: মোটেই না। আরে আমার কারবার সব মূর্খ চাষাভুষোদের নিয়ে। তাদের জ্ঞান খুব বেশি হলে ছাত্রবৃত্তি পর্যন্ত, আপনি তো জ্ঞানের পথ সেরে এসেছেন। আর শুনেছি আপনি বেশ কিছু সাধু সন্ন্যেসী নাড়াচাড়া করেছেন। আপনার কথাতেও তা ধরা পড়ছে। আমরা ফুট দেখলেই বুঝি মিরগেলের ঝিম।
: শেষ কথাটার মানে বুঝলাম না।
: কথাটা বোঝা কঠিন নয়। তবে আপনার পথ আলাদা তো তাই বুঝলেন না। ব্যাপারটা হল জলের খুব ভেতর দিকে থাকে মিরগেল মাছ। তাদের নিশ্বেস থেকে জলের ওপরে যে বুজগুরি বা ফুট ওঠে তাই দেখে জেলেরা বুঝে নেয় কোথায় মিরগেল আছে, সেইখানে জাল ফেলে। তেমনই আপনার কথাতেই আপনার নিশানা ধরা পড়ছে। আপনি কোথায় আছেন। কত ভেতরে।
এবারে সাহস পেয়ে আমি পুরনো ফেলে-আসা প্রসঙ্গটায় ফিরতে চাই। তাই বলে বসি, ‘আপনি বলছিলেন ফকিরিতত্ত্বের মূল কথা বিন্দুধারণ। তো এই বিন্দু বা শুক্রের সূচনা কীভাবে, পরিণতিই বা কী?’
: তা হলে শুনুন। আমাদের মারফতি মতে বলে, দেহের ওপরে হল চামড়া, চামড়ার মধ্যে রক্ত, রক্তের মধ্যে মাংস, মাংসের মধ্যে মেদ, মেদের মধ্যে অস্থি, অস্থির মধ্যে মজ্জা আর সেই মজ্জার মধ্যে শুক্র। এখন বুঝুন শরীরের পঞ্চদশ বস্তুর মধ্যে শুক্রই প্রধান। সেই শুক্রের মধ্যে আছে প্রাণের পুষ্প, বীজ। এবারে বুঝে নিন সেই প্রাণের মধ্যে আছে আত্মারাম, আত্মারামের মধ্যে পুষ্প, পুষ্পের মধ্যে কলি, কলির মধ্যে চিৎশক্তি, চিৎশক্তির মধ্যে মন, মনের মধ্যে ভাব, ভাবের মধ্যে রস, রসের মধ্যে প্রেম। আর সেই প্রেমের মধ্যে আছে সহজবস্তু। আমরা শেষপর্যন্ত সেই সহজবস্তুর সন্ধানী তাই প্রেম আমাদের অবলম্বন। এ সব কিছুর মূলে শুক্র, তাই শুক্র রক্ষা করতে হবে। শুক্রহানি ঘটলেই তাই সহজের পথ টলে যাবে।
চমৎকার যুক্তির বুনোট। প্রায় মেনে নিতে সাধ যায়। বেনোয়ারির বলবার ক্ষমতা যেমন, তেমনি তারিফ করবার মতো স্মৃতিশক্তি। হয়তো বিন্দুধারণ থেকে এ সব ক্ষমতা আসে। কে জানে? আপাতত তাঁর ক্ষুরধার যুক্তির শস্ত্রে ধরাশায়ী হতে হতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘শুক্রই যদি প্রধান উপাদান তো সেই শুক্রের উৎপত্তি কোথা থেকে? সেও কি রক্ত মাংস মেদ মজ্জার মতো মানুষের জন্মগত অর্জন?’
: জন্মগতই যদি হবে তা হলে যৌবনের আগে বিন্দু আসে না কেন?
পরাজয় মেনে নিয়ে বলি, ‘আপনিই বুঝিয়ে দিন।’
বেনোয়ারি হেসে বলেন, ‘ভাববেন না আমি পয়গম্বর পীর। অনেকদিন ধরে বহু গুরু মুর্শেদের সঙ্গ তারপর অনেক কামেল ফকিরের বাহাস শুনে তবে এ সব মনের মধ্যে গেঁথেছে। যাই হোক, এখন প্রশ্ন হল, বিন্দুর উৎপত্তি যদি জন্মগত নয় তবে আসে কোথা থেকে? এ প্রশ্নের এককথার জবাব, পঞ্চভূত হতে। অর্থাৎ পঞ্চভূতের প্রভাবে জন্মায় খাদ্যশস্য দানাপানি। সেই থেকে তৈরি হয় জীবাহার। মানুষ সেই আহার্য থেকে রস টানে। সেই রস চামড়া থেকে শেষপর্যন্ত বিন্দুতে তৈরি হয়। সেইজন্য বারো চৌদ্দ বছর লাগে মানুষের দেহে বিন্দু সৃজন হতে।’
মানি আর না মানি লোকধর্মের এই এক সবল দিক। এরা আমাদের মতো কথায় কথায় শাস্ত্র দেখায় না। এদের আছে এক নিজস্ব বিশ্বাসের জগৎ। কোনও ব্রাহ্মণ পণ্ডিত মৌলানা বা উলেমা সে জগৎ বানাননি। এঁরা নিজেরাই দিনে দিনে বানিয়েছেন। তাতে আছে জৈবনিক দৃঢ় কাঠামো। কাম আর স্খলন তাতে একভাবেই স্বীকৃত ও ধিক্কৃত। প্রেম মহিমময়। লোকধর্মের তত্ত্বে আবেগের চেয়ে লজিক বেশি তার কারণ এ-ধর্মে যারা আছে তাদের অনবরত যুক্তি-তর্ক দিয়ে নিজের মতামত পোক্ত করতে হয়। এ ধর্মে যাদের ছিনিয়ে আনা হয় তাদেরও বোঝাতে হয় যুক্তি তর্ক দিয়ে। গ্রামের লোক ভাষণে বড় একটা মজে না কিন্তু যুক্তিতে ভেজে। তাদের জীবন যে যুক্তির শৃঙ্খলে বাঁধা। বীজ পুঁতলে শস্য হয়, বৃষ্টি পড়লে শস্য দানা ভাল ফলে, সার দিলে আবাদ ফলন পরিমাণে বাড়ে। আবার উলটো যুক্তিতে বীজ খারাপ থাকলে আর সব কিছু ভাল হলেও ফসল কেঁচে যাবে। সব কিছু ঠিকঠাক হলেও বন্যা বা খরা হলে সে বছর নির্ঘাত মরণ। সেই লজিকের জগৎ থেকেই বেনোয়ারিকে খোঁচা মারি, ‘বিন্দুরক্ষা করতে গেলে তো দমের কাজ জানতে হয়। সবাই তো তা জানে না। গৃহীরা কি স্ত্রীসঙ্গ করবে না তবে?’
‘কেন করবে না’ বেনোয়ারি বোঝান, ‘সন্তান চাইলেই সঙ্গম। তবে স্বসুখ বাসনার জন্যে কাম হল পাপ। আমাদের একটা চলিত গ্রাম্য কথা আছে—
মাসে এক বছরে বারো
তার কমে যতটা পারো।
বুঝলেন?’
: বুঝলাম। সেইজন্যেই কি আপনি বিয়েই করলেন না? সকালে যে লাউ কুমড়োর বীজ রাখার কথা বললেন, সে তো নিতান্ত পরিহাস। আসল ব্যাপারটা কী?
‘আসল ব্যাপার জন্মদ্বারে ঘৃণা’ নরম মানুষটি হঠাৎ কঠিন হয়ে গেলেন। টানটান হয়ে বললেন, ‘স্ত্রীজাতিকে যদি মা ভাবি তবে কাউকেই কি কামনা করা যায়? যেখান দিয়ে আমার জন্ম সে স্থান তো আমার বাবার। তা হলে সব নারীতেই তো রয়েছে আমার জন্মচিহ্ন। আমি কেমন করে নিজের মাকে কামনা করি? আমি কি পশু?’
ব্যথায় টনটন করে উঠল আমার মন। ঝিমঝিম করতে লাগল সারা শরীর। কী জমাট নীরবতা। কী গুমোট। বেনোয়ারির মুখ ক্ষোভে ধিক্কারে জর্জরিত। দুচোখে টলটল করছে জল। হঠাৎ গম্ভীর স্বরে হাঁকলেন, ‘আবু বক্কর। সেই গানটা শোনাও এঁকে। বুঝেছ?’
