সারাদিনের সমস্ত ক্রিয়াকরণ সমাপনের পর মেলা তখন খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। আখড়াগুলোয় জ্বালা হচ্ছে সাঁঝবাতি। ক্লান্ত দণ্ডীখাটা মানুষগুলো অপরিসীম শ্রমের শেষে নিঃশেষে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রতিবন্ধী বালক বালিকাগুলি মুখ গুঁজেছে মা-বাবার সন্তপ্ত বুকে। শুধু এক একটা সমাবেশে একটানা চলছে ভাবের গান। সে গানে আত্মধিক্কারের আর অনুতাপের সুর:
অপরাধ মার্জনা কর প্রভু।
এমন মতিভ্রম জন্মজন্মান্তরে তোমার সংসারে
হয় না যেন কভু
বিকলে করলে বড় কাবু।
আমার ত্রুটি কত কোটিবার
লেখাজোকায় লাগে ধোঁকা সংখ্যা হয় না তার।
গভীর নির্জন পথ নয়, অসংখ্য সহস্র মানুষের উদ্বেল উপস্থিতিতে ভরা, কত সশঙ্ক ভরসা আর বিশ্বাস, কত সুগভীর আশা-ঘেরা আত্মনিবেদন এ মেলায় দুশো বছর আছড়ে পড়েছে। চারদিকের অজস্র মানুষ আর তাদের সম্মিলিত ভক্তিকে আলোকিত সম্মান জানাতেই আজ যেন উঠেছে পূর্ণিমার চাঁদ। সেই উদ্দীপ্ত প্রান্তর আর চঞ্চল জনস্রোত দেখে লালশশীর মতো আমারও মনে হয় ‘রাস্তার ওপর বাসাঘর নাগর দোলনা’। মনে হল, লালশশী বাউলদের মতো মনের মানুষ খুঁজে সারাজীবনের কান্না গেঁথে রাখেননি তাঁর গানে। মনের মানুষ ছিল তাঁর ভেতরেই। শুধু মনে হয়েছিল তাঁর ‘কাজ কি সেই মনের মানুষ বাইরে বার করে?’
*
কলকাতার নামকরা খবরের কাগজে খবরগুলো বেরোয় না কিন্তু মফস্বলের চার পাতার ছোট কাগজে মাঝে মাঝে হেডলাইন হয়: বাউল নিগ্রহ। আমি এমনতর অনেক খবর কেটে ক্লিপিং করে রাখি। খবরের ধরনটা প্রায় একরকম। অর্থাৎ নদীয়া বা মুর্শিদাবাদের কোনও গ্রামে এক বা একদল বাউল কিংবা মারফতি ফকিরের মাথার ঝুঁটি চুল দাড়ি কেটে, একতারা ভেঙে দিয়ে, মারধোর করেছে কট্টর ধর্মান্ধরা। কাগজের খবরটা ওইখানেই শেষ হয়। জানতে মন নিশপিশ করে যে তারপর কী হল? ব্রাত্য বাউল-ফকিররা কি এ নিগ্রহ বারে বারে মেনে নেয় না প্রতিরোধ গড়ে? প্রশাসন কী করে? গ্রামের রাজনীতিকরা কি এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে? জানা যায় না।
কিন্তু আমার নিজস্ব সূত্রে কেবলই খবর আসে বেনোয়ারি নামে একজন ফকির সদাসর্বদা এমন ঘটনা ঘটলেই বাউলদের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মোল্লাদের সঙ্গে ধর্মীয় ‘বাহাস’ অর্থাৎ বিতর্কে নামেন। প্রায় সব জায়গাতেই শেষপর্যন্ত বেনোয়ারির জিত হয়। অনেকবার ভেবেছি যাব বেনোয়ারির কাছে। হাল হদিশ পাইনি তেমন কোনও। মানুষটা কি তবে অরণ্যদেবের মতো নেপথ্য থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন—এমন পরিহাসভরা চিন্তা করে নিজেই হেসেছি। শেষমেশ এবারের সতী মার মেলায় ত্রৈলোক্য মহান্ত মানুষটির ঠিকানা দেন। নদীয়া-মুর্শিদাবাদ বর্ডারে ধরমপুরের কাছে মাঠপুকুর গ্রামে বেনোয়ারি ফকিরের স্থায়ী সাকিন। মানুষটার সম্পর্কে কিছু খবর বাতাসে ওড়ে শিমুলতুলোর মতো। ফকিরের কোরান আর হাদিস নাকি কণ্ঠস্থ। মানুষটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাকি স্টেনগান ধরতেন। এ দিগরের সমস্ত বাউল ফকির নাকি বেনোয়ারির গোলাম।
কী দরকার এ সব গুজবে ভর করে? মানুষ তো? একদিন দেখে আসলেই হবে। হাড়িরামের একটা গান মনে আসে, ‘মানুষ মানুষ সবাই বলে/কে করে তার অন্বেষণ?’ তা মানুষের অন্বেষণে আমার তো অন্তত কোনও ক্ষান্তি নেই। একদিন চালচিড়ে বেঁধে বেরিয়ে পড়লাম। মাঠপুকুর খুব একটা তেপান্তর নয়, তবে আমার ডেরা থেকে সেখানে যাবার রাস্তাটা খুব ঘুর পাকের। তবু শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাই বেলা বারোটায়। আগে একটা আন্দাজি পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিলাম অবশ্য। ডাক বিভাগের প্রসিদ্ধ তৎপরতায় ফকির তা পাননি। তাতে ক্ষতি নেই। বিশাল লম্বা একবগ্গা চেহারার শক্ত কাঠামোর মানুষটার মধ্যে একজন নরম লোক বাস করে। হই হই করে সংবর্ধনা করলেন: আরে আসুন আসুন। চিঠি পাইনি তো কী হয়েছে? আপনার মনের চিঠি এই তো পেলাম, তাতে খোদ খোদার শিলমোহর। বাস্ তা হলেই হল। উঠুন দাওয়ায়। বসুন গরিবের এবাদতখানায়। হ্যাঁ হ্যাঁ আপনার নাম শুনেছি বইকী! শুধু চেহারাটা মেলানো বই তো নয়। চেহারায় তো মানুষের আদলই দেখছি। হাঃ হাঃ। গরিবের কুঁড়েয় দুটো সেবা হবে তো? ওহে সহিতন বিবি, এ বাবুর জন্যে দুটো চাল লাও।
নজর করে দেখি উঠোনে একজন অল্পবয়সী মুসলমান বউ গাঢ় বেগুনফুলি শাড়ি পরে উনুন ধরাচ্ছে কাঠকুটো নারকেল পাতা দিয়ে। বিরাট এজমালি উনুন। তাতে একটা শানকি চাপা দেওয়া থাকে সাধারণত। হঠাৎ অতিথ-পথিক এসে পড়লে চট করে দুটো রেঁধে দেওয়া যায়। আপাতত জ্যৈষ্ঠের খরতাপে সহিতন বিবির গৌরী তনু ঘামে সারা। ভাবলাম, তার দিকে চেয়ে, বেনোয়ারি ফকির বেশ কমবয়সী বিবি জোগাড় করেছেন। বেনোয়ারি ঘর থেকে এক মস্ত খেজুরপাতার পাটি এনে দাওয়ায় পাতলেন। দুটো হাতপাখা জোগাড় হল। সহিতন বিবিকে বেশ হেঁকে তিনি এক প্রস্ত চা আর মামলেটের হুকুম দিয়ে যেন অন্তর্যামীর মতো আমার মন পড়ে নিয়ে বললেন, ‘যা ভাবছেন তা নয়। সহিতন বিবি আমার মাইনে-করা কাজের লোক। একা মানুষ তো আমি। বয়সও হয়েছে। দানাপানি ফুটিয়ে দেয় আর আমার ওই ঘরের দাওয়ায় পড়ে থাকে একটা বাচ্চা নিয়ে। বরে তালাক দিয়েছে। আশ্চর্য হবেন না। গ্রামদেশের গরীব মুসলমান ঘরে তালাক-খাওয়া মেয়ে দুটো-একটা সর্বদা মজুত থাকেই।’
