আমার বন্ধুর বস্তুবাদী মনেও খানিকটা অভিভব জেগেছিল বুঝি। সে তাই বলে বসল, ‘সকাল থেকে অনেক মিথ্যা আর বুজরুকি দেখে দেখে মনটা খুব দমে গিয়েছিল। আপনার এখানে এসে মনটা শান্ত হল। আচ্ছা বলুন তো, এ সব হিমসাগর ডালিমতলার ব্যাপারগুলোর মধ্যে কোন সত্য আছে?’
মহান্ত মৃদু হেসে বললেন: সত্য না থাকলে আপনারা এই ভরদুপুরে এখানে এলেন কেন? ব্যাধি না থাকলে কি কেউ বৈদ্য ডাকে? তবে সবচেয়ে বড় শক্তি হল নামের শক্তি। সেইজন্যে লালশশী বলে গেছেন:
চতুর্বর্গ ফলের অধিক ফলে
যদি থাকে বাসনা
নামরস পানেতে মত্ত
হওরে রসনা।
তার মানে ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষেরও ওপরে হল নামের শক্তি। তবে নাম জপলেই কি শুধু হয়? ব্যাকুলতা চাই। তার ওপরে আবার অধিকারীভেদ আছে। আমাদের মতে বলে ‘মেয়ে হিজড়ে পুরুষখোজা তবে হয় কর্তাভজা’। মানে বুঝলেন?
: না, প্রহেলিকার মতো লাগল।
: কিছুই প্রহেলিকা নয়। বৈদিক পথ ছাড়তে হবে। বৈদিক পথ বলতে বোঝায় ব্রহ্মচর্য গার্হস্থ্য বানপ্রস্থ আর সন্ন্যাস। এর কোনওটাতেই ঈশ্বর মিলবে না। সব কিছুর মধ্যে থাকতে হবে নির্বিকার হয়ে। যেন মেয়ে হয়েও হিজড়ে, পুরুষ হয়েও খোজার মতো। এই অবস্থা এলে তবে মাকে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে হবে। সেইজন্যে ভাবের গীতে বলেছে:
মায়ের যোগ্য হলে মায়ের কৃপা হয়।
মা বলা বোল সত্য হলে সকলি মা-ময়॥
সেইজন্যে আমরা সব জায়গায় সতী মাকে দেখতে পাই। ডালিমতলাতেও তিনি হিমসাগরেও তিনি। তিনি সর্বত্র রয়েছেন, তবে কর্মভেদে কেউ তাঁকে দেখে কেউ দেখতে পায় না।
আমি দেখলাম মহান্ত-র আলোচনা ক্রমেই ভাববাদী হয়ে যাচ্ছে। তাঁর বরাতিরা ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে তাঁর কাছে পিঠে। তাদের চোখে মুগ্ধতা আর সমর্পণ। এ অবস্থা চলতে দিলে বিপদ। এ সব ক্ষেত্রে আমি ঝপ করে একটা উলটো কথার টান মারি। এবারেও তাই সবাইকে সচকিত করে বলে বসলাম, ‘আচ্ছা অনেকে যে বলে খাদ্যের সঙ্গে শরীরের যোগ আছে তা মানেন? কুমীরদহ গাঁয়ের শিবশেখর বললেন তিনি নিরিমিষ খান। আপনিও তাই? মাছ মাংস খান না?’
মহান্ত-র ভাবের ঝিম এই এক প্রশ্নেই কেটে গেল। মানুষটি পড়ে গিয়েছিলেন কথার কুম্ভীপাকে। সেখান থেকে এক ঝটকায় বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আঁশ নিরিমিষ বলে কিছু নেই। সবই তাঁর সৃজন। তবে শরীরের মধ্যে খাদ্যের ক্রিয়া আছে বইকী। তার কাজ তাপ বাড়ানো। তাই সাধক মানুষ তাপ এড়াতে চান। শুধু তো ত্রিতাপ নয়। দেহের তাপও বিঘ্ন ঘটায় জপে তপে। আমি নিরিমিষ আমিষ বাছি না। তবে মাছ খাই কিন্তু মাংস খাই না।’
: কেন? কোনও কারণ আছে? নাকি রুচি হয় না?
: সাধক কখনও কারণ ছাড়া কাজ করে? সে তো অনেক বুঝে, অনেক নেড়েচেড়ে, অনেক দেখেশুনে, তবে খাঁটিপথে দাঁড়ায়। মাছ খাই কেন জান? মাছের মধ্যে কাম নেই। কামে তাদের জন্ম নয়।
দুই বন্ধু কানখাড়া করি। লৌকিক মানুষ অদ্ভুত কতকগুলো লজিকে চলে। তার খানিক মনগড়া, খানিক গুরুর বানানো। মাছের মধ্যে কাম নেই, কামে তাদের জন্ম নয়, কথাটার মধ্যে অভিনবত্ব আছে বেশ। তাই বলি, ‘মাছের কাম নেই? তা হলে সৃষ্টি হয় কেমন করে?’
মহান্ত বললেন, ‘মাছের যোনি লিঙ্গ নেই। তাই কথায় বলে: মাছের মাছা নেই। ঘর্ষণে তাদের সৃষ্টির বীজ। যাকে বলে রতি। রতি বা তাপ থেকে ডিমের সৃষ্টি। তাই মাছ খেলে মানুষের কামপ্রবৃত্তি আসে না। কী বলো গো তোমরা?’
সবাই তারিফচোখে মাথা নাড়ে। একজন শিষ্য বলে, ‘আমরা আর কী বলব? গৈ-গেরামের মুরুখ্যু মানুষ। কি জানি বলো? তাই তোমারে গুরু মেনেছি? তুমি যা বলাও তাই বলি। তুমি যা জানাও তাই জানি। তুমি ছাড়া আমাদের তিলার্ধ চলে না।’
মহান্ত বললেন, ‘মাছ হল সবচেয়ে সাত্ত্বিক প্রাণী। তার মধ্যে সাধক লক্ষণ। দেখেছেন মাছের চোখে পলক নেই, চোখ স্থির? তার মানে সদাই ধ্যানস্থ। আমি তো তাই কাঁদি: সতী মা কেন পলক দিলে? কেন মীনের মতো নয়ন দিলে না? তা হলে অপলক তোমার লীলা দেখতাম।’
কাণ্ড দেখে আমি তো থ। সেবিকা শিষ্যা আঁচল দিয়ে গুরুর চোখ মোছায়, জোরে জোরে পাখার বাতাস করে। মা-গোঁসাই ভেতর থেকে বলে ওঠেন, ‘মানুষটার মনে বড় তাপ।’
মহান্ত-র ক্রন্দনপর্ব খানিক ধাতস্থ হলে জিজ্ঞেস করলাম: মাংস খেলে কি কাম বৃদ্ধি হয়?
: শুধু কাম নয়, সব প্রবৃত্তিই বাড়ে। রাগ দ্বেষ হিংসা। আবার বিবেচনা নষ্ট হয়। কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান থাকে না।
: তাই নাকি? কেন?
: কী বোঝাই আপনাকে বলুন তো দেখি? আপনি শিক্ষিত মানুষ। কোন মাংস খাবেন? পাঁঠা? তাদের সঙ্গম দেখেছেন? মা-মাসি জ্ঞান আছে তাদের? সে মাংস খেলে মানুষের কী দশা হয় বোঝেন না?
বাপরে। কথার কী ঝাপট। বাক্যের কী শক্তি। সংকোচে কারুর দিকে তাকাতে পারি না। লজ্জা এড়াতে বলি, ‘এত সূক্ষ্ম চিন্তা তো করিনি কখনও। তাই আপনাকে নেড়ে বসেছি। মাপ করবেন।’
ততক্ষণে মানুষটা শান্ত, জল। প্রসন্ন হেসে বললেন, ‘জানতে চাওয়ায় ভুল কোথায়? তবে সব জানার জবাব নেই। কেননা সব কিছুর নামভেদ আছে রূপভেদ আছে। রকম আলাদা স্বাদ আলাদা। যেমন ডাব আর নারকেল, যেমন মুড়ির চাল আর ভাতের চাল। যেমন বেণু মুরলী বংশী বাঁশি…’
মহান্তর কথা থামিয়ে বলে বসি, ‘কী বললেন? বেণু মুরলী বংশী বাঁশি কি এক নয়? তফাত কীসে?’
