি না। শুধু খানিকটা বাজে লেখাপড়া শিখেছি। এখুনি আপনাকে বলে দিতে পারি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কতখানি সাংবিধানিক ক্ষমতা, মারাদোনার হাঁড়ির খবর কিংবা বিশ্বব্যাঙ্কের কাছে ভারতের ঋণ কত। অথচ…
‘বেশ বলেছেন’ ফকির বলেন। ‘যে কথা জানতে চাইছিলেন। খুব ভোরবেলা যে-নামাজ তাকে বলে “ফজর”। বেলা বারোটা-একটা নাগাদ যে-নামাজ তার নাম “জোহর”। “আসর” হল বেলা তিনটে-চারটে নাগাদ যে-নামাজ। সন্ধেবেলার নামাজকে বলে “মগরেব”। আর রাতের নামাজ “এয়েসা”। কী মনে থাকবে? লিখে নিন। আর সেইসঙ্গে এই কথাটা মানে লালনের এই কথাটাও লিখে নিন যে—
পাঁচরোক্ত নামাজ পড়ে
শরা ধরে কে পায় তারে?’
: তার মানে আপনি বলতে চান নামাজ বাজে? তার কোনও মূল্য নেই?
‘তা বলি না’ বেনোয়ারি ব্যাখ্যা করে বোঝান, ‘আমরা বলতে চাই লোকদেখানো নামাজ দিয়ে কী হবে? মসজিদে গেলেই কি ধর্ম? আসল নামাজ তো মনে। তার চেয়েও বড় কথা হল কার নামাজ? তাঁকে কি জানি? অন্যায় পাপ চুরি করে তারপরে নামাজ পড়া চলে কি? আল্লা বলছেন, আমি তোমাতে আছি তুমি কই আমাকে দেখছ না? অফি আন ফোসেকুম আফালা তোফসেরূন।’
‘বুঝলাম যে আপনাদের ধর্মসাধনা অনেকটা সহজিয়াদের “বর্তমান” সাধনার মতো’ আমি বেনোয়ারিকে বোঝাতে চাইলাম। ‘ওরাও বলে অনুমানে ধর্ম হয় না। কোথাকার কৃষ্ণ রাধা মথুরা বৃন্দাবন—চোখেই দেখিনি কোনওদিন। তার চেয়ে অনেক চাক্ষুষ হল মানুষ, তাকে ধরো। তার মধ্যেই খুঁজে নাও মথুরা বৃন্দাবন রাধাকৃষ্ণ। আপনাদেরও তেমনই মনে হচ্ছে।’
: হ্যাঁ অনেকটা তাই। তবে শরিয়তের সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে তফাত এইখানে যে ওটা আচরণগত আর আমাদের উপলব্ধি। ওদের বাহ্যধর্ম আমাদের অন্তরধর্ম। জলিলকে দেখেছেন তো? সাধারণ মূর্খ কিষাণ, অবসরে ঘরামির কাজ করে। ও যখন কুড়ি বছর আগে আমার কাছে দীক্ষা শিক্ষা নেয় তখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘শরিয়তি ধর্মে মন ভরল না তোমার?’ ও বলল, ‘গুরু, ওই আন্দাজি ধর্মে আমার মন ভরল না, আমি মানুষ ধরে সাধন করতে চাই।’তখন দীক্ষা দিলাম।
: তবে কি শরিয়ত ভুল?
: কে বলল ভুল? শরিয়ত কায়েম না হলে কি মারফত হয়? লালন ফকির একবার বাহাসে কী বলেছিলেন জানেন? বলেছিলেন—
শরিয়ত ঘরের সিঁড়ি
ঘর মারফৎ।
চড়িয়া সিঁড়ির পরে
খাড়া থাকি যদি
না হেঁটে কেমনে ঘরে যাই বলো দেখি?
শরিয়ত হইলে হাসিল মারফতে যাবো।
কী বুঝলেন? আমরা কি শরিয়ত বিরোধী?
:না। বুঝলাম মারফত হল শরিয়তকে এড়িয়ে যাওয়া নয়, পেরিয়ে যাবার ধর্ম। শরিয়ত না হলে মারফত হয় না। কিন্তু মারফত হলে আর শরিয়তে ফেরে যায় না। ঠিক বুঝেছি কি?
: একদম স্পষ্ট বুঝেছেন। শরিয়ত আর মারফত যেন দুধ আর মাখন। দুটোই মিলেমিশে আছে। কিন্তু মাখন বার করে নিলে ঘোল পড়ে থাকে। তাতে আর কাজ কী? সেইজন্যেই বলা হয়েছে—
মারফতের পথিক যারা
শরার কেতাব নেয় না তারা।
তা হলে আমাদের হজ রোজা জাকাত নামাজ কী হবে আর? আমরা অনেক ভেতরে চলে গেছি। আর তো লোক দেখানো কাজ করতে পারি না। তাই আমরা দেল-কেতাব পড়ি। খুঁজি সেই মনের মানুষ। যাকে পেলে আর কিছু চাইতে হয় না। থাকে শুধু হকিকত অর্থাৎ হকের পথে চলা। আর তরিকত অর্থাৎ বিচার। কীসের বিচার? না আমি কী করেছি, আমি কী করছি। তাকেই বলে দরবেশ যে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন।
ক্ষণিকের বিরতি ঘটল। কেননা জলিল এসেছে আমাদের নিতে। আজ তার বাড়িতে আমাদের দুপুরের খাওয়া দাওয়া।
