: অনেক তফাত। বেণুর পাঁচ ছিদ্র। মুরলীর তিন ছিদ্র। বাঁশি সাত ছিদ্র। বংশী নয় ছিদ্র। তফাত নেই? আকারে তফাত প্রকারে তফাত। বুঝলেন না?
বুঝলাম বইকী মনে মনে। খুব ছিদ্রান্বেষী নই অবশ্য। তবু মহান্তর কথায় কী একটা ধন্দ আছে। সবটাই তার বানানো না বাগ্বিভূতি। এই কথার পাকেই লোকটা শিষ্য বানায় নাকি? তবে এলেম আছে। লোকটার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া শক্ত। কিন্তু ততক্ষণে মহান্ত এক রাউন্ড জিতে আমাকে আবার পেড়ে ফেলে বলেন, ‘আধারে ছিদ্র না থাকলে আসা-যাওয়া হবে কোথা দিয়ে? মানুষের দেহে কটা ছিদ্র বলুন তো?’
আঃ, খুব কমন কোশ্চেন পেয়ে গেছি এবারে। মৌজ করে বলি, ‘মানুষের শরীরে নটা ছিদ্র। যাকে বলে নবদ্বার। দুই চোখ দুই নাক দুই কান আর মুখ পায়ু উপস্থ। ঠিক বলেছি?’
: পুরুষের ক্ষেত্রে ঠিক। নারীর তা ছাড়া আছে যানি। তাকে বলে দশমীদ্বার।
এত সোজা কোশ্চেনেও পুরো নম্বর না পেয়ে গোঁজ হয়ে বসে থাকলাম। তখন মহান্ত বললেন, ‘মানুষের সাধন যখন হয় তখন একেক অবস্থার একেক নাম। এই যে বাঁশি বংশী মুরলী আর বেণু। এ সব সাধকের এক এক অবস্থাকে বলে। শুনবেন?’
: নিশ্চয়ই। এমন সব কথা কখনও শুনিনি।
: শুনবেন কী করে? ঘরে বসে তো শোনা যায় না। বেরিয়ে পড়তে হয়। মেলা মচ্ছবে মিশতে হয়, মিলতে হয় মানুষের সঙ্গে। মানুষের কাছেই সর্ব জিনিস বাবাজি। মানুষের বাইরে কোনও প্রাপ্তিবস্তু নেই।
খেই ধরিয়ে দেবার জন্যে আমি বলি, ‘বেণু মুরলী বংশী বাঁশি সম্পর্কে কী যেন বলবেন?’
‘হ্যাঁ বলব। সেইটাই সবচেয়ে নিগূঢ় কথা’ ত্রৈলোক্য মহান্ত গলাটা খুব খাদে এনে সোজা চাইলেন আমার দিকে অন্তর্ভেদী চোখে তারপর বললেন, ‘মানুষের চেতনা যখন থাকে নিদ্রিত তখন তিন ছিদ্রে বাজে, তাকে বলে মুরলী অবস্থা। তিন ছিদ্র হল সত্ত্ব রজ তম। এরপরে সত্তার ঘটে উত্থান! তাকে বলে বেণু। তার পাঁচ ছিদ্র। মন, দুই নাসিকা আর দুই চোখ—এই পাঁচ। এর পরে বাঁশি অবস্থা যখন মানুষ সচৈতন্য হয়। তখন সাত ছিদ্রে বাজে। তার মানে বেণুর পাঁচ ছিদ্রের সঙ্গে তখন যোগ হয় দুই কর্ম অর্থাৎ মনকর্ম আর কায়কর্ম। ব্যাস্ সবসুদ্ধ সাত। মানুষের চতুর্থ অবস্থার নাম বংশী। তখন নয় ছিদ্র। অর্থাৎ বাঁশির সাতের সঙ্গে তখন যোগ হয় পুংলিঙ্গ আর স্ত্রীলিঙ্গ। এই হল সাধকের চরম অবস্থা।’
আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম মহান্ত-র বাক্যের বিন্যাসে। খানিক পরে কথার ঘোর কাটলে জিজ্ঞেস করলাম: আপনাদের ধর্ম স্বকীয়া না পরকীয়া?
: স্বকীয়া আর পরকীয়া বলতে কী বোঝেন? নিজের স্ত্রী আর সাধনসঙ্গিনী?
: হ্যাঁ। তাই তো শুনি।
: সবটাই ভুল। আমাদের আইনপুস্তকে বলে:
সতীনারী ব্যভিচারী দুয়ের কর্ম নয়।
সহজ দেশে করণ করা দেশ আলাদা হয়॥
তার মানে নিজের স্ত্রী বা অন্যের নারী কেউই নয়। স্বকীয়া কথার মানে একেবারে আলাদা। আমরা মনে করি, দেহের মধ্যেই নারী-পুরুষ—তারই রমণকে বলে স্বকীয়া। তার বাইরে সব সঙ্গমই পরকীয়া। কর্তাভজা ধর্মে এই স্বকীয়া সাধনা। এবারে বলুন এ ধর্মে কি কাম থাকতে পারে? আমাদের মত আলাদা।
: তা বুঝলাম। কিন্তু আউল বাউল সাঁই দরবেশ—আপনারা কোনটা?
মহান্ত বললেন: ও সব একেবারে অন্য রাস্তা। ফকিরি তত্ত্বের ব্যাপার। এসাহক তুমি কিছু জানো নাকি?
আখড়ার মধ্যে থেকে গুঁড়ি মেরে সামনে উঠে এল এক মাঝবয়সী মুসলমান। এরই নাম এসাহক। জানা গেল সে কর্তাভজা নয়। তবে ব্যানাডার দলের সঙ্গে এসেছে মেলায়। ত্রৈলোক্য মহান্তকে খুব খাতির করে। এগিয়ে এসে সবিনয়ে বলল, ‘আমি সব তেমন জানি না। তবে একবার ছেঁউরের লালনের আখড়ায় গিয়েলাম। সেখানে একটা শ্লোক শুনে মনে মনে গেঁথে নিয়েছি সেটা বলতে পারি। বলব?’
: বলো।
আউলে ফকির আল্লা
বাউলে মহম্মদ
দরবেশ আদম সফি
এই তক্ হক্।
তিনমত একসাথ
করিয়া যে আলী
প্রকাশ করিয়া দিলো
সাঁইমত বলি॥
আমি থম মেরে কিছুক্ষণ বসে থেকে মহান্তকে বললাম, ‘কিছুই তো বুঝলাম না। এ যে কেবলই পাকে পাকে জড়িয়ে পড়ছি। সব কিছু জানতে চাই ঠিকই কিন্তু আমার কি অত সামর্থ্য আছে? আপনি কী বলেন?’
মহান্ত বললেন, ‘মানুষের সামর্থ্যের কি সীমা আছে? তবে গুরুর কৃপা লাগে। যাইহোক, দুঃখ করবেন না। আপনাকে একটা আস্তানায় নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে একজন ফকির আছেন। সতী মা-র মেলায় তিনি বরাবর আসেন। বেনোয়ারি ফকির। আমাদের ঘরের মহাশয় নন। তবে আসেন প্রতিবার।’
: মহাশয় নন তবু আসেন কেন?
: এটা একটা সিদ্ধপীঠ তো? তাই অনেকে আসেন। মেলামেশা হয়। ভাবের লেনদেন হয়। চেনাজানা হয় পাঁচজনে। চলুন দেখি যদি পেয়ে যাই।
অনেক ঘুরেও বেনোয়ারি ফকিরের দেখা মিলল না। তবে একজন জানাল ফকির অসুস্থ তাই আসেননি এবার। আমি বললাম: অসুখ? ফকিরের অসুখ হয় না শুনেছি যে?
লোকটা নির্বিকারভাবে বলল: আজ্ঞে, গা থাকলেই ঘা হবে।
কী চমৎকার এইসব লৌকিক বুলি। ‘গা থাকলেই ঘা হয়’। হঠাৎ মনে পড়ল রয়েল ফকিরের কথা। সেই তো বলেছিল মেলা-মচ্ছবে গেলে অনেক মানুষ অনেক অভিজ্ঞতা হয়। সে-ই তো প্রথম হাতে ধরে অনেকগুলো মেলা ঘুরিয়েছিল। মানুষটা আজ মাটির তলায় ঘুমোচ্ছে বটে, তার কথাগুলো কিন্তু জেগে আছে। তার কাছ থেকে ঘোষপাড়ায় যে সব ফকির ও মহাশয়দের পরিচয় পেয়েছিলাম তা জীবনের অক্ষয় সম্পদ। আজ শেষবারের মতো ঘোষপাড়ার মেলা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় আউলাচাঁদ-রামশরণ রামদুলাল-সতী মা সবাইয়ের কথা মনে পড়লো। একদল ক্লিষ্ট অবমানিত মানুষকে তাঁর শাস্ত্রবর্ণকলঙ্কিত ধর্মের অত্যাচার থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন উদার মানুষ ভজনের অসীম সম্ভাবনায়। তাঁদের উত্তরপুরুষরা যদি সে-ধর্মে এনে থাকেন লোভের কলঙ্ক, দ্বেষের কালিমা আর শোষণের নিষ্ঠুরতা তবুও তো মূলধর্মের মহিমা অমলিন থেকে যায়। থেকে যায় তার শুদ্ধ বিধান আর ভাবের গীত। গ্রাম থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদে কর্তাভজা ধর্মের বিশ্বাসী মানুষগুলির আকুতি আর উৎসর্জন তো সত্যি। নিজের চোখে দেখেছি এই আবেগের টানে এমনকী বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে আসে কত মহাশয় আর বরাতি। আজও।
