: নিগ্রহ মানে প্রথমে শাসানি চোখ রাঙানি, তারপরে মারধোর, একতারা বাঁয়া ভেঙে দেওয়া। সবশেষে ঝুঁটি কেটে দাড়িগোঁফ জোর করে কামিয়ে দেয়, এই আর কী। শেষেরটাই সবচেয়ে অপমান।
: কেন?
: বাউলদের ধর্মই হল সর্বকেশরক্ষা।
: কিন্তু যারা এ অত্যাচার করে তারা কারা? সাধারণ মানুষ?
: আলেমরা এ কাজ করে। এলেম মানে জ্ঞান। যারা এ কাজ করে তাদের আমি বলি বেআলেম অর্থাৎ অজ্ঞানী। এ কাজ বহুদিন থেকে হচ্ছে। কয়েকশো বছর। শুনেছি লালন ফকির বা পাঞ্জুশাহ ফকিরের সময় কুষ্টিয়া যশোর রংপুরে বাউলদের ওপর ধ্বংসের ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল। বহু লোক মার খায়, পালায়, লুকিয়ে থাকে। এ তো নতুন কিছু নয়। আমি এ সব প্রতিরোধের চেষ্টা করি। প্রতিবাদ জানাই সাধ্যমতো।
বেনোয়ারির দিকে শ্রদ্ধার চোখে তাকাই। এঁদের কথা কোনওদিন সভ্য সমাজ জানবে না। মনের মানুষ সন্ধান করতে এঁরা গভীর নির্জন পথ বেছে নেন বটে তবে মাঝে মাঝে সেই পথ ছেড়ে এঁদের বাধ্য হয়ে সন্তপ্ত অত্যাচারিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে হয়। সেটাও মনুষ্যত্বের টানে। অনেকদিন আগে ‘এক্ষণ’ পত্রিকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস কাঙাল হরিনাথের ডায়েরির কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন, একবার নাকি কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়াতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লাঠিয়ালরা প্রজাদের ওপর অত্যাচার করছিল। তাই শুনে লালন ফকির তাঁর আশ্রম থেকে ভক্তদের নিয়ে লাঠিসোঁটাসহ বেরিয়ে এসে লেঠেলদের ফিরিয়ে দেন। সেই বিবরণ পড়ে লালন ফকিরের ওপর আমার শ্রদ্ধা দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছিল। সেই রকম শ্রদ্ধা বেনোয়ারি ফকিরকে দেখে আমার মনে জাগল। লোকধর্ম তা হলে অনেকটা নৈতিক শক্তি আনে মানুষের মনে। প্রতিবাদের প্রতিরোধের। হঠাৎ মনে হল, লোকধর্মের জন্মই তো প্রতিবাদ থেকে। এ কথাও মনে হল যে, আমার ধর্ম আমাকে কোনও প্রতিবাদের শক্তি দেয়নি, প্রতিরোধের শস্ত্র দেয়নি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম: নিগ্রহের ঘটনা কেন ঘটে বলুন তো?
: মূল কারণ ধর্মান্ধতা। বেশির ভাগ মানুষ অসহিষ্ণু অজ্ঞান মূর্খ। শাস্ত্র নিয়ে লড়াই করে কিন্তু শাস্ত্রই পড়েনি। আসল ব্যাপার হল বাউল ফকিরদের বেশির ভাগ আমাদের মুসলমান সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে গজিয়ে ওঠে। সেটা বেশ কিছু মোল্লা মৌলবীরা ভাল চোখে দেখে না। এই নিয়ে শুরু। আরও ব্যাপার আছে।
: আরও ব্যাপার বলতে শরিয়তের সঙ্গে মারফতের লড়াই, তাই তো?
: খুব সংক্ষেপে তাই। আর একটা ব্যাপার হল আমাদের এই গানবাজনা করা। সেটা নাকি হারাম, নিষিদ্ধ। সেবার খুব মজা হয়েছিল। চণ্ডীপুরের মোল্লার সঙ্গে আমার বাহাস হচ্ছে ওই গান গাওয়া নিয়ে। আশপাশের দশ-পনেরোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছে। আমি আবু বক্করকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাকে বললাম, ‘বক্কর, আমাদের মুসলমান ভাইদের দুদ্দুশা’র গানটা শোনাও তো।’ সে গান ধরল:
গান করিলে যদি অপরাধ হয়
কোরান মজিদ কেন ভিন্ন এলহানে গায়।
রাগ রাগিণী সুর
রাহিনী বলিয়া মশহূর
এত আলাপন আছে নিরাপন তাতে কেন হারাম নয়।
আরবী পারসি সকল ভাষায়
গজল মরসিয়া সিদ্ধ হয়
নবীজী যখন মদিনায় যায় ‘দফ’ বাজায়ে মদীনায় নেয়।
বেহেস্তের সুর নাজায়েজ নয়
দুনিয়ায় কেন হারাম হয়
দুদ্দু কয়, শুনি কোথায় গানের ফতোয়া কোথা পায়॥
বাস্। একগানে ফৌৎ। গানের সার কথাটা হল, স্বর্গে যদি গান অবৈধ না হয় তবে মর্তে কেন গান হারাম হবে? অকাট্য গান। আর তার সঙ্গে বক্করের গলা। মৌলানার দল পালাল। হাজার হাজার লোক বলে ‘গান চলুক চোপর রাত।’ সে এক কাণ্ড বটে।
আমি বললাম, ‘গান দিয়েই তো আপনাদের সব কথা বলা অভ্যাস। কিন্তু সব জায়গায় তো গান দিয়ে জেতা যায় না। তখন কী করেন?’
: বেশির ভাগ বাহাসে কোরান শরীফ হাদিস থেকে ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক হয়। যেমন ধরুন আমরা মারফতি ফকির, আমরা বিশ্বাস করি আল্লার চেহারা আছে তাঁকে দেখা যায়। মুসলমান মৌলানারা সে কথা মানেন না। তাঁরা বলেন আল্লার রূপ নেই। আমি তখন বলি, হজরত মহম্মদ মোস্তাফা বলেছেন—
ইন্নাকুম সাত্তারুনা রাব্বেকুম কামা
এ কথার অর্থ—পূর্ণিমার চাঁদের মতো আল্লাহকে স্পষ্ট দেখা যাবে। তা হলে? তবে এখানে কথা আছে।
: কী রকম?
: এই যে বলা হয়েছে আল্লাহকে পূর্ণিমার চাঁদের মতো স্পষ্ট দেখা যাবে, তা কি সবাই দেখতে পাবে? না। এ দেখতে গেলে আমাদের মারফতি পথ নিতে হবে। এ পথ অজানা, তাই একজন পথপ্রদর্শক চাই। তিনিই পীর মুর্শিদ। একজন জাননেওয়ালা (জ্ঞানী) কামেল পীরের কাছে বায়েত (শিষ্য) হয়ে তাঁর কাছে গোলামি খৎ লিখে তাঁর মন জয় করতে পারলে তবে সেই পথ দেখা যাবে।
আমি যেন একটা নতুন জগতে ঢুকে পড়েছি। এ জগতের বিষয় যেমন ধূসর ভাষাও তেমনই ধূপছায়া। তবে শেষপর্যন্ত ভাবটা বোঝা যায়। তবু একটু খটকা থাকে। যেমন মুর্শিদ কি শুধুই পথপ্রদর্শক? তিনিই তো অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। যেমন লালন ফকির একটা গানে বলেন—
যেমন মুর্শিদ তেমন খোদা
মনে কেউ করোনা দ্বিধা।
তবে? মুর্শিদকে দেওয়া এতখানি বড় আসন? হতেই তো পারে গোলমাল। ঔদার্য তো সার্বজনীন হতে পারে না। কিন্তু বেনোয়ারি ফকিরকে সে তর্কে না নিয়ে গিয়ে একটা সামাজিক প্রশ্নে টেনে আনলাম এই বলে যে, ‘এই যে আপনি বা জলিল বা মানউল্লা মাঠপুকুর গ্রামে বসে মারফতি সাধনা করছেন তাতে গ্রামসমাজে গোলমাল হয় না? একদিনও মসজিদে যান না তাই নিয়ে ঝঞ্ঝাট হয় না?’
