আবু বিনয়ে মাথা নেড়ে বসল। ঘেরাটোপ খুলে দোতারা বাঁধল। তারপর চোখ বুঁজে তীব্র তারসপ্তকের পঞ্চমে তার ক্ষুব্ধ কণ্ঠকে বাজিয়ে তুলে গাইল:
কেন ঝাঁপ দিলিরে মন
বাবার পুকুরে।
কামে চিত্ত পাগলপ্রায় তোরে॥
এ সব গানের কী শক্তি। যেন ঝাপটের মতো আমার কানে এবং সেখান থেকে সোজা মনকে বিদ্ধ করল। কী স্পষ্টতা অথচ কতখানি ব্যঞ্জনা। গান তো নয়, যেন কামী মানুষের পরিতপ্ত আর্তনাদ। আবু বক্কর যত গাইছে তত কাঁদছে। জলিল, মানউল্লা সবাইয়ের চোখে জল। আবু বক্কর অনায়াসে পৌঁছে গেল অন্তরা থেকে আরেক অন্তরাতে:
কেনে রে মন এমন হলি?
যাতে জন্ম তাইতে মলি?
ও তোর ঘুরতে হবে লক্ষ গলি
হাতে পায়ে বেড়ি সার করে॥
দীপের আলো দেখে যেমন
উড়ে প’লো পতঙ্গজন
অবশেষে হারায় জীবন
তাই করলি হা রে॥
ততক্ষণে বেনোয়ারি অনেকটা আত্মস্থ হয়েছেন। তাই দেখে আমারও খানিকটা স্বস্তি হয়। পরিবেশের গুমোট কাটে। ‘আহা’, ‘বেশ বেশ’ এ সব তারিফের ধ্বনি ওঠে ফকিরের গলা থেকে। ব্যাপার দেখে পাখিও এমনকী সাহস করে উঁকি মারে ঘরের চৌকাঠ থেকে। আবারও ভাবি, এ সব গানের কী শক্তি! মনের তাপও গানে গলে গলে পড়ে সবদিক শীতল করে। আবু বক্কর এবারে গানের ভণিতায় এসে পড়ে:
সিরাজ শা দরবেশে তাই কয়
শক্তিরূপে ত্রিজগৎময়
কেন লালন ঘোরে বৃথাই
আপ্ততত্ত্ব না সেরে॥
বেনোয়ারি আমার পাশে উঠে এসে বসেন। আমার হাঁটুতে হাত রেখে বলেন, ‘মন হঠাৎ বড় চঞ্চল হয়ে গেল। শক্তিরূপে ত্রিজগৎময় সেই সহজবস্তু মনের মানুষ তো মনের মধ্যেই রয়েছে। তাইলে তাকে আর কেন নারীর মধ্যে আলাদা করে খোঁজা? কেন বন্ধন? কেন মায়া?’
আবু বক্কর গান থামিয়ে আরক্ত চোখে নেহার করল তার গুরুর দিকে। ‘গান চলুক’ নির্দেশ এল। হেসে সে আবার দোতারা বাঁধে। সেই সুযোগে মানউল্লা বলে ওঠে, ‘বাবুকে হাতির গানডা শোনাও দিকি বক্কর।’ পাখি হাততালি দিয়ে সায় দেয়।
হাসিমুখে বক্কর গায়:
বাজারে হাতী দেখা হয়েছে।
চার কানায় দেখে এসে
আপন আপন বলতেছে॥
বাইরে একটু কি হালকা হাওয়া উঠেছে দিনশেষে? ঘরে অন্তত মানুষগুলির মনে একটু ঝিরঝিরে বাতাসের ছোঁওয়া লাগে। ফকিরের চোখ নিমীলিত, মুখে হাসি৷ জলিল বলে, আমার কানে, ‘বাবার দশা হয়েছে। মনের ব্যথা গলে গিয়েছে।’
আবু বক্কর গায়:
একজন বলে ‘কই সবার কাছে
হাতী দেখা হয়েছে—
নরম নরম সুপারির গাছ খাড়া রয়েছে।
তার উপর মোটা নীচে সরু
মাথা কুমড়োর মত ঝুলতেছে’।
আর একজন কয় ‘তোমার কথা নয়
আমি ঠিক বলি তোমায়—
চারদিকে কাঁথা ঝোলে কুলোখানির প্রায়’।
যত অজ্ঞানেতে গল্প করে
তাতো সব দেখি মিছে।
আর একজন কয় ‘শোনো বিবরণ
তোমরা যা বলো এখন,
একটি কথা নয়কো সাচ্চা বলো অকারণ।
হাতী পাকাঘরের থাম্বা যেমন
খাড়া হয়ে রয়েছে’।
গেল্লা ক’রে আরেকজনা কয়,
‘বড় অসইলো তো হয়
দেখলাম হাতী আখ একগাছি
নীচে পাতা রয়’।
গোপাল কয় খেদেতে
চার কানাতে আচ্ছা মজা লাগিয়েছে॥
গান শেষ হতে খুশিতে হাততালি দিল পাখি। মানউল্লা বলল, ‘পাখির মনে এখনও বালিকাভাব, তাই এতবড় ভাবের গানখানা শুনেও মজা পেয়েছে।’
‘এ গানখানার মধ্যে খুব বড় ভাব আছে নাকি?’ আমার মুখ ফসকে কথাটা বার হয়ে গেল।
বেনোয়ারি বললেন, ‘আল্লার চেহারা কেমন? ভগবানের রূপ কেউ কি জানে? একেক জন একেক রকম বর্ণনা করে বলে তার আন্দাজি মতে, যেমন ওই কানার হাতি দেখা। সাধনা অনুযায়ী স্তরে স্তরে তাঁর সম্পর্কে ধারণা গড়ে ওঠে। শেষপর্যন্ত ভগবান সম্পর্কে আর রূপের ধারণা থাকে না। একাত্ম হয়ে যেতে হয়। এটাই সুফিমত।’
: সুফিমতের ওই স্তরগুলো বিষয়ে আর একটু বলবেন?
ফকির বললেন, ‘জলিল বল দেখি সুফিমতের তরিকা। দেখি কেমন শান আছে।’
জলিল বলল, ‘বেল গায়েব একিন পেরথমে। তারপরে এল্মেল্ একিন। তারপরে আয়নুল একিন। তারপর হাক্কুল একিন। ওই যাঃ বাবা শেষডা আর স্মরণ নেই যে!’
মানউল্লা বলল, ‘তোর বড্ড বিস্মরণ হয়। শুনে নে। সবশেষে হলো হুয়াল একিন।’
জলিল লজ্জায় মাথা নিচু করে। বেনোয়ারি বলেন, ‘সুফিমতে, নিজে না দেখে পরের মুখে শুনে আল্লার অস্তিত্ব বিশ্বাস করাকে বলে, ‘বেলগায়েব একিন’। তারপরে জ্ঞানের দ্বারা আল্লাকে বিশ্বাস করাকে বলে ‘এল্মেল্ একিন’। চোখে দেখে বিশ্বাস করাকে বলে ‘আয়নুল একিন’। এর চেয়ে বড় স্তর আছে। সত্য জেনে পরিচয় করে বিশ্বাস করাকে বলে ‘হাক্কুল একিন’। আর সব শেষ স্তরে হল ‘হুয়াল একিন’। তার মানে আল্লার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া। এবারে বুঝলেন তো হাতির গানের মূল্য। আল্লার সামনে আমরা সবাই কানা।’
শেষ জ্যৈষ্ঠের সায়াহ্নে আমি জ্ঞানী মানুষটার দিকে শ্রদ্ধায় বিনতিতে নীরবনত হয়ে সেজদা জানাই। অন্তর্যামীর মতো তা বুঝে মানুষটি বলেন, ‘সেজদা দিন নিজের ভেতরের খদকে।’
পরদিন ভোর হতেই ফিরে আসি নিজের ডেরায় কিন্তু অচিরে আবার যাই মাঠপুকুর গ্রামে বেনোয়ারি ফকিরের কাছে। কেননা মাথায় ছিল বাউল ফকির নিগ্রহের প্রসঙ্গ। সে সম্বন্ধে তো কিছুই জানা হয়নি সেদিন। এবার তাই মাঠপুকুর পোঁছে, চা-জলখাবার খেয়েই কথাটা তুলে বসি। কে জানে বেলা বাড়লে শিষ্যরা এসে পড়বে হয়তো। ফকিরি গান হবে। তারপর পাঁচতালে আসল কথাটা ভুলে যাব। সরাসরি বলি, ‘মাঝে মাঝে খবর পাই নদীয়া-মুর্শিদাবাদে নাকি বাউল ফকিরদের নিগ্রহ হয়। কী ধরনের নিগ্রহ? কেন হয়? কারা করে বলুন তো?’
