কথাটা খুব নির্বিকারভাবে বললেও বেনোয়ারির গলার স্বরে একটা মর্মজ্বালা, একটা গাঢ় বেদনা যেন মেদুর হয়ে ওঠে। আমি অবস্থাটা সামলাতে বলে বসি, ‘একেবারে একা থাকেন। সময়কালে বিয়েয় বসেননি কেন? তখন থেকে ফকিরির নেশা?’
‘আরে না না’ মানুষটা খুব দেল্খোলসা ভঙ্গিতে জোরে হেসে বলেন, ‘ফকিরি নিই অনেক পরে। আসলে কী জানেন? বাড়ির গাছে কুমড়ো কি লাউ প্রথম যেটা ফলে সেটা হয় ঠাকুরসেবায় লাগে নয়তো বীজ করে। তো আমি হলাম পিতামাতার জ্যেষ্ঠ ছেলে, তাঁরা আমাকে বিয়ে সাদি না দিয়ে বীজ করে গেছেন। হাঃ হাঃ। কারুর ভোগে লাগলাম না। কী বলেন?’
মানুষটা তো ভারী চকচকে! সঙ্গে সঙ্গে বেনোয়ারি ফকিরকে ভালবেসে ফেললাম। বললাম, ‘বীজই তো আসল। তবে সে বীজ কোথায় পড়ছে সেটাই মূল কথা, মাটিতে না পাষাণে। মনে হয় আপনার বীজে অরণ্য হয়ে যাবে। ঠিক নয়?’
‘বিলকুল ঠিক’ দাড়িতে আঙুলের চিরুনি চালিয়ে ফকির বললেন, ‘হ্যাঁ, শিষ্যশাবক চাড্ডি আছে বটে আমার। এখনই সব আসবে। জলিল, মানউল্লা, আবু বক্কর, অমরেশ, উমিদ। ওই দেখুন বলতে বলতে আবু বক্কর হাজির। যাক, আপনার কপাল ভাল। বক্কর ভাল গাহক। আজ কটা গান শুনতে পাবেন।’
সাদা ধুতি লুঙ্গি করে পরা, সাদা আলখাল্লা, একটা সাদা ঘেরাটোপে মোড়া দোতারা। আবু বক্করের শুভ্র মূর্তি দাওয়ায় উঠে নতজানু হল বাবু-হয়ে-বসা বেনোয়ারির সামনে। বক্কর তার মুখখানি একেবারে ডুবিয়ে দিল গুরুর কোলে। গুরু তার ঝুঁটি বাঁধা চুলে বিলি কাটলেন, পিঠে দিলেন হাতের উষ্ণতা। প্রণাম-পর্ব শেষ হল গুরুর পায়ের দুটো বুড়ো আঙুলে যখন শিষ্য চুম্বন করল।
প্রণামের পদ্ধতিটা ভারী নতুন ধরনের। জিজ্ঞেস করলাম, ‘একেই কি আপনারা বলেন সেজদা?’
বেনোয়ারি বললেন, ‘সেজদা বা অভিবাদন নিয়ে তর্ক আছে। আমাদের মুসলমান আলেমগণ বলেন একমাত্র আল্লা ছাড়া আর কাউকে সেজদা হারাম। তারা বলেন, তবে কেন ফকিররা মানুষ হয়ে মানুষকে সেজদা করে? এ ব্যাপারে আমাদের জবাব সাফসুফ। সেজদা করি মানুষে খোদা আছে বলে। এ জবাবে ওরা খুশি হয় না। আমাদের সঙ্গে এই নিয়ে বেধে যায় মাঝে মাঝে। না না দাঙ্গাহাঙ্গামা নয়। শুধু বাহাস অর্থাৎ তর্ক।’
আমি বললাম, ‘একটা গানে শুনেছিলাম—যে খোঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল।’
: ‘গান আপনি এখন চোপরদিন শুনবেন কত। আবু বক্কর এসে গেছে। ও হল গানের পাখি। ও হ্যাঁ ভালকথা, পাখি কোথায় গেল বলো তো বক্কর?’
বক্কর বলল, ‘পাখি? আবার উড়েছে? দেখি কমন্দিকে গেল; নড়া ধরে ধরে আনি।’
আমি বললাম, ‘এ কী? আপনি ফকির মানুষ পাখি পুষেছেন? সে তো বন্ধন?’ বেনোয়ারি আপন মনে হাসেন আর দাড়িতে আঙুল বোলান। হঠাৎ বাড়ির কানাচ থেকে আবু বক্করের গানের টুকরো ভেসে এল:
আমি একটা পাখি ধরেছি।
যতই করে ঝটর পটর
পোষ মানাবো দিয়ে মটর
শিকলি দিয়ে আটকে রাখার
ফন্দি করেছি।
ধরেছি ধরেছি পাখি ধরেছি॥
কী কাণ্ড! সত্যিই আবু বক্করের হাতে-ধরা এক কিশোরীর বিনুনি। সবুজ শাড়ি জড়ানো তেরো-চৌদ্দ বছরের একটা মেয়ে মাথা ঝাঁকাচ্ছে অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে আর আবু বক্করকে ঘুঁষি মারছে। তার ফরসা মুখখানা রাগে গনগনে। মাথা নিচু করে জেদি ভঙ্গিতে মেয়েটা দাওয়ার সামনে দাঁড়াল। বক্কর বলল, ‘ছাঁচতলায় বসে লুকিয়ে আচার খাচ্ছিল। এই দেখুন আমার আলখাল্লায় আচার মাখিয়েছে, আমাকে খামচে দিয়েছে, ঘুঁষি মেরেছে। এর প্রিতিকার নেই? আমি বিচার চাই।’
‘বিচার কাঁচকলা’ মেয়েটা বুড়ো আঙুল দেখাল জিভ ভেঙিয়ে।
বেনোয়ারি বললেন, ‘বিচার হয়ে গেছে। সে ছোঁড়া আজ তোকে নিতে এলে যেতে দেব না। বাস।’ মেয়েটি পা দাপাতে দাপাতে মল বাজিয়ে সারা উঠোনে ঘুরে ঘুরে একসা। বেনোয়ারি বললেন, ‘আমিও বিয়ে সাদি করিনি আবু বক্করও না, দ্যাখো একবার ঐহিকের মায়া। হ্যাঁরে, ইয়াকুব তোকে এত ভালবাসে?’ মেয়েটি পালাল।
সংসার বিরাগী ফকিরের বাড়িতে এমন মধুর জীবনের ছবি দেখে খানিকটা হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ফকির সে অবস্থা থেকে উদ্ধার করে বললেন, ‘ভাইপোর মা-মরা মেয়ে। নাম পাখি। ওকে এনে পুষেছিলাম পাঁচ বছর বয়সে। টিয়ে পাখির মতো ঘুরত ফিরত, দানাপানি খেত। ঠুকরিয়েও দিত খুব। তারপরে সবে পোষ মানছে এমন সময় আমারই এক শিষ্যের জ্যাঠা পাখিকে পছন্দ করে তার ছেলে ইয়াকুবের সঙ্গে সাদি দিয়েছে। বাস। ভাবলাম মায়া কাটল। কোথায় কী? রোজ পালিয়ে আসে। পাখি তো পাখিই।’
ইতিমধ্যে চা ডিমভাজা এল। পাখিই এনেছে। যেন কত নম্র শান্ত এখন। লাজুকলতা। খাবার নামিয়ে দিয়েই দৌড়।
খাওয়া-দাওয়া চুকলে আমি বললাম,‘তখন সে সেজদার কথা বলছিলেন। ইসলামি শাস্ত্রে এ বিষয়ে কী বলে?’
: দেখুন অত শাস্ত্রপ্রমাণ দিয়ে কি সব কিছু হয়? আমরা তো শাস্ত্ৰছুট। আমরা ফকির। আমরা বলি ‘খদ’ মানে ব্যক্তি বা মানুষ। ‘সেই মানুষ না ধরিলে/খোদা কভু না মিলে।’ আবু, তোমার সেই আর্জান শাহ ফকিরের গানটায় কী বলে যেন?
খদ আর খোদা উভয়ে একজন।
খদকে ধরে করো ভজন॥
একেবারে হক্ কথা। তা খদকে যদি মানি তবে তার মধ্যে খোদাকেও মানি। নয়কি? তা হলে খোদাকে যদি সেজদা করি তবে খদকে সেজদা করতে আর বাধা কী? আসলে কি জানেন? সেজদা দু’রকমের। ‘সেজদা অবুদিয়ত’ বা এবাদত আর ‘সেজদা-এ তাহিয়া’ বা তাজিম। কী আবু বক্কর বাবুকে বোঝাতে পারবে? বোঝাও দেখি। আমিও বুঝে নিই তোমার এলেম কতটা বাড়ল।
