আবু বক্কর বলল, ‘মুর্শেদের কৃপায় যেটুকু বুঝেছি আপনাকে বলছি। বাবা, ভুল হলে শুধরে দিবা কিন্তুক। শুনুন বাবু। ‘সেজদা অবুদিয়ত’ শুধু আল্লার উদ্দেশে যে প্রণাম তাকে বলে। তার বহু নিয়ম আছে। আর ‘সেজদা-এ তাহিয়া’ বা ‘তাজিম’ আলাদা জিনিস তাজিম মানে হল গিয়ে সম্মান। তার মানে সম্মান করে সেজদা সকলকেই করা যায়। আমরা ফকিররা সেইজন্য সেজদা করি সব মানুষকে।’
আমি বললাম, ‘আমি যখন কুবির গোঁসাইয়ের গান সংগ্রহ করতাম তখন তাঁর একটা গানে সেজদার কথা পেয়েছিলাম কিন্তু মানে বুঝিনি! এখন যেন বুঝতে পারছি।’
: কী বলুন তো গানখানা?
নামাজ পড়ো যত মোমিন মুসলমানে।
আল্লাজী সদর হন না দিদার দেন না
সেজদা করি কার সামনে?
হয় আপনি আল্লা আপন মনে।
বেনোয়ারি একেবারে হই হই করে উঠলেন, ‘আরে এ তো খাঁটি মারফতি গান। ‘আল্লাজী সদর হন না দিদার দেন না’ ঠিকই তো। আল্লা সামনে আসেন না, দর্শন দেন না। তা হলে কাকে সেজদা করি? কাজেই আপন মনে বসতি যে আল্লার তাকেই সম্মান করো। সব খদের মধ্যেই যে খোদা তাকেই দাও সম্মান। বাঃ বাঃ। মনটা ভাল হয়ে গেল।’
এদিকে জ্যৈষ্ঠের তাপ বাড়ছে। গরম ভাতের গন্ধ উঠছে। চুপিসারে ফকিরের আর ক’জন শিষ্য কখন সামিল হয়ে গেছে দাওয়ায়, কথায় কথায় খেয়াল হয়নি। খেয়াল হল যখন পাখির ধমকানি শুরু হল, ‘তোমরা ছ্যান করবা না? খাবা না? বেলান্ত বসে বসে গজালি করলেই চলবে?’
আবু বক্কর বলল, ‘উঠুন বাবাসকল। পেছনে ছাতারে পাখির খ্যাচর ম্যাচর শুরু হয়েছে। এ না ঠুকরে থামবে না।’ অচিরে তার ঝুঁটি ধরে টান মারল পাখি। ‘বাপরে’ বলে খুব মায়ালি হেসে বক্কর উঠল। পেছনে আমরা। তেল গামছা তৈরি। ঝাঁপিয়ে পড়া গেল আখড়া সংলগ্ন ঠাণ্ডা পুকুরে। স্নান করে এসে দেখি দাওয়ায় ভোজনপর্ব সাজানো। তবে শুধু ফকির আর আমার। ভাত, ডাল, ভাজা, পটলের তরকারি আর পাকা আম। সামনে বসে থাকল চার শিষ্য। খেতে খেতে একসময় হঠাৎ দেখি চারশিষ্য মেটে দাওয়ায় উটপাখির মতো নাক ডুবিয়ে ডান হাত প্রসারিত করে দিল গুরুর দিকে। গুরু তাদের চারখানি অঞ্জলিতে দিলেন চারগ্রাস অন্নপ্রসাদ। ভক্তিভরে প্রসাদ খেয়ে তারা মাথায় হাত মুছল।
ফকিরদের আচরণবিধি একটু অন্য রকম। সারাদিনে আরও কত কী দেখব না জানি। খাওয়া শেষ হতে আমরা শুলাম দুদণ্ড খেজুর পাটিতে। কথা চলতে লাগল। ওদিকে হেঁসেলের দাওয়ায় শিষ্যশাবকরা খাচ্ছে। সঙ্গে পাখির কিচির মিচির। আমি বেনোয়ারিকে বললাম, ‘এখন ফকিরিতন্ত্রে কি নতুন নতুন মানুষ আসছে? বেশির ভাগ গৌণ সম্প্রদায় তো পড়তির দিকে।’
ফকিরির পথে চিরকাল মানুষজন কম। এখন আরও কম। পথটা কঠিন তো। ক্রিয়া-করণের চেয়ে এতে উপলব্ধির দিক বেশি, দমের কাজ আছে। শ্বাসের কাজ। ভুল হলে শরীর ভেঙে যায়। এ পথে দাঁড়ানো কঠিন, ধরে রাখাও কঠিন। আমাদের একটা গানে বলেছে;
ফকিরিতে ফিকিরি করলে
নরকপুরী যেতে হবে ভাই।
সেই নরক ভক্ষক জনার
নরকেতেই ঠাঁই॥
গানটা বুঝলেন তো? ফকিরিতে ফিকিরি চলবে না। ফিকিরি মানে ভুয়োতাল, ফাঁকি। মিথ্যে কথা। কাম-লোভ-হিংসা-দ্বেষ একেবারে ত্যাগ করতে হয়।
: আচ্ছা, আপনি তো বিয়ে করেননি। সব ফকিরই কি তাই?
: না সংসারী ফকিরও আছে। তবে তারা গৃহীদের মতো কামের বশীভূত নয়। বীর্যরক্ষা আমাদের প্রধান কাজ। আমরা বলি বিন্দু। এই বিন্দু বা কীটকে বলে শুক্র। আমরা বলি নফ্স্। এই নফস বা কামকে সর্বদা শাসনে রাখতে হয়।
: আপনাদের ফকিরি মতে তাহলে শারীরবিদ্যার স্থান খুব বেশি।
: মারফৎ কথার একটা মানে তো সেইটাই। একে বলে ‘এলমে তশরীহ’, মানে শারীরস্থান বিদ্যা। যাকে বলে অ্যানাটমি।
আমার মনে হতে লাগল যেন এই মধ্যদুপুরের মায়ায় কোন একটা অজানা রাজ্যে ঢুকে পড়েছি। তার দারুণ আকর্ষণ। সামনে আমার যিনি শুয়ে শুয়ে অবহেলে জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি ঘটাচ্ছেন তিনি যেন বেনোয়ারি নামে কোনও মনুষ্যদেহধারী নন, যেন ফেরেশ্তা। স্বল্পশিক্ষিত গ্রাম্য মানুষ অথচ শাস্ত্রজ্ঞান আর তার ভাষ্যরচনায় ওস্তাদ। তার চেয়েও বেশি আত্মজ্ঞানে যাকে বলে খুব মজবুত ইনটেলেকচুয়াল। পাশাপাশি যেন তাঁর জ্ঞানের রাজ্যে আমি নিতান্ত পাথর-খোঁজা নিউটন। সেই কথা মনে রেখে অজ্ঞানতার নিম্নদেশ থেকে আমি জানতে চাইলাম এই এলেমদার ফেরেশতার কাছে, ‘দেহের খবর কিছু বলবেন?’
: বলবার কথা তো অনেক। দেহের একটা অংশ তো ধড়। অনেকটাই দেল্। আসল পড়া পড়তে হয় দেল্কেতাব থেকে। আর মানুষের এই শরীরের সবচেয়ে বড় জিনিস হল বিন্দু। পথে নামলে যেমন পথিকের সঙ্গে দেখা হয়, আমাদের মারফতি পথেও তেমনই নানা মত এসে মেলে। সে সব জানতে বুঝতে হয়। তবে জ্ঞানের পথে বেশিদূর যায় না ফকিররা। তাদের পথ দেলের। দেলই আল্লার ঘর।
বেনোয়ারির কথায় একটা গভীরতর টান আছে। সে টান কেবলই ভেতরদিকে আরও টান দেয়। মনে হয় মানুষটির কাছে যেন আমার সব জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি ঘটবে। কিন্তু তাই কি হয়? হতে পারে? আমার জিজ্ঞাসা তো অসীম নয়। কথার টানে যে কথাটুকু জাগছে, কথার আভা যে প্রশ্নকে আলোকিত করছে আমি শুধু সেটুকুই জানতে চাইতে পারি তাঁর কাছে। কিন্তু জ্ঞানী মানুষটার কাছে আমি একটানা মূর্খের মতো প্রশ্ন করছি না তো? বেনোয়ারির উত্তরে রয়েছে গহন গভীরতা কিন্তু আমার প্রশ্নগুলোর মান নিতান্ত শিশুসুলভ হচ্ছে কি? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি এবারে, ‘ফকির সাহেব, আমি নানা আনশান প্রশ্ন করছি না তো? আপনি হয়তো বিরক্ত হচ্ছেন।’
